সম্পাদকীয়

শস্য বিমা: কৃষকের সুরক্ষায় অবিলম্বে বাস্তব পদক্ষেপ জরুরি

বাংলাদেশের কৃষি আজ এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ৪৯ শতাংশ জমি বর্তমানে লবণাক্ততার কারণে চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব, যার মধ্যে খরা অন্যতম ভয়াবহ সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। খরার কারণে প্রতিবছর কৃষকের ক্ষতি দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকায়। এই প্রেক্ষাপটে “শস্য বিমা”নিয়ে আলোচনা যতই হোক, কার্যকর বাস্তবায়নের অভাব কৃষকদের হতাশ করছে বারবার। কৃষক পর্যায়ে শস্য বিমার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহল একমত হলেও, বিষয়টি এখনো মূলত কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। কৃষি সচিবের ভাষায়, নীতিগত সম্মতি থাকলেও কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য দরকার একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জীবিকা ও ফসলের ভবিষ্যৎ আজও অনিশ্চিত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খরাপ্রবণ অঞ্চলের ৬৪ শতাংশ আবাদি জমি প্রতিবছর খরায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা, শৈত্যপ্রবাহ, অতিবৃষ্টিÑএসব মিলিয়ে কৃষকের জন্য বছরজুড়েই অনিশ্চয়তা। অথচ এই অনিশ্চয়তা দূর করতে শস্য বিমা একটি সম্ভাবনাময় সমাধান হতে পারে। তবে এর বিস্তারে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিমা কোম্পানিগুলোর সীমিত সক্ষমতা, দুর্বল প্রযুক্তি, অদক্ষতা এবং কৃষকের আর্থিক অক্ষমতা। এখানে রাষ্ট্রের দায়িত্বকে এড়ানো যায় না। সরকার যদি কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে চায়, তবে বিমা খাতে প্রণোদনা, নীতিগত সহায়তা ও সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে এখনই। শস্য বিমাকে জনপ্রিয় করতে হলে প্রিমিয়াম কমিয়ে তা কৃষকদের সামর্থ্যরে মধ্যে রাখতে হবে। ক্ষতিপূরণ বিতরণে স্বচ্ছতা ও দ্রুততা নিশ্চিত করা, স্থানীয় পর্যায়ে বিমা সুবিধা সহজলভ্য করা এবং কৃষকদের মাঝে বিমা সম্পর্কে প্রশিক্ষণ ও প্রচার বাড়ানো জরুরি। গুটিকয়েক করপোরেট প্রতিষ্ঠান শস্য বিমা চালু করলেও তা এখনও সীমিত গ-িতে আবদ্ধ। সরকার একসময় সিলেটে একটি শস্য বিমা প্রকল্প চালু করেছিল, যা নানা জটিলতায় মুখ থুবড়ে পড়েছে। এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সরকারকে অবশ্যই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় যেতে হবে। জাতীয় কৃষি নীতিতে শস্য বিমা নিয়ে একটি পৃথক অধ্যায় সংযোজন এবং বিমা বিধিমালায় সময়োপযোগী পরিবর্তন আবশ্যক। শস্য বিমা শুধু কৃষকের আর্থিক সুরক্ষার জন্য নয়, বরং পুরো কৃষি খাতের টেকসই উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য। দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি এখনো কৃষিভিত্তিক। তাই কৃষককে সুরক্ষা দেওয়া মানে পুরো দেশের অর্থনীতিকে সুরক্ষা দেওয়া। আজ না হলে কাল, শস্য বিমা বাস্তবায়নের দাবি আরও জোরালো হবে। তবে সেটি যেন বিলম্বিত না হয়, তার দায়িত্ব রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট মহলের।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button