বাগেরহাট জেলা হাসপাতালের সংকট: স্বাস্থ্যসেবা বঞ্চিত ১৮ লাখ মানুষ

বাগেরহাট জেলার প্রায় ১৮ লাখ মানুষের প্রধান চিকিৎসাকেন্দ্র ২৫০ শয্যার হাসপাতাল। অথচ চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর তীব্র সংকট, আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব ও সেবার মানের নি¤œগতির কারণে এটি কার্যত ধুঁকছে। চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে সেবা না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরছেন। জরুরি বিভাগ থেকে শুরু করে টিকিট কাউন্টার, ওয়ার্ড, ফার্মেসি, এমনকি হাসপাতালের ফ্লোর পর্যন্ত উপচে পড়া ভিড়ে পরিপূর্ণ। চিকিৎসক সংকট এতটাই প্রকট যে, যেখানে ২২০ জন চিকিৎসকের প্রয়োজন, সেখানে কর্মরত আছেন মাত্র ২১ জন। ফলে রোগীরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন না, অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ চিকিৎসকের অভাবে অচল হয়ে আছে। পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় ১০ শয্যার আইসিইউ ইউনিট বন্ধ হয়ে গেছে। নেই পর্যাপ্ত ওষুধ ও আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম, যার ফলে রোগীদের বাধ্য হয়ে খুলনা বা ঢাকায় চিকিৎসা নিতে যেতে হচ্ছে। এতে যেমন সময় নষ্ট হচ্ছে, তেমনি দরিদ্র রোগীদের জন্য এটি বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতিদিন বহির্বিভাগে গড়ে দেড় হাজার রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। ২৫০ শয্যার বিপরীতে ভর্তি থাকেন ৩৫০-৫০০ রোগী, যা ধারণক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি। নার্স ও কর্মচারীর সংকটও চরম আকার ধারণ করেছে। ৫০ জন সেবিকা দায়িত্ব পালন করছেন, যেখানে প্রয়োজন আরও ২০০ জন। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির ৩৭টি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। চক্ষু, অ্যানেসথেশিয়া, সার্জারি, নাক-কান-গলা ও কার্ডিওলজির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিভাগগুলোতে চিকিৎসক না থাকায় সেবা ব্যাহত হচ্ছে। হাসপাতালটিতে অত্যাধুনিক পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাব প্রকট। সিটি স্ক্যান, এমআরআই, ইকো, ইটিটি, ইউরোলজি, সিরাম ইলেকট্রোলাইট, থাইরয়েড পরীক্ষার মতো সুবিধা না থাকায় রোগীরা বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে পরীক্ষা করাতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে তাদের সময় ও অর্থ দুই-ই অপচয় হচ্ছে। চিকিৎসাধীন রোগীরা অভিযোগ করেছেন, সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েও প্রয়োজনীয় ওষুধ মিলছে না। ফলে তাদের বাইরের ফার্মেসি থেকে বেশি দামে ওষুধ কিনতে হচ্ছে, যা দরিদ্র রোগীদের জন্য এক ধরনের দুঃস্বপ্ন। হাসপাতালের শৌচাগারগুলো ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। শিশু ওয়ার্ডে ৪০ শয্যার বিপরীতে ভর্তি থাকে শতাধিক শিশু, ফলে চিকিৎসা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এই সংকট নিরসনে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং হাসপাতালের সেবার মান উন্নত করতে যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে। সরকারি ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে রোগীরা বিনামূল্যে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পান। জরুরি ভিত্তিতে টিকিট কাউন্টার বাড়ানো ও হাসপাতালের অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রয়োজন। স্বাস্থ্যসেবা মানুষের মৌলিক অধিকার, যা নিশ্চিত করতে না পারলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি চরমে পৌঁছাবে। বাগেরহাট জেলা হাসপাতালের বর্তমান দুরবস্থা থেকে মুক্তি পেতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে অবহেলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়, কারণ এটি মানুষের জীবন-মরণের প্রশ্নের সঙ্গে সরাসরি জড়িত।
