সম্পাদকীয়

অটোরিকশা বন্ধ করবেন না : নীতিমালা আনুন

দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে অটোরিকশার বাস্তবতাকে অস্বীকার করার উপায় নেই। একদিকে যেমন বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ এনে দিয়েছে, মানুষের যাতায়াত খরচে সাশ্রয় ও সময় বাঁচছে, অন্যদিকে সড়কে বিশৃঙ্খলা ও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণও হয়ে দাঁড়িয়েছে এই অটোরিকশা। আবার সহজলভ্য হওয়ায় অনেকের দৈনন্দিন যাতায়াতের অপরিহার্য বাহনও হয়ে উঠেছে এটি। সবকিছু বিবেচনা সত্ত্বেও এই বিশৃঙ্খল অবস্থা চলতে দেওয়া যায় না। এমন প্রেক্ষাপটে সরকার অটোরিকশা বিধিমালা প্রকাশ করেছে, যেখানে নিবন্ধনসহ বেশ কিছু নিয়ম-কানুনের বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, বিধিমালার সুষ্ঠু বাস্তবায়ন হলে সড়কে শৃঙ্খলা অনেকটাই ফিরে আসবে। অটোরিকশার নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং নিবন্ধনের মেয়াদ ৫ বছর। নবায়ন সাপেক্ষে ব্যবহার করা যাবে। ই-রিকশার অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল হয়েছে ১২ বছর। গতকাল থেকেই দেশের ১৩টি সিটি করপোরেশনে ই-রিকশার নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এ ছাড়া নবায়ন, ফিটনেস, গতিসীমা ও নির্দিষ্ট সড়কে চলাচলের বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়েছে। বিধিমালায় দুই যাত্রী ধারণক্ষমতাসম্পন্ন ই-রিকশার এককালীন নিবন্ধন ফি আট হাজার টাকা এবং বার্ষিক নবায়ন ফি চার হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। চার যাত্রী ধারণক্ষমতাসম্পন্ন ই-রিকশার নিবন্ধন ফি ১০ হাজার টাকা এবং বার্ষিক নবায়ন ফি পাঁচ হাজার টাকা। প্রতিটি ই-রিকশার ফিটনেস সনদ ফি নির্ধারণ করা হয়েছে এক হাজার টাকা। এক নামে পাঁচটির বেশি নিবন্ধন করা যাবে না। যাত্রী নিরাপত্তার স্বার্থে গতিসীমাও নির্দিষ্ট করা হয়েছে। জাতীয় মহাসড়ক, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, প্রধান বাসরুট, ফুটপাত ও প্রশাসনের নিষিদ্ধঘোষিত সড়কে অটোরিকশা চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এমনকি এক সিটি করপোরেশনে নিবন্ধিত অটোরিকশা অন্য সিটি করপোরেশনে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে চলাচল করতে পারবে না। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের অর্থনীতি নানামুখী চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে। বিনিয়োগ স্থবিরতা, কর্মসংস্থানের অভাবÑএর মধ্যে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে নিম্ন আয়ের মানুষ সীমাহীন চাপে রয়েছে। এই বাস্তবতায় অনেকেই অটোরিকশাকে আয়ের মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছে। তবে একটি কথা না বললেই নয়, দেশে অটোরিকশা চালু হয়েছে প্রায় দেড় দশকেরও বেশি সময় আগে। এত দিনেও কেন এটিকে একটি কার্যকর নীতিমালার মধ্যে আনা গেল না। ধারণা করা হয়, এর পেছনে প্রভাবশালী ব্যক্তি, সিন্ডিকেটের কালো হাত রয়েছে। তাদের কারণেই দেশের বিশৃঙ্খল পরিবহন খাত আরো নাজুক হয়ে পড়েছে। কাজেই এবারও প্রকাশিত বিধিমালা বাস্তবায়নে কোনো বাধা আসবে না, তার নিশ্চয়তা নেই। এসব প্রতিবন্ধকতা কঠোরভাবে মোকাবেলা করতে হবে। সিটি করপোরেশনগুলোতে সেবার মান নিয়েও রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। সেবা নিতে গিয়ে পদে পদে হয়রানির শিকার হতে হয়। অটোরিকশার নিবন্ধন কর্মকা- ঘিরে যেন নতুন দালালচক্র গড়ে উঠতে না পারে, সেটি নিশ্চিত করা দরকার। আরো লক্ষণীয় বিষয় হলো, দেশে অটোরিকশার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। অন্যদিকে প্রতিদিনই নতুন নতুন এসব বাহন রাস্তায় নামছে। এ কারণে শহরাঞ্চলে কতটি অটোরিকশা চলাচল করতে পারবে, তারও সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করা জরুরি। কেননা যত্রতত্র অটোরিকশা উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে নীতিমালা বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে। এ ছাড়া বর্তমানে নানা ধরনের অটোরিকশা চালু রয়েছে। এর মধ্যে বেশির ভাগের কাঠামো ত্রুটিপূর্ণ ও বিপজ্জনক। এসব অটোরিকশা বিজ্ঞানসম্মত কাঠামোতে রূপান্তর করা দরকার। এ ক্ষেত্রে বুয়েটসহ বিভিন্ন জেলার পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আমরা মনে করি, নতুন নীতিমালা বাস্তবায়নে সরকারসহ সব পক্ষের দায়িত্বশীল পদক্ষেপ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে অটোরিকশাচালকদেরও এগিয়ে আসতে হবে। নিয়ম-কানুন মেনে চলার প্রতি সবার আন্তরিকতাই পারে সড়কে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button