সম্পাদকীয়

চট্টগ্রামে খুনের সংক্রমণ: সমাজের অবক্ষয় এবং পুলিশের দায়িত্ব

চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক খুনের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে গেছে, যা সমাজে বিশাল অশান্তি ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করছে। চলতি মার্চ মাসের ১৮ দিনে চট্টগ্রাম নগরী এবং জেলা জুড়ে ঘটেছে ১২টি খুনের ঘটনা। এই হত্যাগুলোর পেছনে যে কারণে সমাজের নিরাপত্তা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে, তা একেবারে সাধারণ, উদ্বেগজনকÑতর্কাতর্কি, পারিবারিক কলহ, পাওনা টাকা নিয়ে বিরোধ এবং পরকীয়া। এ ধরনের ঠুনকো কারণে খুনের ঘটনা ঘটছে, যা চট্টগ্রামের জন্য একটি বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুলিশের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রাসেল জানান, চলতি সময়ের বেশির ভাগ খুনের ঘটনা ‘অর্গানাইজড ক্রাইম’-এর মতো প্রতিরোধযোগ্য নয়, কিন্তু সচেতনতা বাড়ানোর মাধ্যমে একে আটকানো সম্ভব। তার এই মন্তব্যটি যেখানে এক ধরনের সচেতনতার আহ্বান জানাচ্ছে, সেখানে এটি এক ধরনের সোজাসাপটা সত্যও, কারণ যারা খুনের শিকার হচ্ছেন এবং যারা খুনি, তাদের মধ্যে অধিকাংশই একে অপরের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সদস্য। ভাইয়ের হাতে ভাই খুন, স্বামীর হাতে শাশুড়ি খুনÑএসব ঘটনা সমাজের ভেতর এক বিশাল অস্থিরতা ও অবক্ষয়ের ইঙ্গিত দেয়। তবে এই ধরনের অপরাধের প্রবণতা শুধুমাত্র চট্টগ্রামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটা বাংলাদেশের অন্যান্য শহর ও গ্রামাঞ্চলেও বৃদ্ধি পাচ্ছে। মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে ঘটেছিল আনোয়ারা উপজেলায় মেয়ের স্বামীর হাতে খুন হওয়া রশিদা খাতুন, সাতকানিয়ায় গণপিটুনির ঘটনা, এবং মিরসরাইয়ে পরকীয়া ও পারিবারিক কলহের কারণে একাধিক হত্যাকা-। একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত এই হত্যাকা-গুলো একে অপরকে নিকৃষ্ট দিকে নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে সংকট হচ্ছে অপরাধী এবং শিকারি দুজনেই একে অপরকে জানতেন এবং ঘনিষ্ঠ ছিল। প্রশ্ন উঠছে, কেন সমাজে এত বেশি পারিবারিক সংঘর্ষ, কলহ এবং ক্ষোভের জন্ম হচ্ছে, যার পরিণতি হয়ে উঠছে হিংসাত্মক হত্যাকা-? বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সমাজের অবক্ষয়, দারিদ্র্য, একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধার অভাব, এবং সামাজিক যোগাযোগের খারাপ পরিবেশ এসব হত্যাকা-ের প্রধান কারণ। মানুষ যখন কোনো সমস্যা বা অস্বস্তি অনুভব করে, তখন তার মনের মধ্যে অভ্যন্তরীণ কষ্ট বাড়ে এবং তখনই সহিংসতার পথে এগিয়ে যায়। ফলে, এসব খুনের ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে একটি সামাজিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন জরুরি হলো, পুলিশ এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর ভূমিকা পালন করা, যাতে ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনা প্রতিরোধ করা যায়। যেহেতু বেশিরভাগ খুনের ঘটনার পেছনে পারিবারিক এবং ব্যক্তিগত ঝগড়া আছে, তাই সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি, জনস্বাস্থ্য এবং মনস্তাত্ত্বিক সহায়তাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। চট্টগ্রামসহ সারা দেশে এ ধরনের অপ্রত্যাশিত ও সন্ত্রাসী ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আনা জরুরি।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button