সম্পাদকীয়

অনিরাপদ কন্যাশিশু : নিরাপদ সমাজ কত দূর

কন্যাশিশু নিয়ে সমাজে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা কমছে না। দারিদ্র্য, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা, পারিবারিক চাপ ও সহিংসতাসহ বেশ কিছু কারণে অনেক কন্যাশিশুর চলার পথ কঠিন হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে বাল্যবিবাহ প্রতিটি কন্যাশিশুর জীবনে অনেকটা অভিশাপ। দেশে বাল্যবিবাহের হার এখনো উদ্বেগজনক। এমন প্রেক্ষাপটে গতকাল পালিত হয়েছে আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য বেশ তাৎপর্যপূর্ণÑ‘বাল্যবিবাহ বন্ধ করি, কন্যাশিশুর অধিকারে বিনিয়োগ করি’। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভের (এমআইসিএস) বরাতে জানা যায়, ২০২৫ সালে ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের ১৩.৪ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই। ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোরীদের ৩৮.৯ শতাংশ বর্তমানে বিবাহিত। ২০১৯ সালের জরিপে ১৮ বছরের আগে বিয়ের হার ছিল ৫১.৪ শতাংশ। আমাদের দেশের বাল্যবিবাহের একাধিক কারণ থাকে। কুসংস্কারের শিকড় এখনো সমাজের গভীরে প্রোথিত। অনেক দরিদ্র পরিবার মেয়েকে সময়ের আগেই পাত্রস্থ করতে চায়। নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ, যৌতুক এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে বিয়েকেই সহজ সমাধান মনে করা হয়। আর এমন সামাজিক ফাঁদে পড়ে অনেক কন্যাশিশুর জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। কন্যাশিশুর নিরাপত্তাই এখন বড় উদ্বেগের বিষয়। রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, এমনকি পারিবারিক পর্যায়েও অনেক কন্যাশিশু নিপীড়নের শিকার হয়ে থাকে। প্রযুক্তির কল্যাণে মোবাইল ফোন এখন হাতে হাতে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে অনলাইনে হেনস্তার প্রবণতা। ইউনিসেফের এমআইসিএস ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, জরিপের আগের এক মাসে এক থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের ৮৫.৭ শতাংশ পরিবারের প্রাপ্তবয়স্কদের কাছ থেকে শারীরিক শাস্তি অথবা মানসিক আগ্রাসনের শিকার হয়েছে। এই পরিসংখ্যান ছেলে ও মেয়ে উভয় শিশুকে অন্তর্ভুক্ত করে। এসব ক্ষেত্রে শিশুদের দোষারোপ না করে তাদের কথা শোনা, অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা রাখা এবং দ্রুত সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এদিকে যখন আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস পালিত হচ্ছে, সেই সময় কুমিল্লায় কিশোরী হত্যার ঘটনাটি দেশজুড়ে আলোচনা হচ্ছে। কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ে ১৫ বছর বয়সী কিশোরীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। খবরে বলা হয়েছে, হত্যার আগে ওই কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এমন ঘটনা একটি-দুটি নয়। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে নারী ও কন্যাশিশুর ওপর মোট এক হাজার ৯১৯টি সহিংসতার ঘটনা তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৮৮৪টি ঘটনায় ভুক্তভোগী কন্যাশিশু। এখন সময় বদলেছে। বর্তমানে যেকোনো দেশের অগ্রগতির সঙ্গে কন্যাশিশুর নিরাপদে বেড়ে ওঠার বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কাজেই আমাদেরও এই অনিবার্যতা উপলব্ধি করতে হবে। এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. মোর্শেদ হাসান খান মনে করেন, ‘যে সমাজ একটি মেয়ের শৈশবকে নিরাপদ রাখে, তার শিক্ষাকে অধিকার হিসেবে দেখে, তার স্বপ্নকে পরিবারের সামর্থ্যের সঙ্গে মেপে ছোট করে না এবং তাকে নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেয়, সেই সমাজ শুধু একটি প্রজন্মকে বদলায় না, তার পরবর্তী প্রজন্মের ভিত্তিও শক্তিশালী করে।’ আমরা মনে করি, কন্যাশিশুর জন্য নিরাপদ সমাজ গড়ে তুলতে হলে জরুরি কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার। ধর্ষণ, নিপীড়নমূলক অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশ হলে এ ধরনের অপরাধ অনেকটাই কমে আসবে। আগামীর সমাজ কন্যাশিশুর বাসযোগ্য হয়ে উঠুকÑএটাই প্রত্যাশা।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button