সাভার-আশুলিয়া ও মিরপুরে পোশাক শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষে রণক্ষেত্র

# পুলিশ বক্সে ও পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগ, ব্যাপক ভাংচুর #
# গাজীপুরে বিজিবি মোতায়েন, নাশকতা ও অগ্নিসংযোগে নিষিদ্ধ লীগের ১১ সদস্য আটক #
প্রবাহ রিপোর্ট ঃ ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণসহ অন্যান্য দাবিতে তৈরি পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলনের মধ্যে ঢাকার সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে ও মিরপুরে পুলিশ শ্রমিক দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। সংঘর্ষ চলাকালীন বিক্ষুদ্ধ শ্রমিকরা গাজীপুর পুলিশ বক্সে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং শ্রমিকরা একই দাবিতে মিরপুরে মেট্রোষ্টেশনের নীচে পুলিশের গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। ঘটনায় ১১৭ কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে শিল্প পুলিশ। এ ছাড়া নাশকতা ও অগ্নিসংযোগে নিষিদ্ধ আ’লীগের ১১ সদস্যকে আটক করেছে পুলিশ।
গাজীপুরে পুলিশ বক্সে আগুন, বিজিবি মোতায়েন ঃ সকাল সাড়ে আটটার দিকে কালিয়াকৈরের সফিপুর এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করেন শ্রমিকেরা। এতে সড়কের উভয় পাশে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। একপর্যায়ে গাজীপুর মহানগরীর কোনাবাড়ী এলাকায় আন্দোলনকারীদের একাংশ একটি পুলিশ বক্সে আগুন ধরিয়ে দেয়। এ সময় সেখানে দায়িত্ব পালনরত কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
গাজীপুর মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. তাহেরুল হক চৌহান বলেন, ‘আমরা শান্তিপূর্ণ উপায়ে আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করছি। তবে দাবি আদায়ের নামে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করা হলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’
শ্রমিক ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বেশ কিছুদিন ধরেই শিল্পাঞ্চল গাজীপুরে বেতন বাড়ানোর দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে আসছেন শ্রমিকেরা। এর অংশ হিসেবে আজ সকালেও শ্রমিকেরা প্রথমে নিজ নিজ কারখানায় প্রবেশ করেন। তবে কিছুক্ষণ পরই কাজ বন্ধ করে তাঁরা বাইরে বেরিয়ে আসেন এবং ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে নেমে পড়েন। লাঠিসোঁটা হাতে হাজার হাজার শ্রমিক মহাসড়কে অবস্থান নেওয়ায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়; এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ যাত্রী ও দূরপাল্লার পরিবহনের যাত্রীরা। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সম্প্রতি গাজীপুরের কোনাবাড়ী, মৌচাক ও সফিপুরসহ বিভিন্ন এলাকার কারখানার শ্রমিকেরা মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে দফায় দফায় বিক্ষোভ করছেন। সরকার শ্রমিকদের বেতন পর্যালোচনায় নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দিলেও অনেক কারখানায় অসন্তোষ ও আন্দোলন থামেনি। এর আগে গতকাল শনিবার দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত মহাসড়ক অবরোধ করে রেখেছিলেন শ্রমিকেরা। রাতে তারা অবরোধ তুলে নিলেও আজ সকাল থেকে পুনরায় সড়কে অবস্থান নেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেখানে জেলা পুলিশ, শিল্প পুলিশ ও হাইওয়ে পুলিশের পাশাপাশি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে।
মিরপুরে শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ. পুলিশের গাড়িতে আগুন ঃ রাজধানীর মিরপুরেও টানা আন্দোলনের অংশ হিসেবে রোববার সকাল ৯টার দিকে মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরে অবস্থান নিয়ে সড়ক অবরোধ করেন বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা। এতে ওই এলাকা দিয়ে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায় এবং আশপাশের সড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। এ সময় শ্রমিক ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় দুই ঘণ্টা বন্ধ ছিল মেট্রোরেলের তিন স্টেশন। মিরপুর-১১ মেট্রো স্টেশনের নিচে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
বেলা ১২টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত মেট্রোরেলের মিরপুর-১০, মিরপুর-১১ ও পল্লবী স্টেশন বন্ধ থাকে। এ সময় মেট্রো রেল চলাচল করলেও এই তিন স্টেশনে কোনো ট্রেন থামেনি। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মেট্রোরেলের পরিদর্শক (তদন্ত) মো. মহসিন শেখ। তিনি বলেন, ‘শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে নিরাপত্তাজনিত কারণে সাময়িক সময়ের জন্য মেট্রোরেলের তিন স্টেশন বন্ধ রাখা হয়। তবে দুপুর ২টায় সবগুলো স্টেশন খুলে দেওয়া হয়েছে।’
এদিকে মিরপুরে পোশাক শ্রমিক ও পুলিশের মধ্যে সংর্ঘষ ও ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করেছে। আন্দোলনকারীরাও মিরপুর-১১ মেট্রো স্টেশনের নিচে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেয়।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম কমিশনার মহিদুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘আন্দোলনকারী শ্রমিকদের সঙ্গে সরকারবিরোধী বা রাষ্ট্রবিরোধী কোনো চক্র যুক্ত হয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘পর্যাপ্ত পুলিশ সদস্য ও কর্মকর্তাদের নিয়ে সড়ক পরিষ্কার করা হয়েছে। জনভোগান্তি কমাতে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করা হয়েছে। তবে কোনো লাঠিচার্জ করা হয়নি। এ ঘটনায় কাউকে আটক করা হয়নি এবং পুলিশের কোনো সদস্য আহত হননি।’ আন্দোলনকে ঘিরে নাশকতার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত ও আটকের অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন পুলিশের এই কর্মকর্তা।

