মানব পাচারকারীদের দৌরাত্ম্য থামাতে হবে

কক্সবাজারের টেকনাফে মানব পাচারকারীদের সঙ্গে গোলাগুলির সময় এক সেনা সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক, একই সঙ্গে উদ্বেগেরও। বেশ কিছুদিন থেকে ওই এলাকায় মানব পাচারকারীদের দৌরাত্ম্যের খবর আলোচনায় আসছে। সাধারণ মানুষকে অপহরণের পর জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় করছে, অনেককে জোরপূর্বক বিদেশে পাচার করছে। প্রায়ই হতাহতের ঘটনা ঘটছে। এবার একজন সেনা সদস্যের প্রাণ গেল, যা আমাদের দেশের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। আমরা এ ঘটনায় শোক ও নিহতের পরিবারের প্রতি জানাই গভীর সমবেদনা। টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নে রোহিঙ্গা ক্যাম্প সংলগ্ন দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সশস্ত্র ডাকাতগোষ্ঠী ও মানব পাচারকারী চক্রের অবস্থানের তথ্য পেয়ে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে বিজিবি ও টেকনাফ থানার পুলিশ যৌথ অভিযান চালায়। এ সময় সশস্ত্র মানব পাচারকারী ও ডাকাতদলের সদস্যদের সঙ্গে আইন-শৃঙ্খরা রক্ষা বাহিনীর মুখোমুখি সংঘর্ষ ও পাল্টাপাল্টি গোলাগুলি হয়। অভিযানে মো. তিতাস শেখ নামের এক সেনা সদস্য গুলিবিদ্ধ হন। তাঁকে উদ্ধার করে প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য টেকনাফের নয়াপাড়ার আইআরসি হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিভিল অ্যাম্বুলেন্সযোগে রামুর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। এদিকে অভিযানে মানবপাচার চক্রের পাঁচ সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং ওই চক্রের কবল থেকে ৫৭ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে খবরে উল্লেখ করা হয়। বিভিন্ন সময় প্রকাশিত খবরে জানা যায়, কক্সবাজার ও টেকনাফের স্থানীয় বাসিন্দারা সারাক্ষণ অপহরণ আতঙ্কে থাকে। এলাকার তরুণদের অপহরণ করে গহিন জঙ্গলে নিয়ে মুক্তিপণ চাওয়া হয়। মুক্তিপণ না দিলেই চলে অকথ্য নির্যাতন। এবারও অভিযানের আগে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী জানতে পারে, দুই শতাধিক মানুষকে মালয়েশিয়ায় পাচারের উদ্দেশ্যে টেকনাফের বিভিন্ন পাহাড়ে দীর্ঘদিন থেকে আটকে রেখেছে। এর পরই নিরাপত্তা বাহিনী যৌথ অভিযান শুরু করে। কক্সবাজারের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রসঙ্গে যে বিষয়টি সামনে আসে, তা হলো রোহিঙ্গা ক্যাম্প। অভিযোগ রয়েছে, অনেক রোহিঙ্গা অপরাধ চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। এ ছাড়া পাচার চক্রের সদস্যরাও সহজেই রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গা ঢাকা দিতে পারছে। কিছুদিন আগে ক্যাম্পে রহস্যময় সুড়ঙ্গের সন্ধান পেয়েছিল আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী। ধারণা করা হয়, এসব সুড়ঙ্গ ব্যবহারে করে সন্ত্রাসীরা নিরাপদে পালিয়ে যায়। দেখা যাচ্ছে, জনাকীর্ণ রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো দিন দিন ওই এলাকার স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠছে। কিন্তু হতাশার বিষয় হলো, এত বছর পরও রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার বিষয়ে কোনো অগ্রগতিই চোখে পড়ছে না। এ ছাড়া বিস্তৃত সমুদ্র ও দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় পাচার চক্রের সদস্যরা সুবিধা পেয়ে থাকে। তারাই মিয়ানমার ও থাইল্যান্ড হয়ে মালয়েশিয়ায় পাচার রুট তৈরি করেছে। এ কারণে মানবপাচার ইস্যুটি আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়ও বটে। আমরা মনে করি, দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। মানবপাচার চক্রের মূল হোতারা যেন ধরাছোঁয়ার বাইরে না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে। জল ও স্থল সীমান্তে নজরদারি বাড়াতে হবে। আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে নিয়মিত তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যমে সমন্বিত ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। সর্বোপরি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।
