সম্পাদকীয়

মাসিক স্বাস্থ্য নিয়ে ট্যাবু নয়, চাই সচেতনতা ও সহমর্মিতা

নারীর প্রজননস্বাস্থ্য, আর্থসামাজিক ক্ষমতায়ন এবং ব্যক্তিগত মর্যাদার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু বহুক্ষেত্রে উপেক্ষিত বিষয় হলো মাসিক স্বাস্থ্যবিধি। সম্প্রতি রাজধানীতে আয়োজিত ‘ইনসিওরিং সেইফ মেন্সট্রুয়াল হাইজিন’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে যে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে, তা আমাদের সমাজের দীর্ঘদিনের উপেক্ষার চিত্রই তুলে ধরে। দেশের মাত্র ১৭.৪ শতাংশ নারী মাসিকের সময় স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করেন, যা একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য অত্যন্ত হতাশাজনক। এর বাইরে থাকা প্রায় ৮২ শতাংশ নারী এখনও পুরোনো কাপড়, তুলা বা অস্বাস্থ্যকর রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করেন। এর ফলে ৯৭ শতাংশ নারী জীবনের কোনো না কোনো সময়ে সার্ভিক্যাল সংক্রমণে ভোগেন, যা কখনো কখনো ক্যান্সারের মত জটিল রোগে পরিণত হয়। এই স্বাস্থ্য ঝুঁকি কেবল ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়Ñএর প্রতিক্রিয়া পরিবার, শিক্ষা এবং অর্থনৈতিক খাতেও দৃশ্যমান। গার্মেন্টস খাতে কর্মরত নারীদের মাসিকের সময় ছয় দিন পর্যন্ত কর্মস্থলে অনুপস্থিতি কিংবা স্কুলছাত্রীদের গড়ে তিন দিনের অনুপস্থিতি আমাদের অর্থনীতি ও শিক্ষাক্ষেত্রে মারাত্মক প্রভাব ফেলে। সমস্যার মূল শিকড়ে রয়েছে সচেতনতার অভাব এবং সামাজিক ট্যাবু। এখনো অনেক পরিবারে মেয়েরা তাঁদের মাসিক সম্পর্কে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারেন না। এমনকি ২০১৫ সালের এক জরিপ অনুযায়ী, মাত্র ৫ শতাংশ বাবা এবং ১ শতাংশ ভাই স্যানিটারি ন্যাপকিন কিনে দিতে আগ্রহী। এ চিত্র স্পষ্ট করে যে মাসিক এখনো অনেকের কাছে “বিব্রতকর” বা “লুকানোর” বিষয়। এই প্রেক্ষাপটে ওজিএএসবি ও স্কয়ার টয়লেট্রিজ লিমিটেডের যৌথ উদ্যোগে মাসিক স্বাস্থ্য নিয়ে যে সচেতনতামূলক কার্যক্রম শুরু হয়েছে, তা অবশ্যই প্রশংসনীয়। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের ৬০ শতাংশ নারীকে নিরাপদ মাসিক স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা একটি বাস্তবসম্মত ও জরুরি প্রয়াস। তবে শুধু কর্পোরেট বা চিকিৎসক মহলের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকেও বড় পরিসরে শিক্ষা ও জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করা প্রয়োজন। স্কুল পর্যায়ে স্বাস্থ্যশিক্ষা পাঠ্যক্রমে মাসিক স্বাস্থ্যবিধি অন্তর্ভুক্তি এবং দরিদ্র নারীদের জন্য ভর্তুকিযুক্ত বা বিনামূল্যের স্যানিটারি ন্যাপকিন সরবরাহ করা উচিত। মাসিক স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। একে ঘৃণা বা গোপনীয়তার আড়ালে না রেখে স্বাভাবিক আলোচনার অংশ করে তোলাই আমাদের সমাজের জন্য পরবর্তী অগ্রগতির ধাপ হওয়া উচিত।

 

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button