মামলা জরিমানাতেও শৃঙ্খলা ফিরছে না ‘খুলনার’ সড়কে

# ২০২৪ সালে খুলনা ট্রাফিক বিভাগে মামলা হয়েছে ২৩,১০১ টি #
# জরিমানা আদায় ৩ কোটি ৪১ লক্ষ ৩০ হাজার ৬’শ টাকা #
# নগর জুড়ে দাঁপিয়ে বেড়াচ্ছে সিএনজি- ইজিবাইক, থেমে নেই দৌলতপুরের যানজট #
মো. আশিকুর রহমান : ট্রাফিক নিয়ম বর্হিভূত চলাচলের কারণে মামলা ও জরিমানা আরোপ করেও শৃঙ্খলা ফিরছেনা খুলনার সড়কে। খুলনা মহানগরীর সড়ক-মহাসড়ক, অলিগলি এখন ইজিবাইক, ব্যাটারি চালিত রিকশা-ভ্যান, সিএনজি, মাহেন্দ্রসহ বিপুল সংখ্যক অবৈধ যানবাহনের দখলে। এসব যানবাহনের বেপরোয়া চলাচলের কারণে একদিকে যেমন শহরের শৃঙ্খলা বিনষ্ট হচ্ছে অন্য দিকে থেমে নেই যানজটও। একই সঙ্গে সড়কে দৃশ্যমান হচ্ছে হেলমেটবিহীন মোটর সাইকেলে চড়ার প্রতিযোগতাও। সাথে যুক্ত হয়েছে অপ্রাপ্তরা, যাদের বয়স পূর্ন না স্বাচ্ছেন্দে হেলমেটবিহীন উচ্চগতিতে মোটর সাইকেল চালাচ্ছে বুক ফুলিয়ে। এমন ট্রাফিক নিয়ম বর্হিভূত চলাচলের কারণে অহরহ ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঘটনাও। এতে চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে নগরবাসী। নগরীর গল্লামারী, সোনাডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড, শিববাড়ি মোড়, শান্তিধামের মোড়, পাওয়ার হাউজ মোড়, পিকচার প্যালেস, সাত রাস্তার মোড়, পিটিআই মোড়, সদর থানার মোড়, রেলস্টেশন রোড ঘুরে দেখা গেছে, রাস্তার ওপর যেখানে-সেখানে যানবাহন রাখা। এছাড়া যাত্রীবাহী ইজিবাইক ও মাহেন্দ্র থেকে যেখানে-সেখানে যাত্রী ওঠানামা করছে ট্রাফিক পুলিশের সামনেই। কিন্তু কোনো প্রতিকারই যেন নেই বলে মনে করছেন সচেতন মহল। অভিযোগ রয়েছে, কেসিসির লাইসেন্স প্রাপ্ত ইজিবাইক ছাড়াও সময়ের ব্যবধানে নগরীতে ইজিবাইক ও ইঞ্জিনচালিত রিকশার সংখ্যা বহুগুনে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিদিন এসব অবৈধ যানবাহন কাকডাকা ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বেপরোয়া গতিতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে নগরজুড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও কয়েক হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশা ও সিএনজি মাহেন্দ্র। এসব যানবাহনের অনেকাংশে বৈধ কাগজপত্র জটিলতা রয়েছে। তাছাড়া চালকদেরও কোনো ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই, ফলে অদক্ষ চালক ও বেপরোয়া চলাচলের কারণেই প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন পথচারীসহ সাধারণ মানুষ। অপর দিকে, খুলনা নগরীর একটি গুরুত্বপূর্ন উপশহর দৌলতপুর। ব্যাংক-বীমা অফিস, স্কুল কলেজ, সরকারী অফিস-আদালতসহ স্থানীয় বাজারসহ বিবিধ কারণে উপশহর বেশ গুরুত্বপূর্ন। দৌলতপুরের মহাসড়কের দীর্ঘ যানজট দীর্ঘদিনের ভোগান্তির কারণ। অস্বস্তিকর যানজট নিরসনে কোনো স্থায়ী উদ্যোগ গ্রহন করেন না কেএমপি ট্রাফিক বিভাগ বলে অভিযোগ রয়েছে ওই এলাকার সুশীল সমাজের। ট্রাফিক বিভাগের অব্যবস্থাপনার কারণে এমন যানজট সৃষ্টি বলে জানিয়েছেন একাধিক ব্যক্তিবর্গ। দুর্বিষহ এই যন্ত্রনা হতে মুক্তি পেতে সংশ্লিস্ট কর্তৃপক্ষের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। খুলনা মহানগর এলাকার সড়ক গুলোতে শৃঙ্খলা ফেরানোর পাশাপাশি জানজট নিরসনের লক্ষে কেএমপি’র ট্রাফিক বিভাগ নিরলস প্রচেষ্টা অব্যহত রেখেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিস্টরা।
কেএমপি ট্রাফিক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, খুলনা মহানগর এলাকায় ট্রাফিক নিয়ম বর্হিভূত চলাচল বা অপরাধের জন্য গত ২০২৪ সালের মোট মামলা রুজু করা হয়েছে ২৩,১০১ টি। যার মধ্যে ড্রাইভিং লাইসেন্স সংক্রান্ত মামলা ৩৬৩৩ টি, রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত মামলা ২৯৬ টি, ফিটনেস সংক্রান্ত মামলা ১২৪৩ টি ও অন্যান্য অপরাধ সংক্রান্তে মামলা হয়েছে ১৭৯২৯ টি। যার বিপরীতে জরিমানা আদায় করা হয়েছে ৩ কোটি ৪১ লক্ষ ৩০ হাজার ৬০০ টাকা। চলতি ২০২৫ সালের জানুয়ারী মাসের সর্বশেষ তথ্যনুসারে মামলা রুজু করা হয়েছে ৪১৮ টি। যার মধ্যে ড্রাইভিং লাইসেন্স সংক্রান্ত মামলা ১০১ টি, রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত মামলা ২৩ টি, ফিটনেস সংক্রান্ত মামলা ৯২ টি ও অন্যান্য অপরাধ সংক্রান্তে মামলা হয়েছে ২০২ টি। যার বিপরীতে জরিমানা আদায় করা হয়েছে ৭ লক্ষ ৫৬ হাজার ৭৫০ টাকা।
পথচারী শাহরিয়ার নুর জানান, ইদানিং সিএনজি রাস্তায় বেপরোয়া গাড়ি চালাচ্ছে। কয়েকদিন আগের ঘটনা, তখন সকাল প্রায় ৭টা বাজে। আমিসহ দু’জন যাত্রী ইজিবাইকের মধ্যে বসে যাচ্ছিলাম। তখন পেছন থেকে একটি সিএনজি স্ব-জোরে ধাক্কা মারে। আমরা ছিটকে গিয়ে পড়ি রাস্তার পাশে। এক যাত্রীর পা-ভেঙে যায়। আমি কোমড়ে ও পায়ে হোট পায়। ট্রাফিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় এমনটি হয়েছে। এ ব্যাপারে সংশ্লিস্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করি।
চাকুরিজীবি মো. সোহেল রানা বলেন, দৌলতপুরের যানজট দীর্ঘদিনের। এই যানজটের কারণে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ও অফিসে কর্মজীবী মানুষের সময়মতো পৌঁছানো এখন দায়। এর প্রতিকার কি? এ ব্যাপারে খুলনা ট্রাফিক বিভাগের ভূমিকায় বা কি?
নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) খুলনা মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুর রহমান মুন্না বলেন, মামলা , জরিমানা একটি আইনি প্রক্রিয়া। মানুষ কিন্তু সচেতন না। সড়কে শৃঙখলা ফিরাতে সকলকে সচেতন হতে হবে। বিশেষ করে, আমরা তরুনদের হাতে মোটরসাইকেল তুলে দিচ্ছি। তারা ইচ্ছা-স্বাধীন, উচ্চগতিতে চলাচলের কারণে দূর্ঘটনার কবলে পড়ে জীবন হারাচ্ছে। এ ব্যাপারে অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। সড়ক দূর্ঘটনা শূন্য কোঠায় আসবেনা হয়তো, তবে মানুষ সচেতন হলে হ্রাস পাবে।
এ ব্যাপারে সু-শাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)’র খুলনার সা: সম্পাদক এড. কুদরত-ই-খুদা জানান, মামলা একটি আইনি প্রক্রিয়া। মামলা করে অপরাধ দমন করা যায় না, এ জন্য দরকার সচেতনতা। খুলনা ট্রাফিক ব্যবস্থা এখনও নিয়ন্ত্রনহীন ভাবে চলছে। সড়কে এখনো বহু অবৈধ যানবাহন চলাচল করছে। অদক্ষ চালক গাড়ি চালনা করছে, যাদের নূন্যতম ট্রাফিক জ্ঞান বা বৈধতা নেই। মামলা দিয়ে মানুষের ভোগান্তি দূর করা যাবে না, এটাকে নিয়ন্ত্রন করতে হবে আইন দিয়ে।
এ ব্যাপারে কেএমপি’র ডেপুটি পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) শফিকুল ইসলাম জানান, আমি চাই এই শহরে সকলে যেন নির্বিঘেœ যানজটমুক্ত ভাবে চলাচল করতে পারে। সে জন্য আমার ট্রাফিকের সদস্যদের নিয়ে এ ব্যাপারে যে ধরনের ব্যবস্থা গ্রহন করা দরকার, সেই ব্যবস্থা গ্রহন করবো। কেসিসির সাথে সমন্বয় করে শীঘ্রই ইজিবাইক চালকের প্রশিক্ষনের আওতায় আনা হবে।



