২১ বছর দখলে : স্বপ্নভঙ্গ ৬ হাজার মানুষের

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ মেরুল বাড্ডার ব্যস্ত সড়ক, এর একপাশে দোকানপাট, আড়ত, বাজার আর মানুষের আনাগোনা। চোখে দেখলে বোঝার উপায় নেই, এই ব্যস্ততার আড়ালে পড়ে আছে প্রায় ১১ একর সরকারি জমির বেদখলের দীর্ঘ দুই দশকের গল্প। জমিটির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা। অথচ রাজউকের নিজস্ব সম্পত্তি হিসেবে নথিতে থাকা এই জমি গত ২১ বছর ধরে বেদখলে। শুধু জমি দখলই নয়, এই জমিকে ঘিরে জড়িয়ে আছে প্রায় ৬ হাজার মানুষের স্বপ্ন ভঙ্গের গল্প। বছরের পর বছর দোকান পাওয়ার আশায় সঞ্চয় ভেঙে কিস্তি পরিশোধ করেছেন কিন্তু বুঝে পাননি স্বপ্নের সেই দোকান এভাবে ভূক্তভোগীদের কাছ থেকে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তবে, এই গল্পের শুরু খুঁজতে গেলে যেতে হবে বেশ পেছনে। নথিপত্র অনুযায়ী, ১৯৬২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (ডিআইটি) আবাসিক প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বাড্ডা মৌজায় প্রায় ১১ একর জমি অধিগ্রহণ করে। ঢাকা জেলা প্রশাসনের এলএ কেস নম্বর ১৩৮/৬১-৬২ এর আদেশ অনুযায়ী স্বাধীনতার পূর্বে ১৯৬২ সালের ২৫ এপ্রিল জমিটি ডিআইটির কাছে হস্তান্তর করা হয়। তৎকালীন ইমপ্রুভমেন্ট অ্যাক্ট ১৯৫৩ এর (৯৩এ) ধারায় সম্পন্ন হয় অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া। ডিআইটির অনুকূলে দেওয়া হয় দখল হস্তান্তরের সনদও। পরে ১৯৮৭ সালে আইন সংশোধনের মাধ্যমে ডিআইটির নাম পরিবর্তন হয়ে হয় রাজউক। অর্থাৎ নথিতে জমিটির মালিকানা ও দখলের ইতিহাস স্পষ্ট। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বাস্তব চিত্র বদলে যায়। জমিটি আর রাজউকের নিয়ন্ত্রণে থাকেনি। সেখানে গড়ে উঠতে থাকে নানা ধরনের স্থাপনা ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম। ২১ বছর ধরে মামলা, দখলও বহাল: জমিটি উদ্ধারের চেষ্টা যে একেবারেই হয়নি, তা নয়। বরং এই জমিকে ঘিরে বছরের পর বছর ধরে তৈরি হয়েছে আইনি জটিলতা। ২০০৫ সালের দিকে জমি দখলমুক্ত করতে রাজউক উচ্ছেদ অভিযান চালায়। কিন্তু এর পরপরই শুরু হয় মামলা। জমি দখলে রাখার বিষয়টি ঘিরে হাইকোর্টে একের পর এক রিট হয়। সব মিলিয়ে রয়েছে পাঁচটি রিট মামলা। মামলা হয়েছে, সময় গড়িয়েছে, কিন্তু জমির দখল আর ফেরেনি। বরং মামলার সুযোগে সেখানে গড়ে উঠেছে মাছ, মুরগি ও বাঁশের আড়ত, কাঁচাবাজারসহ বিভিন্ন স্থাপনা। রাজউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রিয়াজুল ইসলামও জমি উদ্ধারের দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, রাজউকের বিরুদ্ধে অসংখ্য রিট মামলা রয়েছে এবং মামলা পরিচালনার জন্য আইনজীবীও নিয়োগ করা আছে। তবে অনেক কর্মকর্তা কাজ করতে চান না, এমন মন্তব্যও করেছেন তিনি। জমিতে এখন বাজার, আড়ত, বস্তি ঃ সরেজমিনে দেখা যায়, রামপুরা ব্রিজ থেকে কিছুটা দূরে মূল সড়কসংলগ্ন এলাকায় রয়েছে ‘মেসার্স জ্যোতি এন্টারপ্রাইজ’, ‘আয়েশা এন্টারপ্রাইজ’ এর বাঁশের আড়ত। তার পরেই মেরুল কাঁচাবাজার। সেখানে একটি টিনের ঘরে রয়েছে ‘মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতি ও মেরুল স্বাধীন বাংলা মৎস্য ও হাস মুরগী আড়ত’ এর কার্যালয়। আশপাশে রয়েছে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি ও মেরুল বায়তুল নূর জামে মসজিদ। আর এখানেই সামনে আসে মালিকানা নিয়ে আরেক প্রশ্ন। রাজউক জমিটির মালিকানা দাবি করলেও সেখানে ব্যক্তিমালিকানার দাবি করে কয়েকটি সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছে। এর একটি সাইনবোর্ডে এই জমির মালিক মোঃ চাঁন মাহমুদ ও মোঃ সাজজিদ হোসাইন গং সি.এস দাগ নং-১২৪২। সিটি জরিপ- ২৩৭৯, সিটি দাগ নং- ১৫০০৪। সি.এস খতিয়ান নং- ৪১৭/ আর.এস খতিয়ান নং- ৩০৪, আর,এস দাগ নং- ৩০৩৬। সি.এস দাগ নং- ১২৪৩। সিটি জরিপ- ৫৭৪১, ৩৪৫২, ১৩৭৬৯, ৯৮২৪, ১১৫৪৪। সিটি দাগ নং-১৫০০৪, ১৫০০৯। সি.এস খতিয়ান নং- ৪০৩। আর.এস খতিয়ান নং- ১৩৫৯/২০৪৯। আর.এস দাগ নং- ৩০৩৪, ৩০৩৫, ৩০৩৭ (আ), ৩০৩৯। মোট জমির পরিমান দেখানো হয়েছে ৭০ শতাংশ। আরেক সাইনবোর্ডে মেরুল কাচাবাজার দোকান মালিক সমিতি স্থাপিতঃ ১৯৮৮ইং, গভারমেন্ট রেজিষ্ট্রিশন নং-২৭৫৫ ঢাকা। ঠিকানাঃ ল-৩/ই, মেরুল বাড্ডা ঢাকা-১২১২। বাংলাদেশ সরকারের গেজেট ভুক্ত অনুমোদিত মার্কেট (মহামান্য হাইকোর্টের আদেশ বলে স্বীকৃত) মোট জমির পরিমান-১(এক) একর ৮৯ শতাংশ।
একই জমিতে যখন রাজউকের মালিকানার দাবি, তখন ব্যক্তিমালিকানার এসব সাইনবোর্ডের এই বৈপরীত্যই জমিটির জটিলতার আরেকটি চিত্র তুলে ধরে। তবে খোঁজ নিয়ে জানাযায়, মেরুল বাড্ডার এই জমির গল্পে সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায়টি সম্ভবত সাধারণ ব্যবসায়ীদের। ১৯৮৮ সালে যাত্রা শুরু করে ‘মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতি’। ধীরে ধীরে এর সদস্য সংখ্যা প্রায় ৬ হাজারে পৌঁছায়। উদ্দেশ্য হিসেবে সামনে আসে আধুনিক কাঁচাবাজার ও মার্কেট নির্মাণের কথা। স্বল্পমূল্যে সেখানে দোকান দেওয়ার আশ্বাসে সদস্য হতে থাকেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। দোকানের আশায় সদস্যরা সঞ্চয়ের টাকা দিতে শুরু করেন। বিভিন্ন সময়ে রসিদের মাধ্যমে কিস্তি ও নানা খাতে অর্থ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ তাদের। অভিযোগের হিসাব বলছে, প্রায় ৬ হাজার মানুষের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। কিন্তু এত বছরেও অধিকাংশ সদস্যের হাতে পৌঁছায়নি কাক্সিক্ষত দোকান। উচ্ছেদ অভিযানেও থামেনি টাকা নেওয়া: খোঁজ নিয়ে জানাযায়, ২০০৫ সালের দিকে রাজউক যখন উচ্ছেদ অভিযান চালায়, তখন সমিতির সদস্যদের মধ্যেও আতঙ্ক তৈরি হয়। অনেকেই টাকা দেওয়া বন্ধ করে দেন। কিন্তু সেখানেই গল্পের শেষ হয়নি। সমিতির কার্যালয় মেরুল বাড্ডা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয় মতিঝিলে। এরপর রাজউকের আইনি জটিলতা দ্রুত সমাধান হবে, এমন আশ্বাস দিয়ে আবারও সদস্যদের কাছ থেকে চাঁদা ও কিস্তির টাকা নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। অর্থাৎ জমিতে দোকান না থাকলেও, দোকান পাওয়ার প্রত্যাশাটি বেঁচে ছিল। আর সেই প্রত্যাশাকে ঘিরেই বছরের পর বছর টাকা দেওয়ার ধারাও চলেছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। ১৬ বছর টাকা দিয়েও মেলেনি দোকান মেলেনি: মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতির সদস্য মো. হুমায়ুন কবিরের অভিজ্ঞতা এই দীর্ঘ অপেক্ষারই একটি উদাহরণ। মেরুল বাড্ডার মতো জায়গায় নিজের একটি দোকান হবে, এই আশায় তিনি সমিতির সদস্য হয়েছিলেন। নিয়মিত টাকা দিয়েছেন। কিন্তু তার ভাষ্য, ১৬ বছর পার হলেও দোকান পাননি। তার অভিযোগ, সমিতির প্রায় পাঁচ হাজার সদস্যের কাছ থেকে নেওয়া প্রায় ৩০০ কোটি টাকার কোনো হিসাব নেই। আরেক সদস্য মো. রবিউল ইসলাম (সুজন) জানান, প্রায় ২০ বছর ধরে সমিতিতে টাকা দিয়েছেন। তার দেওয়া অর্থের পরিমাণ প্রায় পাঁচ লাখ টাকা। দোকান পাওয়ার সম্ভাবনা না থাকায় একপর্যায়ে কিস্তি দেওয়া বন্ধ করে দেন তিনি। এই সদস্যদের অভিযোগ শুধু দোকান না পাওয়ার নয়; তারা জানতে চান, বছরের পর বছর যে অর্থ তারা দিয়েছেন, সেই টাকার কী হলো? সমিতির ভেতরেও উঠেছে অনিয়মের অভিযোগ: সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানাযায়, সমিতির আগের পরিচালনা পর্ষদের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে। সমিতির বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহীন জানান, একসময় সদস্য সংখ্যা ছয় হাজারের বেশি ছিল। সাধারণ ব্যবসায়ীরা কষ্টার্জিত আয় থেকে নিয়মিত চাঁদা দিয়েছেন। কিন্তু দীর্ঘ সময়েও তাদের স্বপ্ন পূরণ হয়নি। তিনি সমিতির সাবেক সভাপতি রফিকুল ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক মনিরের বিরুদ্ধে সাধারণ ব্যবসায়ীদের তহবিলের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ করেছেন। দুজনই বর্তমানে প্রয়াত বলে তিনি জানান। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ১ হাজার ৬৫০ কোটি টাকার জমি, ৩০০ কোটি টাকার প্রশ্ন: মেরুল বাড্ডার এই জমির গল্প শুধু দখল হয়ে থাকা একটি সরকারি সম্পত্তির গল্প নয়। এক পাশে প্রায় ১ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা বাজারমূল্যের ১১ একর জমি। অন্য পাশে সেই জমি ঘিরে ২১ বছরের আইনি জট। জমির বড় অংশে চলছে নানা বাণিজ্যিক কার্যক্রম। রয়েছে পাঁচটি রিট মামলা। আর এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রায় ৬ হাজার মানুষের কাছ থেকে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগ। দোকানের আশায় বছরের পর বছর যারা টাকা দিয়েছেন, তাদের অধিকাংশের হাতে দোকান নেই; অর্থের হিসাব নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। ফলে মেরুল বাড্ডার জমিটি এখন যেন তিনটি প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে আছে, সরকারি জমি কবে দখলমুক্ত হবে, মামলার জট কবে কাটবে এবং দীর্ঘদিন টাকা দিয়ে অপেক্ষায় থাকা মানুষগুলো তাদের অর্থ ও অধিকার কবে ফিরে পাবেন?



