জাতীয় সংবাদ

আলোচনা-সমালোচনায় ‘ক্রসফায়ার’

পুুলিশ প্রধানের বক্তব্য ঘিরে উত্তাপ
অধিকার ও টিআইবির উদ্বেগ
পুলিশ সদর দপ্তরের ব্যাখ্যা

প্রবাহ রিপোর্ট : পুলিশ কঠোর হলে বলা হয় ‘ফ্যাসিস্ট পুলিশ’, আবার নীরব থাকলে বলা হয় ‘দুর্বল পুলিশ’। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও অপরাধ দমনে সরকার যদি অনুমতি দেয় এবং প্রয়োজন হয়, তবে পুলিশ ক্রসফায়ার করতেও পিছপা হবে না বলে মন্তব্য করেছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ও কমিউনিটি ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির চেয়ারম্যান মো. আলী হোসেন ফকির।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর চকবাজারের শাহজাহান ইমাম টাওয়ারে কমিউনিটি ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির ইসলামিক ব্যাংকিং সেবা ‘কমিউনিটি ইসলামিক’-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
‘ব্যাংকিং খাতে নৈতিকতা ও স্বচ্ছতার তাগিদ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে ব্যাংকিং খাতের নানা অনিয়ম ও সুদের কুফল নিয়ে কথা বলেন আইজিপি।
তিনি বলেন, ইসলামে সুদ ও ঘুষ সম্পূর্ণ হারাম। প্রকৃত ইসলামিক ব্যাংকিং হতে হবে সম্পূর্ণ সুদুমুক্ত, যেখানে থাকবে অংশীদারিত্ব (পার্টনারশিপ), নৈতিকতা এবং ফেয়ার বিজনেস বা স্বচ্ছ জবাবদিহিতা।
অতীতে ব্যাংকিং খাতে বিভিন্ন অনিয়ম, ব্যাংক দখল এবং উচ্চ মুনাফার লোভ দেখিয়ে সাধারণ গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণার তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের সুপারভিশন ও মনিটরিং ঠিক না থাকলে যতই আইন থাকুক না কেন, তা কার্যকর হবে না। গ্রাহক ও বাস্তবায়নকারী উভয় পক্ষকেই নৈতিকতার জায়গায় থাকতে হবে।’
বর্তমান ম্যানেজমেন্টের অধীনে গ্রাহকদের সম্পূর্ণ আস্থা রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, অতীতে ঘটে যাওয়া কোনো অনিয়ম বা বিপর্যয় এখন আর ঘটার সুযোগ নেই। পাশাপাশি মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের (এমএফএস) মনিটরিং আরও জোরদার করার ওপর জোর দেন তিনি।
পুলিশকে অকার্যকর করার চক্রান্ত বরদাস্ত করা হবে না উল্লেখ করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কঠোর বার্তা দিয়ে আইজিপি বলেন, পাড়া-মহল্লায় মাদকের বিস্তার রোধে পুলিশ জিরো টলারেন্স নীতিতে কাজ করছে।
পুলিশ সদস্যদের কেউ অপরাধ করলে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমাদেরও চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স রয়েছে। কিন্তু কথায় কথায় পুলিশের ওপর চড়াও হওয়া বা পুলিশকে অকার্যকর করার চেষ্টা করা হলে সমাজব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও অপরাধ দমনে সরকার যদি অনুমতি দেয় এবং প্রয়োজন হয়, তবে আমরা ক্রসফায়ারও করবো। পুলিশকে এমপাওয়ার না করলে এবং আইন প্রয়োগের সুযোগ না দিলে সমাজে শান্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। গুজব ও মিথ্যা প্রচারণায় কান না দিয়ে সংবিধান ও আইন অনুযায়ী দায়িত্ব পালনে সকলের সহযোগিতা কামনা করছি।’
আইজিপি অভিযোগ করে বলেন, ‘গত ১৭ বছর ধরে যারা নেতৃত্ব দিয়ে দেশকে অকার্যকর করেছে, তাদের আমলেই পাড়ায়-মহল্লায় মাদকের বিস্তার ঘটেছে। তৎকালীন সরকারি দলের নেতারা মাদক থেকে মাসোহারা পেতেন এবং পুলিশেরও কিছু সদস্য এতে জড়িত ছিলেন। তবে আমরা আগে নিজেদের ঘর পরিষ্কার করছি। গত দুই মাসে ২৭ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে জেলে পাঠানো হয়েছে।’
সম্প্রতি পুলিশের সমালোচনা করে দেওয়া নাগরিক সমাজের এক বিবৃতির প্রসঙ্গে ক্ষোভ প্রকাশ করে আইজিপি বলেন, ‘১০১ জন নাগরিক বলছেন গোপনীয়তার কথা। আপনি কি পুলিশ হাউজিংয়ের ভেতরে গোপনে গিয়ে মদ খাবেন, মাতলামি করবেন, কোকেন-হিরোইন গ্রহণ করবেন? সংবিধানের কোথায় লেখা আছে যে এসব আপনার অধিকার? স্বাধীনতা আছে বলে যা ইচ্ছা তা করতে পারবেন না, আইনের আওতায় থাকতে হবে।’
পুলিশের যোগ্যতা নিয়ে সমালোচনার জবাবে আইজিপি বলেন, ‘আপনারা বলেন অশিক্ষিত পুলিশ নিয়োগ দেন, কনস্টেবলের আবার কি জ্ঞান লাগে? অথচ এই কনস্টেবলই তৃণমূল পর্যায়ে আপনাকে সেবা দিচ্ছে। ওর সঙ্গে ঝামেলা হলেই বলেন পুলিশ খারাপ। আবার নিয়োগের সময় বলেন শিক্ষিত লোকের প্রয়োজন নেই। কিন্তু পুলিশেই সবথেকে বেশি শিক্ষিত লোক দরকার, কারণ তাকে সমাজের সব শ্রেনির মানুষকে কন্ট্রোল করতে হবে।’
তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ফেল করলে রাস্তায় পুলিশের সঙ্গে ছাত্রদের মারামারি হয়, ইন্ডাস্ট্রিতে বেতন না দিলে শ্রমিকের মারামারি হয় পুলিশের সঙ্গে। পুলিশকে অকার্যকর করে সব দায় পুলিশের ওপর চাপানো যাবে না। সংবিধানে পুলিশের কাজের চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স রয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর পুলিশের ডিউটি করতে ভয় পাওয়ার যে পরিস্থিতি ছিল, সেখান থেকে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে একটি সুখী-সমৃদ্ধময় বাংলাদেশ গঠনের জন্য পুলিশ দিন-রাত কাজ করছে।’
‘কমিউনিটি ইসলামিক’-এর এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন কমিউনিটি ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির পরিচালকরা, ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং ব্যাংকের বিভিন্ন পর্যায়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, দেশের শরী’আহভিত্তিক ব্যাংকিং সেবা সম্প্রসারণ এবং গ্রাহকদের জন্য আধুনিক বিকল্প ব্যাংকিং সুবিধা চালুর ক্ষেত্রে ‘কমিউনিটি ইসলামিক’-এর এই যাত্রা একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকবে।
আইজিপির বক্তব্যে টিআইবির উদ্বেগ : এদিকে, পুলিশ মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) ‘সরকার অনুমতি দিলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রয়োজনে পুলিশ ক্রসফায়ার করবে’—এমন বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সোমবার (২৬ অক্টোবর) টিআইবি থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তীব্র নিন্দা ও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
সংস্থাটির মতে, এই বক্তব্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যর্থতা ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা মোকাবিলায় বিচারবহির্ভূত হত্যাকে অপরাধ দমনের গ্রহণযোগ্য হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠার বিপজ্জনক বার্তা দেয়। একে সংবিধান ও আইনের শাসনের প্রতি চরম অবমাননা উল্লেখ করে অবিলম্বে বক্তব্য প্রত্যাহার, আইজিপির জবাবদিহি এবং বিচারবহির্ভূত হত্যার বিরুদ্ধে সরকারের ঘোষিত অবস্থানের পরিপন্থী ঘোষণার জন্য জবাবদিহি নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছে টিআইবি।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিজেদের ব্যর্থতার ঢাল হিসেবে পুলিশপ্রধান কি ঘৃণিত ক্রসফায়ারকে ব্যবহার করতে চান? সরকারের অনুমতি শর্ত জুড়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকে বৈধতা দেয়ার পথ খোঁজা কি একই সঙ্গে আইনসম্মতভাবে অপরাধ দমনে ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি নয়? পুলিশের দায়িত্ব পেশাদার তদন্ত, অপরাধী শনাক্ত এবং গ্রহণযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযুক্তকে বিচারের মুখোমুখি করা। এই বিকল্প হিসেবে ক্রসফায়ার সামনে আনা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা সমাধান হতে পারে না, বরং পেশাগত দেউলিয়াত্বের দৃষ্টান্ত।
আইজিপি একই বক্তব্যে আইন ও সংবিধান অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের কথা বলেছেন, আবার সরকারের অনুমতি পেলে ক্রসফায়ার করার কথাও বলেছেন- এই দুই অবস্থান সাংঘর্ষিক। সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদে সুরক্ষিত আইনের আশ্রয়লাভ এবং জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার নির্বাহী সিদ্ধান্তে বাতিল করা যায় না। অভিযোগ যত গুরুতরই হোক, বিচারপ্রক্রিয়া পাশ কাটিয়ে কাউকে হত্যার এখতিয়ার পুলিশের নেই।’
অতীতের অভিজ্ঞতা স্মরণ করিয়ে দিয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘সিনহা হত্যা মামলায় পুলিশ সদস্যদের দ- এবং এই মামলার রায়সংক্রান্ত প্রতিবদনে উঠে আসা ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়, নির্যাতন ও হত্যার অভিযোগ এই পদ্ধতির ভয়াবহতা স্মরণ করিয়ে দেয়। টেকনাফের কাউন্সিলর একরামুল হকের কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার ঘটনায় পরিবারের প্রকাশিত অডিও ও হত্যার অভিযোগও ব্যাপক প্রশ্ন তুলল। আবার নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের মামলায় সাবেক র‌্যাব কর্মকর্তাদের দ- আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্ষমতার অপব্যবহারমূলক ব্যবহারকে বিচারিকভাবে প্রতিষ্ঠিত উদাহরণ। হাজারো অভিজ্ঞতার পর পুলিশের পেশাগত শুদ্ধিসহ রাষ্ট্রসংস্কারের প্রত্যাশার পটভূমিতে পুলিশপ্রধান আবার ক্রসফায়ারকে সম্ভাবনার সামনে এনেছেন। অতীতের অপরাধ থেকে পুলিশ কি শিক্ষা নিয়েছে- এর উত্তর তাকেই দিতে হবে।’
ড. জামান আরও বলেন, ‘পুলিশপ্রধানের এমন বেপরোয়া ও অপরিণামদর্শী বক্তব্য মাঠপর্যায়ে অবৈধ বলপ্রয়োগের প্রচ্ছন্ন ছাড়পত্র হিসেবে প্রতীয়মান হতে পারে। যার দায়িত্ব বাহিনীকে আইনের মধ্য থেকে পরিচালনা করা, তিনি ক্রসফায়ারকে বিকল্প হিসেবে সামনে আনলে তার দায়িত্ববোধ ও নেতৃত্বের উপযুক্ততা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অনিবার্য। যার নেতৃত্বে নাগরিকের জীবন ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত হবে- জনগণ সেই আস্থা রাখবে কীভাবে?
অন্যদিকে, গত ১৪ সেপ্টেম্বর আইনমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, সরকারের সন্ত্রাস দমনে ক্রসফায়ারের পথে যাবে না এবং বিদ্যমান আইন দিয়েই সন্ত্রাস দমন সম্ভব। এরপরও পুলিশপ্রধান কেন সরকারের অনুমতি সাপেক্ষে ক্রসফায়ারের সম্ভাবনা সামনে এনেছেন? এই অসঙ্গতির ব্যাখ্যা এবং ঘোষিত অবস্থান বাস্তবায়নে তার জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, সরকারকে তা স্পষ্ট করতে হবে।’
টিআইবি বলেছে, পুলিশি বলপ্রয়োগ অবশ্যই আইনসম্মত, প্রয়োজনীয় ও আনুপাতিক হতে হবে। আন্তর্জাতিক মানদ- অনুযায়ী, অস্ত্রের ইচ্ছাকৃত প্রাণঘাতী ব্যবহার কেবল জীবন রক্ষায় কঠোরভাবে অনিবার্য পরিস্থিতিতেই গ্রহণযোগ্য। এই সীমিত সুযোগকে বিচারবহির্ভূত হত্যার অনুমোদন হিসেবে উপস্থাপনের অবকাশ নেই। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অর্থ বা পেয়ে পুলিশের সমালোচনা করার অভিযোগ প্রসঙ্গে সংস্থাটি বলেছে, কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অপরাধের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে প্রমাণের ভিত্তিতে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। তাছাড়া অভিযোগ মুক্ত গণমাধ্যমের নজরদারি ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং স্বাধীন সাংবাদিকতা নিরুৎসাহিত করার ঝুঁকি তৈরি করে। পুলিশের কাজের পরিবেশ ও সক্ষমতা নিশ্চিত করার প্রয়োজন সমালোচনা এড়ানোর যুক্তি হতে পারে না।
আইজিপির বক্তব্যের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা গ্রহণ, প্রকাশ্যে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়া এবং বক্তব্য প্রত্যাহার ও তার প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি। জবাবদিহি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব থেকে অপসারণের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
অধিকারের তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ : আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের মাধ্যমে ‘ক্রসফায়ার’-এর নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-ের পক্ষে পুলিশ মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) দেওয়া বক্তব্যের তীব্র নিন্দা, ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’। সোমবার ২৬ অক্টোবর এক সভায় পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোহাম্মদ আলী হোসেন ফকির বলেন, ‘সরকার অনুমোদন দিলে প্রয়োজনে ক্রসফায়ার করতেও পিছপা হবে না পুলিশ।’ আইজিপির এমন বক্তব্যের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে অবিলম্বে তা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি।
এক বিবৃতিতে অধিকার উল্লেখ করেছে, শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে দেশে ব্যাপকভাবে বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-, গুম ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছিল। ওই সময় ভিন্নমতাবলম্বী ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষ ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হন। এসব বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-ের দায়ে বিলুপ্ত হওয়া সংস্থা র‌্যাবকে (বর্তমানে এসআরবি) যুক্তরাষ্ট্র কালো তালিকাভুক্ত করেছিল। হাসিনার আমলে সংঘটিত এসব মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা অন্তর্র্বতীকালীন সরকার এবং বর্তমান সরকারের আমলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারের সম্মুখীন হয়েছেন এবং জড়িতদের অনেকে বর্তমানে বিদেশে পালিয়ে আছেন।
সংস্থাটি মনে করে, পুলিশের সর্বোচ্চ পদধারী ব্যক্তির এ ধরনের বক্তব্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-ের ঢালাও ‘ছাড়পত্র’ দেওয়ার শামিল।
অধিকার আরও জানায়, বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর ইতোমধ্যে ৫টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটেছে বলে তারা নথিভুক্ত (ডকুমেন্ট) করেছে।
আইজিপির এই ধরনের বক্তব্যের ফলে সৃষ্টি হওয়া পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে গভীরভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে অধিকার। একই সঙ্গে পুলিশ মহাপরিদর্শকের বিতর্কিত এই বক্তব্য অবিলম্বে প্রত্যাহার করার দাবি জানানোর পাশাপাশি এই সময়ে সংঘটিত সব বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-ের নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে অভিযুক্তদের বিচারের মুখোমুখি করার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
ব্যাখ্যা দিলো পুলিশ সদর দপ্তর : ক্রসফায়ারের প্রয়োজন হলে ও সরকার অনুমতি দিলে পুলিশ সেটাই করবে বলে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের করা মন্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। সোমবার (২৬ অক্টোবর) সন্ধ্যায় এক বিজ্ঞপ্তিতে এ ব্যাখ্যা দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।
ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, আইজিপি আইন প্রয়োগের কঠোরতা বোঝাতে গিয়ে ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি আক্ষরিক অর্থে উল্লেখ করেছেন। তিনি বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- বা বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে শাস্তি দেওয়ার লক্ষ্যে ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি উল্লেখ করেননি।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, রাজধানীতে কমিউনিটি ব্যাংকের চকবাজার ইসলামিক ব্যাংকিং শাখা উদ্বোধন অনুষ্ঠানে আজ আইজিপি আলী হোসেন ফকিরের বক্তব্যে ‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদ ও শিরোনামে পুলিশ সদর দপ্তরের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশ পুলিশ রাষ্ট্রের প্রধান আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। অপরাধ দমন, অপরাধী গ্রেপ্তার, জনশৃঙ্খলা বজায় রাখা ও জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পুলিশের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। এসব দায়িত্ব পালনকালে পুলিশ সদস্যদের কখনো কখনো অপরাধী, সংঘবদ্ধ হামলাকারী কিংবা আইন অমান্যকারী ব্যক্তিদের সরাসরি প্রতিরোধ ও আক্রমণের মুখোমুখি হতে হয়।
দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধী গ্রেপ্তার, অবৈধ কর্মকা- প্রতিরোধ ও সরকারি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসে পুলিশের ওপর ১৭৬টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলায় চারজন পুলিশ সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন ও ৩৭০ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। দেশের প্রচলিত আইন, বিশেষ করে, আত্মরক্ষার অধিকার, দ-বিধি-১৮৬০, ফৌজদারি কার্যবিধি-১৮৯৮ ও পুলিশ অ্যাক্ট-১৮৬১-এ পুলিশের আত্মরক্ষার অধিকারের কথা বলা রয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আইজিপি তার বক্তব্যে মাদক কারবারি, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও জননিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টিকারী অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে পুলিশের দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। তিনি এ ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগের কঠোরতা বোঝাতে গিয়ে ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি আক্ষরিক অর্থে উল্লেখ করেছেন। তিনি বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- বা বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে শাস্তি দেয়ার লক্ষ্যে ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি উল্লেখ করেননি।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, একই অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের সম্পর্কে আইজিপির মন্তব্য নিয়েও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। প্রকৃত অর্থে তিনি সাংবাদিকদের সম্পর্কে ঢালাও কোনো মন্তব্য করতে চাননি, এটি অসাবধানতাবশত হয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশ মানবাধিকার সমুন্নত রেখে জনগণের জানমাল রক্ষা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় পেশাদারত্ব ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button