সম্পাদকীয়

বিশ^বিদ্যালয়ে যন্ত্রপাতি কেনায় কোটি টাকার অনিয়ম: জবাবদিহির ঘাটতি কতদূর?

গবেষণা ও উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে বরাদ্দকৃত অর্থ যদি অনিয়মের বলি হয়, তাহলে সেটি শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য নয়, গোটা জাতির জন্যই হতাশাজনক। গাজীপুর কৃষি বিশ^বিদ্যালয়ের বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে যন্ত্রপাতি কেনাকাটায় শিক্ষা অডিট অধিদপ্তর ৭ কোটি ৩০ লাখ টাকার অনিয়মের যে অভিযোগ তুলেছে, তা উদ্বেগজনক ও গভীর তদন্তসাপেক্ষ। অডিট প্রতিবেদনে দেখা গেছে, যেখানে বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য কার্যাদেশে ৯০ দিনের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল, সেখানে মাত্র সাত দিনের মধ্যে ‘সরবরাহ’ সম্পন্ন দেখিয়ে বিল পরিশোধ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, জাপান, ইন্দোনেশিয়া ও তাইওয়ান থেকে এত স্বল্প সময়ে পণ্য সরবরাহ বাস্তবিকভাবে অসম্ভবÑএটি অডিটরদের মতামত নয়, এটি বাস্তবতাও। উল্লেখযোগ্য হলো, এই যন্ত্রপাতিগুলোর বিদেশি আমদানির কোনো প্রামাণ্য কাগজ যেমন ইনভয়েস, কেমিক্যাল টেস্ট রিপোর্ট বা বাজারদর যাচাই- কিছুই পাওয়া যায়নি। বরং দেখা যাচ্ছে, বিশ^বিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রশাসনের নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তিকে ঘিরেই এই কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে, যা স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়। বিভাগের চাহিদাপত্র না থাকা সত্ত্বেও স্পেসিফিকেশন প্রণয়নের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে উপাচার্যের ঘনিষ্ঠ এক শিক্ষকের হাতে। তিনি আবার যন্ত্রপাতি গ্রহণ কমিটির আহ্বায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেনÑ যা সুস্পষ্ট স্বার্থের দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে। অভিযোগের মুখে সাবেক উপাচার্য ও সংশ্লিষ্ট অধ্যাপক নিজেদের দায় এড়ানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু তাদের বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। একটি সরকারি প্রকল্পের বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ে এত অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠলে, সেটির দায় কেউ নিতে চায় নাÑ এটি প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি ব্যবস্থার ব্যর্থতারই প্রতিফলন। শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, প্রকৃত তদন্ত ছাড়া এই অর্থের সঠিক ব্যবহারের কোনো নিশ্চয়তা নেই। গাজীপুর কৃষি বিশ^বিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসন বলেছে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতা বলে, অনেক সময়ই এমন অভিযোগ ফাইলবন্দি হয় এবং কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় না। আমরা মনে করি, এই ধরনের অনিয়মের ঘটনায় একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে সংশ্লিষ্টদের দায় নিরূপণ করা জরুরি। শুধু প্রশাসনিক ব্যবস্থা নয়, প্রয়োজনে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সম্পৃক্ততা থাকা উচিত। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কেনাকাটার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট নীতিমালার কঠোর প্রয়োগ প্রয়োজন। শিক্ষা ও গবেষণা খাতে বরাদ্দকৃত প্রতিটি টাকার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে না পারলে শুধু অর্থ অপচয় নয়, এর ফলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষা ও উন্নয়নও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই দায় এড়ানো নয়, এই অনিয়মের পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর তদন্ত আজ সময়ের দাবি।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button