শিশু ধর্ষণ: সমাজের জন্য লজ্জাজনক ব্যাধি

বাংলাদেশে শিশু ধর্ষণের ঘটনা এক ভয়াবহ এবং উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা শুধু একটি নৃশংস অপরাধ নয়, বরং এটি আমাদের সমাজের মানসিকতার একটি গভীর সংকটের প্রতিফলন। সম্প্রতি মাগুরার ৮ বছরের শিশুটির ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা সারা দেশে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। কিন্তু এই একক ঘটনাটি কোনোমতেই নতুন নয়Ñপ্রতিদিনই এমন হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটছে, এবং বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের বড় একটি অংশ আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও পরিচিতদের দ্বারা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। এটি এমন এক সমস্যা, যা ক্রমশ আমাদের সমাজকে গভীর অন্ধকারে ধাবিত করছে।পত্রপত্রিকার খবরাখবর অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আট বছরে ৯ হাজার ৬৭৭ শিশুর সহিংসতার শিকার হওয়ার ঘটনা সামনে এসেছে। এর মধ্যে ৪ হাজার ৮০১ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে এবং ২৪০ শিশুর ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। এ পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট যে, ধর্ষণের শিকার শিশুদের মধ্যে অনেকের বয়স ৬ বছরের কম, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এই ধর্ষণের ঘটনা শুধু শহর বা শহরতলির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও এমন ঘটনা ঘটছেÑযেমন পঞ্চগড়ে তিন বছরের শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া, সৎ বাবা, চাচা, প্রতিবেশীÑএ ধরনের পরিচিত লোকজনই অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিশু ধর্ষণের ঘটনায় জড়িত। এসব অপরাধীরা তাদের দায়িত্ববোধ ভুলে শিশুদের শিকার করতে, কখনো খাদ্যের লোভ দেখিয়ে, কখনো ভয় দেখিয়ে তাদের প্রতি যৌন নিপীড়ন চালাচ্ছে। এমনকি শিশুদের শিকার করার জন্য পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা, যা সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে, তাদেরকে আরও উদ্দীপ্ত করছে। এটি একটি সামাজিক অবক্ষয়ের প্রতিফলন, যার শিকার নিরীহ শিশু। ধর্ষণের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থাপনার দিকে তাকালে, সমাজের বৃহৎ অংশের মধ্যে যে ধারণা রয়েছে, তাতে ভুক্তভোগী শিশুটির চেয়ে অপরাধী অনেক সময় পার পেয়ে যায়। পুলিশি তদন্তের দক্ষতার অভাব, অপরাধীকে শাস্তির আওতায় আনার প্রক্রিয়ায় গলদব্ল, এবং সবচেয়ে বড় কথা, সামাজিকভাবে ভিকটিম ব্লেমিংÑএগুলি শিশু ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধের পুনরাবৃত্তিকে উৎসাহিত করে। এখন প্রশ্ন আসেÑকীভাবে এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব? একদিকে যেমন আমাদের আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে, তেমনি অপরাধী শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে পুলিশের দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি, তদন্ত প্রক্রিয়া যেন দ্রুত ও সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধীদের শাস্তি দ্রুত কার্যকর করতে হলে সমাজের ভিকটিম ব্লেমিং সংস্কৃতিকে পরিহার করতে হবে। আমাদের শিশুদের নিরাপত্তার জন্য সামাজিক সচেতনতা, নিয়মিত শিক্ষা এবং মনস্তাত্ত্বিক সহায়তার ব্যবস্থা অত্যন্ত জরুরি। শিশু ধর্ষণের মতো অপরাধ শুধু আইন ও আদালতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি একটি সামাজিক রোগ। আমাদের সমাজের সাংস্কৃতিক ও মানসিক উন্নতি ঘটাতে হবে, যাতে কোনো শিশুই আর শিকার না হয়। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে সমাজের সকল স্তরে, বিশেষ করে পরিবার, স্কুল এবং মসজিদ বা মন্দিরের মতো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে শিক্ষা ও সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ পৃথিবী, তাদের অধিকার সুরক্ষিত রাখা আমাদের সকলের দায়িত্ব।
