১৯ শয্যায় বন্দি ৫০ শয্যার হাসপাতাল : চিকিৎসা পেতে দুর্ভোগে কয়রার মানুষ

রিয়াছাদ আলী, কয়রা (খুলনা) প্রতিনিধি ঃ অসুস্থ শরীর নিয়ে হাসপাতালে এসে শয্যা পাওয়া যাবে কি না, প্রয়োজনের সময় চিকিৎসক মিলবেন কি না। এমন নানা দুশ্চিন্তায় থাকতে হয় রোগী ও তাদের স্বজনদের। কেউ আসেন জ্বর নিয়ে, কেউ শ্বাসকষ্টে, আবার কেউ জরুরি চিকিৎসার আশায় ছুটে আসেন প্রিয়জনকে নিয়ে। কিন্তু হাসপাতালে এসে অনেককেই পড়তে হয় শয্যাসংকট ও সীমিত চিকিৎসা সুবিধার সমস্যায়। খুলনার সুন্দরবনসংলগ্ন উপকূলীয় উপজেলা কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিত্র এমনই। কাগজে-কলমে ৫০ শয্যার হাসপাতাল হলেও বাস্তবে মাত্র ১৯ শয্যার অবকাঠামোয় চলছে চিকিৎসাসেবা। ছয় বছর আগে ৩১ শয্যার পুরোনো ভবনটি ভেঙে ফেলা হয়। এরপর নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও এখনো কাটেনি অবকাঠামোগত সংকট। ফলে প্রয়োজনের তুলনায় সীমিত সুযোগ-সুবিধা নিয়ে চিকিৎসাসেবা দিতে হচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। এতে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে চিকিৎসা নিতে আসা সাধারণ মানুষকে। সুন্দরবন সংলগ্ন কয়রা উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের হাজার হাজার মানুষের চিকিৎসার অন্যতম ভরসা এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। কয়রা সদর হতে এটির দুরত্ব ১৫ কিঃ মিঃ। এখানকার মানুষো এখানে চিকিৎসা সেবা নিয়ে থাকে। এই উপজেলার পাশাপাশি পাশ্ববর্তী উপজেলার মানুষও এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। বিশেষ করে দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সরকারি এই হাসপাতাল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সংকট ও জনবল ঘাটতির কারণে প্রত্যাশিত চিকিৎসাসেবা পাওয়া নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে স্থানীয় বাসিন্দাদের। জায়গীরমহল গ্রামের বাসিন্দা আঃ রউফ বলেন, হাসপাতালে নিয়মিত চিকিৎসক পাওয়া নিয়ে রোগীদের মধ্যে অভিযোগ রয়েছে। রাতের বেলায় চিকিৎসাসেবা পেতেও সমস্যা হয়। অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও চালক না থাকায় সেটি সব সময় ব্যবহার করা যায় না। কয়রা উপকূলীয় ও দুর্যোগপ্রবণ এলাকা হওয়ায় এখানকার মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকিও তুলনামূলক বেশি। ডায়রিয়া, পানিবাহিত রোগ, জ্বর ও শ্বাসকষ্টের পাশাপাশি দুর্ঘটনা, প্রসূতি জটিলতা এবং বিভিন্ন জরুরি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন। বর্ষা মৌসুম, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের সময় রোগীর চাপ বাড়তে পারে। দুর্যোগের কারণে সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হলে গুরুতর রোগীকে অন্য হাসপাতালে নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটির পর্যাপ্ত সক্ষমতা নিশ্চিত করা শুধু চিকিৎসাসেবার বিষয় নয়, বরং উপকূলের মানুষের জীবন রক্ষার সঙ্গেও জড়িত। মসজিদকুড় গ্রামের আবু তৈয়ব বলেন, নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ার পরও বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হচ্ছে। দ্রুত নির্মাণকাজ শেষ করে ৫০ শয্যার পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা চালু করা প্রয়োজন। সাধারণ মানুষের চিকিৎসার জন্য উপজেলা পর্যায়ের এই হাসপাতালের ওপর নির্ভরতা অনেক বেশি বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ভবনসংকটের পাশাপাশি জনবল ঘাটতি। হাসপাতালটির সংকট শুধু শয্যাসংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ান ও সহায়ক কর্মীর ঘাটতিও চিকিৎসাসেবার স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনায় বাধা সৃষ্টি করছে বলে জানিয়েছে অনেকেই। তারা মনে করেন পর্যাপ্ত অবকাঠামো ও প্রয়োজনীয় জনবল ছাড়া মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা কঠিন। তাই নতুন ভবন নির্মাণের পাশাপাশি চিকিৎসক, নার্স, ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুবিধা এবং জরুরি চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তারা। হাসাপাতালে কর্মরত চিকিৎসকরা জানান, ভবন ও জনবলসংকটের কারণে নানা ধরনের সমস্যা রয়েছে। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেই রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমাদী খান সাহেব কোমর উদ্দিন ডিগ্রি কলেজের সহকারি অধ্যাপক মোঃ হাফিজুর রহমান বলেন, উপকূলীয় এলাকার স্বাস্থ্য অবকাঠামো সাধারণ এলাকার তুলনায় আরও সক্ষম হওয়া প্রয়োজন। দুর্যোগের সময় একসঙ্গে অনেক মানুষের চিকিৎসার প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। তিনি আরও বলেন, বছরের পর বছর ধরে নতুন ভবন নির্মাণ ও ৫০ শয্যার সেবা চালুর কথা শোনা গেলেও বাস্তবে মানুষ এখনো ১৯ শয্যার অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করছে। দীর্ঘ সময়েও সমস্যার সমাধান না হওয়া দুঃখজনক। তিনি জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহনের দাবি জানান। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা অফিসার ডাঃ মোঃ রেজাউল করিম বলেন, হাসপাতালের ৩১ শয্যা বিশিষ্ট ভবনটির টেন্ডার পক্রিয়া সম্পন্ন করা হলেও এখনও কাজ শুরু করা হয়নি। ইতিমধ্যে ঠিকাদার কাজের জন্য মালামাল আনার জন্য প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অন্যদিকে ৫০ শয্যার ভবন নির্মানে কাজে মাটি পরীক্ষার শেষে আটকে আছে। বিষয়টি উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।



