স্থানীয় সংবাদ

খুমেক হাসপাতাল গেটে ঔষধের এমআরপি বাস্তবায়নের উদ্যোগ, কমিটির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন

স্টাফ রিপোর্টার ঃ খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল গেট এলাকার ওষুধের দোকানগুলোতে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য বা এমআরপি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ কেমিস্টস অ্যান্ড ড্রাগিস্টস সমিতি- বিসিডিএসের খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল গেট শাখা। তবে এমআরপি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া এই কমিটির বৈধতা নিয়েই উঠেছে প্রশ্ন। গত ২৩ সেপ্টেম্বর বিসিডিএসের প্রশাসক ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ফারহানা ইসলাম স্বাক্ষরিত এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে সমিতির সব জেলা শাখার কার্যকরী কমিটি এবং থানা সাব-কমিটি বাতিল ঘোষণা করা হয়। এমন ঘোষণার পরও খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল গেট এলাকায় একটি কমিটি কীভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করছে এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় ওষুধ ব্যবসায়ীরা। এদিকে, এমআরপি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) সন্ধ্যায় খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মাদ্রাসা গলি এলাকায় একটি অস্থায়ী কার্যালয়ে বিশেষ সভার আয়োজন করা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন আসিফুজ্জামান। সভা থেকে ওষুধের এমআরপি বাস্তবায়নে কঠোর অবস্থান নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এমআরপি বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন আসিফুজ্জামান। স্থানীয় কয়েকজন ওষুধ ব্যবসায়ী জানান, খুলনা শহরের অন্য কোথাও বর্তমানে এ ধরনের কমিটির কার্যক্রম তারা দেখছেন না। ফলে প্রশ্ন উঠেছে বিসিডিএসের জেলা ও থানা পর্যায়ের কমিটি বাতিলের পর স্থানীয় পর্যায়ে এই কমিটি গঠনের ক্ষমতা তাদের কে দিয়েছে এবং কমিটির সাংগঠনিক বৈধতাই বা কী?
এ বিষয়ে আসিফুজ্জামানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আগামী রবিবার থেকে সরকারি নির্ধারিত মূল্যের ওপর ১০ শতাংশ ছাড়ে ওষুধ বিক্রির সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন দোকানে একেক রকম দাম রাখার কারণে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি। কমিটির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, স্থানীয় পর্যায়ে কমিটিটি গঠন করা হয়েছে। তবে স্থানীয় ওষুধ ব্যবসায়ীদের একটি অংশের দাবি, এমআরপি বাস্তবায়নের নামে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। এমনকি সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত না হওয়া কয়েকজন ব্যবসায়ীকে বিভিন্নভাবে হুমকি-ধমকি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। যদিও এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল দেশের অন্যতম বড় সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র। প্রতিদিন খুলনাসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে অসংখ্য রোগী এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। তাদের বড় একটি অংশ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের। স্থানীয় ওষুধ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমানে হাসপাতাল গেট এলাকার অনেক দোকানে বিভিন্ন ওষুধ এমআরপির চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কম দামে বিক্রি হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে ব্যবসায়ীরা জানান, এন্টিবায়োটিক ইনজেকশন ট্রাকশন ১ গ্রাম-এর এমআরপি ২৫০ টাকা হলেও বর্তমানে এটি ১২০ থেকে সর্বোচ্চ ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ১০ শতাংশ ছাড়ের ভিত্তিতে এমআরপি কার্যকর হলে এর দাম দাঁড়াবে ২২৫ টাকা। একই গ্রুপের সেফটিজন ১ গ্রাম ইনজেকশনের এমআরপিও ২৫০ টাকা। বর্তমানে এটি ১২০ থেকে ১৫০ টাকার মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে বলে ব্যবসায়ীদের দাবি। এমআরপি থেকে ১০ শতাংশ ছাড় কার্যকর হলে দাম দাঁড়াবে ২২৫ টাকা। মুমূর্ষু রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিক মেরোপেনাম ১ গ্রাম-এর সরকারি নির্ধারিত মূল্য ১ হাজার ৩০০ টাকা। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, বর্তমানে এটি ৭১০ থেকে সর্বোচ্চ ৭৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এমআরপি থেকে ১০ শতাংশ ছাড়ে বিক্রি হলে এর দাম দাঁড়াবে ৯১০ টাকা। এছাড়া ম্যাক্স প্রো ইনজেকশনের এমআরপি ১০৫ টাকা হলেও বর্তমানে এটি ৬৫ থেকে ৭০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে বলে জানা গেছে। এমআরপি থেকে ১০ শতাংশ ছাড় কার্যকর হলে এর দাম হবে ৯৫ টাকা। ব্যবসায়ীদের দাবি, শুধু এসব কয়েকটি ওষুধ নয় হাসপাতাল গেট এলাকার বিভিন্ন ওষুধ বর্তমানে এমআরপির তুলনায় কম দামে বিক্রি হচ্ছে। ফলে এমআরপি থেকে নির্দিষ্ট হারে ছাড় দিয়ে বিক্রির সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে অনেক ওষুধের দামই বর্তমানের তুলনায় বেড়ে যেতে পারে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ওষুধ ব্যবসায়ী বলেন, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মূলত অসহায়, দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষ চিকিৎসা নিতে আসেন। তাদের কথা বিবেচনা করেই অনেক ব্যবসায়ী কম লাভে ওষুধ বিক্রি করেন। তারা আরও বলেন, এমআরপি থেকে নির্দিষ্ট হারে ছাড় দিয়ে ওষুধ বিক্রি বাধ্যতামূলক করা হলে ব্যবসায়ীরা হয়তো লাভবান হতে পারেন। কিন্তু চিকিৎসা নিতে আসা দরিদ্র রোগীদের অতিরিক্ত টাকা গুনতে হবে। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে ওষুধ কেনার খরচ বেড়ে গেলে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়াই কঠিন হয়ে পড়তে পারে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, একটি কমিটির সিদ্ধান্তের কারণে হাসপাতাল গেট এলাকার সব ওষুধের দোকানকে একই নীতিতে ওষুধ বিক্রির জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বিসিডিএসের সব জেলা শাখা ও থানা সাব-কমিটি বাতিলের পর স্থানীয় পর্যায়ের এই কমিটির সাংগঠনিক ভিত্তি কী সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে, কমিটির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন, অন্যদিকে এমআরপি বাস্তবায়নের ফলে হাসপাতালের দরিদ্র রোগীদের ওষুধের খরচ বাড়ার আশঙ্কা দুই বিষয় নিয়েই স্থানীয় ওষুধ ব্যবসায়ীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। এ অবস্থায় এমআরপি বাস্তবায়নের আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের প্রশ্ন কমিটির সাংগঠনিক বৈধতা কী এবং এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রোগীদের স্বার্থ কতটা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে? ওষুধ ব্যবসায়ী সমিতির খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল গেট শাখার সভাপতি ফরহাদ মুঠোফোনে জানান, এমআরপি বাস্তবায়ন না থাকায় এখানে ওষুধ কিনতে এসে অনেক রোগী হয়রানি ও প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। রোগীদের ভোগান্তি কমাতে এবং সব দোকানে ওষুধের মূল্য নির্ধারিত ও সুশৃঙ্খল রাখতে এমআরপি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, তাদের কাছে অভিযোগ রয়েছে কিছু দোকানে রোগীদের কাছ থেকে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত দাম নেওয়া হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে দুইটা ঔষধ লেখা থাকলে ১টি দিয়েই ২/৩টির দাম রাখা হচ্ছে। এমআরপি বাস্তবায়ন হলে রোগীরা সব দোকান থেকে নির্ধারিত মূল্যে ওষুধ কিনতে পারবেন এবং অতিরিক্ত দাম নেওয়ার সুযোগ কমে আসবে। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মতো দরিদ্র ও অসহায় রোগীদের চিকিৎসার ওপর নির্ভরশীল একটি প্রতিষ্ঠানের গেট এলাকায় ওষুধের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা যেন আইনগত ভিত্তি, স্বচ্ছতা এবং সর্বোপরি রোগীদের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়েই করা হয় এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button