সম্পাদকীয়

কাপ্তাই হ্রদের সংকট: অবহেলার দায় কে নেবে?

রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদ শুধু একটি কৃত্রিম জলাধার নয়Ñএটি পার্বত্য চট্টগ্রামের জীবনরেখা। যোগাযোগ, কৃষি, বিদ্যুৎ উৎপাদন, মৎস্য খাত থেকে শুরু করে হাজার হাজার মানুষের জীবিকায় সরাসরি সম্পৃক্ত এই হ্রদ। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমে পানি হ্রাসের কারণে এক ভয়াবহ সংকট তৈরি হয়, যা এবার চরম রূপ নিয়েছে। দ্রুত পানি কমে যাওয়ায় একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ছয়টি উপজেলার নৌপথ। স্থবির হয়ে পড়েছে ব্যবসা, শিক্ষা ও জনজীবন। হ্রদের অব্যাহত নাব্যতা হ্রাস এবং ড্রেজিংয়ের অভাবেই এই দুরবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। রাঙামাটির ১০টি উপজেলার মধ্যে মাত্র চারটিতে সড়ক যোগাযোগ থাকলেও বাকিগুলোর একমাত্র ভরসা কাপ্তাই হ্রদের নৌপথ। কিন্তু পানির স্তর কমে যাওয়ায় জুরাছড়ি, বিলাইছড়ি, বাঘাইছড়ি ও নানিয়ারচর উপজেলার সঙ্গে জেলা সদরের সংযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এই উপজেলাগুলোর বাসিন্দারা আজ বাধ্য হয়ে চড়া ভাড়ায় ছোট নৌযান ব্যবহার করছেন, তাও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। শিক্ষার্থীরা স্কুলে যেতে পারছে না, শ্রমজীবীরা কর্মহীন, আর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা মালামাল পরিবহনে পড়ছেন চরম সংকটে। এই পরিস্থিতি শুধু মানবিক বা সামাজিক সমস্যা নয়Ñএটি একটি জাতীয় পর্যায়ের অব্যবস্থাপনার ফলাফল। কাপ্তাই হ্রদে দীর্ঘদিন ধরে কোনো কার্যকর ড্রেজিং হয়নি। ফলে হ্রদের গভীরতা কমে এসেছে আশঙ্কাজনকভাবে। একসময় যেখানে সর্বোচ্চ স্তর ছিল ১১৮ এমএসএল (মিন সি লেভেল), এখন সেখানে ৮০ এমএসএল-এ নেমে এসেছে পানি। অথচ এই হ্রদের পানির ওপর নির্ভর করে দেশের একমাত্র জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রÑকাপ্তাই কর্ণফুলী বিদ্যুৎ কেন্দ্র। বর্তমানে কেন্দ্রটির পাঁচটি ইউনিটের মধ্যে চারটি বন্ধ, বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে মাত্র চার মেগাওয়াট, যা দেশের চাহিদার তুলনায় নগণ্য। বিশেষজ্ঞরা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বহুবার ড্রেজিংয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা বললেও কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। এটি অবহেলা, সমন্বয়ের অভাব এবং পরিকল্পনার দুর্বলতার একটি দৃষ্টান্ত। প্রতিবছর খরার সময় সংকট দেখা দিলেও তা সাময়িক আলোচনা পেরিয়ে হারিয়ে যায়। কিন্তু পাহাড়ি ছড়া ও ঝরনার প্রবাহ কমে যাওয়ার বাস্তবতায় এখন কাপ্তাই হ্রদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া কোনো উপায় নেই। সরকারের উচিত অবিলম্বে একটি জরুরি ভিত্তিতে হ্রদের ড্রেজিং শুরু করা এবং হ্রদের পানি ধারণক্ষমতা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে একটি টেকসই ও পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনা গ্রহণ করা। পাশাপাশি বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়ন, বিশেষ করে সড়ক যোগাযোগ সম্প্রসারণও জরুরি হয়ে উঠেছে। রাঙামাটির জনগণ কেবল বর্ষাকালে সুবিধা পেয়ে বছরজুড়ে অবহেলায় থাকবেÑএটা কোনো আধুনিক রাষ্ট্রের নীতি হতে পারে না। কাপ্তাই হ্রদের সংকটের সমাধানে এখন আর অবহেলার সুযোগ নেই। এটি যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও জনজীবনের সমন্বিত সংকট। টেকসই সমাধানে এখনই রাষ্ট্রকে দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে।

 

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button