আন্তর্জাতিক

ইরানে ফের হামলার প্রস্তুতির মধ্যে ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর ফোনালাপ

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ ইরানে পুনরায় বিমান হামলা চালানোর পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। এমন সময়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু টেলিফোনে কথা বলেছেন। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, শনিবার সকালে তারা টেলিফোনে কথা বলেন। পরে পাম বিচে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ট্রাম্প নিজেই জানান, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে আরও দুটির মতো লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে চায়। তিনি বলেন, ‘আমাদের এখনো অন্তত দুটি জায়গায় আঘাত হানতে হবে, তবে কাজটি করতে ১০ মিনিটের বেশি সময় লাগবে না। সম্ভবত আপনারা পিক্স্যাক্স পর্বতের কথা জেনে থাকবেন, ওখানকার সমস্যাটি আমাদের মেটাতে হবে।’ পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তথ্যানুযায়ী, পিক্স্যাক্স পর্বতটি সম্ভবত পারমাণবিক অস্ত্র বা কাঁচামাল সংরক্ষণের কাজে ব্যবহার করছে ইরান। চলমান যুদ্ধে এখন পর্যন্ত স্থানটিতে কোনো হামলা চালায়নি যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প আরও দাবি করেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা ‘ঠিকঠাক এগিয়ে চলেছে’। তবে এই দেশটিকে তিনি ‘খুব একটা নির্ভরযোগ্য নয়’ বলেও মন্তব্য করেন। চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর যেন নতুন করে রক্তক্ষয়ী সংঘাত ছড়িয়ে না পড়ে, সেজন্য আন্তর্জাতিক কূটনীতিকরা জোর তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই শনিবার দোহার মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসেন ইরানি প্রতিনিধিরা। উপসাগরীয় অঞ্চলের এই যুদ্ধ বন্ধের উপায় খুঁজতেই তারা আলোচনা করছেন বলে রয়টার্সকে নিশ্চিত করেছে একটি সূত্র। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই সূত্রের মতে, দোহার এই বৈঠকের আগে শুক্রবার তেরানেও ইরানি ও কাতারি প্রতিনিধিদের মধ্যে টানা ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় আলোচনা হয়। এই পুরো প্রক্রিয়াই ওয়াশিংটনের সঙ্গে সার্বিক সমন্বয় রেখে চালানো হচ্ছে বলে জানান তিনি। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর আশঙ্কা, মার্কিন নির্বাচন শেষ হলেই ট্রাম্প ফের ইরানে সামরিক অভিযান জোরদার করতে পারেন। অন্যদিকে ইরানও সাফ জানিয়ে দিয়েছে, যেকোনো নতুন হামলার জবাব প্রতিবেশীদের ভূখ-ে থাকা মার্কিন ও ইসরায়েলি ঘাঁটিতে পাল্টা আঘাত হেনে দেওয়া হবে। নির্বাচনের পরদিনই অর্থাৎ ৪ নভেম্বর থেকে ইরানে সংক্ষিপ্ত কিন্তু তীব্র আকারের নতুন হামলা চালানো হতে পারে। সম্ভাব্য এই আক্রমণ মোকাবিলায় উপসাগরীয় মিত্রদের প্রস্তুত থাকার বার্তা দিয়েছে ওয়াশিংটন। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত তিন শীর্ষ আরব কর্মকর্তার বরাতে শনিবার এমএসনাউ এ খবর নিশ্চিত করেছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের নেতারা পরিস্থিতির ভয়াবহতা আঁচ করতে পেরে হামলা না চালিয়ে ওয়াশিংটনকে সংকট নিরসনের তাগিদ দিচ্ছেন। তারা বলছেন, নতুন কোনো সামরিক পদক্ষেপ নিলেই ইরানের তীব্র পাল্টা জবাব পুরো অঞ্চলের পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলবে। গত ১ সেপ্টেম্বরের পর থেকে ওয়াশিংটন ইরানে নতুন করে বড় কোনো বিমান হামলা চালায়নি। মূলত মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত সামরিক পদক্ষেপ স্থগিত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। এদিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি শনিবার সামরিক বাহিনীকে সর্বোচ্চ প্রস্তুত থাকার নির্দেশ জারি করেছেন। দেশটির সশস্ত্র বাহিনী পরে এক বিবৃতিতে নিশ্চিত করেছে, যেকোনো আগ্রাসন প্রতিহত করতে তারা সব ধরনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। পরিস্থিতি আরও জটিল করে ইরানের প্রভাবশালী নিরাপত্তা প্রধান মহসিন রেজাই শনিবার জানান, আক্রমণ আবার শুরু হলে তারা পরমাণু অস্ত্র তৈরির ওপর থেকে দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার কথা বিবেচনা করছেন। তবে এই বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে নিশ্চিত করেন তিনি। উল্লেখ্য, ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে এক ধর্মীয় ফতোয়া জারি করে পরমাণু অস্ত্র তৈরি নিষিদ্ধ করেছিলেন সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি। তেহরানও বরাবরই দাবি করে আসছে যে তাদের পরমাণু কর্মসূচি কেবলই বেসামরিক কাজের জন্য। তবে ইরান এখন যে মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করছে, তা কোনো সাধারণ কাজের উপযোগী নয়। আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের নিজ দেশের পরমাণু কেন্দ্রগুলো ঘুরতে বাধা দেওয়া এবং উন্নত ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি অব্যাহত রেখেছে তারা। গত ২০২৫ সালের জুনে হওয়া যুদ্ধের আগেই ইসরায়েল সতর্ক করেছিল যে ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরির দিকে এগোচ্ছে। রেজাই সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, তেহরানের শর্তগুলো ওয়াশিংটন না মানা পর্যন্ত পরমাণু চুক্তি নিয়ে আর কোনো আলোচনা সম্ভব নয়। একইসঙ্গে নিজেদের দাবিগুলো পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী বন্ধই রাখা হবে। গত সেপ্টেম্বর থেকে ইরান সাত দফার একটি নিজস্ব শান্তি প্রস্তাব পেশ করে আসছে, যা এ পর্যন্ত নাকচ করেছেন ট্রাম্প। ওই প্রস্তাবে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর থেকে মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার, আটকে রাখা সম্পদ মুক্ত করা এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে ইরান-সমর্থিত জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়ার শর্ত রাখা হয়েছে। এগুলো মানলেই কেবল নৌপথটি খুলে দেওয়া হবে। রেজাই আরও উল্লেখ করেন, সম্প্রতি মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স আলোচনার পরিবেশ ফেরাতে ইরানি কর্মকর্তাদের কাছে চিঠি পাঠানোর পর থেকে ওয়াশিংটনের সুর ‘পুরোপুরি বদলে গেছে’। তিনি বলেন, ‘আমি চিঠিটি পড়েছি। এখনো কোনো জবাব দিইনি, তবে তাদের ভাষা এবার সম্পূর্ণ আলাদা।’ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই নরম সুরকে তিনি এক ‘ইতিবাচক লক্ষণ’ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং দাবি করেন যে এর মধ্য দিয়ে তাদের জয় সুসংহত হয়েছে। তবে চিঠিটি নিয়ে এর বেশি কিছু বলতে রাজি হননি রেজাই এবং তিনি কখন জবাব পাঠাবেন তাও স্পষ্ট করেননি। কাতার পরোক্ষভাবে উভয়পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষার কাজ করে গেলেও ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা আজ সকালেও স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে সরাসরি কোনো মার্কিন কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠকে বসার পরিকল্পনা তাদের নেই। চলমান এই সংকটের সূচনা ঘটেছিল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি। সেদিন ইরান সরকারের পতন ঘটাতে এবং তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দিতে দেশটিতে যৌথ হামলা চালায় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। পরে জুন মাসে স্থায়ী যুদ্ধবিরতির একটি সমঝোতা স্মারকে সই করতে সম্মত হয়েছিল তেহরান ও ওয়াশিংটন। কিন্তু একপক্ষ অপরপক্ষের বিরুদ্ধে শর্ত ভঙ্গের অভিযোগ তোলায় সেই আলোচনা দ্রুতই ভেঙে পড়ে। সূত্র: টাইমস অব ইসরায়েল।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button