কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কালো অধ্যায় : চাই সচেতন প্রয়াস

দিনে দিনে প্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রগতি হয়েছে। অফিস-আদালত থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন কাজকর্মে লেগেছে আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া। ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে যোগাযোগব্যবস্থা আগের তুলনায় অনেক সহজ হয়েছে। অন্যদিকে অপরাধীচক্র এই প্রযুক্তিকেই বানিয়েছে হাতিয়ার। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) অনেকের কাছে আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। বহু মানুষের জীবন অসনীয় করে তুলেছে। সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হওয়ার পাশাপাশি অনেকে বিপুল আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির শিকারও হয়েছেন। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই সাইবার জগতের অপরাধীরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। এআই ঘিরে বড় যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা হলো সত্য-মিথ্যার ভেদরেখা মুছে দেওয়া। এআই ব্যবহার করে অনেক ছবি ও ভিডিও কনটেন্ট তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। তাৎক্ষণিক বোঝার উপায় থাকে নাÑএটি সত্য, নাকি নকল। অনেকে সত্য মনে করে সেই কনটেন্ট ছড়াতে থাকেন। অনেক সময় দেখা গেছে, সামাজিক উত্তেজনা তৈরি করে একটি দল নিজেদের ফায়দা হাসিল করে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্যও এআই দিয়ে তৈরি কনটেন্ট ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এমন অপতথ্য অনেকের মৃত্যুর কারণ পর্যন্ত হয়েছে। শুধু কি বাংলাদেশ? না। সারা বিশ্বেই বাড়ছে এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনিকে নিয়েও ছড়ানো হয়েছে এআই দিয়ে তৈরি একাধিক ভুয়া ছবি ও ভিডিও। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মেলোনি জানান, তাঁর ভুয়া ছবিকে বাস্তব হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘ডিপফেক ও এআই অত্যন্ত বিপজ্জনক হাতিয়ার, যা মানুষকে বিভ্রান্ত ও অপমানিত করতে পারে।’ তবে আমাদের দেশের পরিস্থিতি বেশ নাজুক। কেননা এখানে অপরাধ বাড়লেও সেই তুলনায় আইনের প্রয়োগ নেই। সবচেয়ে বড় কথা হলো, সাধারণ মানুষের মধ্যে অভিযোগ করার প্রবণতাও কম। ৯০ শতাংশের বেশি ভুক্তভোগী মামলা করতে চান না। এর কারণও অবশ্য অজানা নয়। বিচারের নামে হয়রানি, দীর্ঘসূত্রতা দেশের সাধারণ চিত্র। এ কারণে ভুক্তভোগী অনেকেই আইনের পথে যেতে চান না। এতে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ আরো কঠিন হয়ে পড়ে এবং অপরাধীরাও ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায়। এটি ঠিক যে আমাদের দেশে ইন্টারনেট ব্যবহাকারীদের অনেকেই সচেতন নন। পাসওয়ার্ড সংরক্ষণের মতো প্রাথমিক নিরাপত্তার বিষয়গুলো অনেকের অজানা। আবার হয়রানির শিকার হলে কোথায় অভিযোগ জানাতে হবে, সেই তথ্যও অনেকের কাছে নেই। এসব দুর্বলতার সুযোগে সাইবার অপরাধ বেড়েই চলছে। প্রযুক্তিবিদ ও সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির বলেন, ‘প্রযুক্তি দিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এআই বা অন্য প্রযুক্তিতে ছবি-ভিডিও বিকৃত করে ছড়ানো কিংবা কারো সম্মানহানি করার ঘটনায় কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করতে হবে, যাতে অন্যরা এমন কাজ করতে সাহস না পায়। পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে হবে, বিশেষ করে কম বয়সী ছেলেমেয়েদের মধ্যে। বিকৃত ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে সেটিকে অতিরিক্ত গুরুত্ব না দেওয়ার মানসিকতা তৈরি করা জরুরি। আমরাও মনে করি, এই যুগে বসে প্রযুক্তি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ নেই। যেকোনো বিষয়ের ভালো-মন্দ উভয় দিক থাকে। আমাদের ভালো দিক গ্রহণ করতে হবে। যারা প্রযুক্তির অপব্যবহার করছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। সবচেয়ে জরুরি সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশ। যুগে যুগে দেখা গেছে, সমাজে ইতিবাচক ধারা শক্তিশালী হলে কালো অধ্যায় সেই স্রোতে ভেসে যায়।
