স্থানীয় সংবাদ

হামলা-খুনসহ দিনে-রাতে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে সংঘটিত হচ্ছে ডাকাতি

# খুলনায় বাড়ছে অপরাধ #

কামরুল হোসেন মনি ঃ খুলনায় সন্ত্রাসীদের হামলায় একের পর এক খুনের ঘটনার পাশাপাশি বেড়েছে চুরি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে দুর্ধষ ডাকাতির ঘটনা। এসব ঘটনায় কয়েক মাস ধরেই আতঙ্ক তৈরি হয়েছে এ অঞ্চলের মানুষের মধ্যে। এই পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকায় সন্তুষ্ট হতে পারছেন না নগরবাসী। তাদের অভিযোগ ৫ আগষ্ট বিপ্লবের পর পুলিশের শিথিলতায় বাড়ছে চুরি-ডাকাতি ও ছিনতাই। এদিকে আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি উন্নতীতে ব্যর্থ হওয়ায় খুলনা মহানগরীর সকল থানার ওসিদেরকে (অফিসার্স ইনচার্জ) অবিলম্বে অপসারণ দাবি করেছে খুলনা বিএনপি। অন্যথায় খুলনা জেলা প্রশাসক ও মেট্রোপলিটন পুলিশের সদর দপ্তর ঘেরাও কর্মসূচিসহ খুলনা অচল কর্মসুচি ঘোষণার হুমকি দেওয়া হয়েছে। জানা গেছে, খুলনা লবনচরার মোহাম্মদনগরে ২৯ জানুয়ারি ( বুধবার) ভোর সাড়ে ৪টায় ব্রাদার্স অটো নামক একটি ইজিবাইক ব্যাটারির দোকানে দুধর্ষ ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। এ সময় ২ জন নৈশপ্রহরীকে কুপিয়ে ও হাত পা বেধে প্রায় ২৫ লাখ টাকার মালামল লুট করে নিয়ে যায়। প্রতিষ্ঠানের একাংশে মালিক আজমীর হোসেন বলেন, আমার প্রতিষ্ঠানে নিজস্ব নৈশ প্রহরী ওয়াহেদ মোড়লকে সংঘব্ধ ডাকাত দল প্রথমে তাকে হাত-পা বেধে ফেলে। এ ঘটনা দেখে রাস্তার ওপারে স্থানীয় নৈশ প্রহরী হোসেন গাজী এগিয়ে আসলে ডাকাতরা তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে মাথায় কোপ দেয়। পরে তাদেরকে দোকানে মধ্যে বেধে রেখে ১৬৫ পিস নতুন ১২ ভোল্টের ইজি বাইকের ব্যাটারি যার মূল্য ২৩ লাখ ১০ হাজার টাকা এবং ১৫ পিস রিপ্লেস ব্যাটারি যার মূল্য ২ লাখ টাকা মালামালগুলো ডাকাতদের পিকআপ তুলে নেয়। তিনি বলেন, তার পাশে অবস্থিত ইজিবাইক গ্যারেজের মালিক কামাল হোসেন আমাকে মোবাইলে অবহিত করে যে, দোকানে ভেতরে দুইজন লোকের চেচামেচি শোনা যাচ্ছে। আমি ওই সময় বাসা থেকে দোকানের উদ্দেশ্যে রওনা হই। গত ১৯ মাস ধরে তিনিসহ বিল্লাল হোসেন ও সাইফুল ইসলাম মিলে যৌথভাবে এ ব্যবসা পরিচালনা করছেন। এ ব্যাপারে তারা লবনচরা থানায় অভিযোগ দায়ের করেছেন। তিনি বলেন, দুধর্ষ ডাকাতিরা দোকানে ক্যাশ বাক্স ভেঙ্গে ফেলে এবং সিসি ক্যামারা ক্ষতিগ্রস্ত করে ৫টা ৬ মিনিটে পিক-আপে মালামাল নিয়ে চলে যায়। এই মামলার তদন্তকারি কর্মকর্তা এসআই মো: আনিসুজ্জামান গতকাল বৃহস্পতিবার বলেন, ঘটনাস্থলে পুলিশের টিম পরিদর্শন করে সত্যতা পেয়েছেন। সিসি ফুটেজও পাওয়া গেছে। আমরা এ বিষয়ে জড়িতদের গ্রেফতারের জন্য মাঠে কাজ করছি। এই ঘটনায় সিসি ফুটেজে দেখা গেছে, ভোর ৪টা ১৩ মিনিটে অজ্ঞাত ৮-১০ জন একটি ব্লু ক্লারে জ্যাক পিকআপ নিয়ে আসে। এসেই প্রথমে নাইট গার্ড মো: ওয়াহেদ মোড়লকে বেধে পিছন দিক থেকে বেধে ফেলে এবং মারধর করে পিক আপের ওপর উঠিয়ে দেয়। এরপর দোকানে তালা ভেঙ্গে প্রবশে করে মালামাল লুট করে। এ সময় ২য় নাইট গার্ড মো: হোসেন গাজীকে দেখে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করতে দেখা যায়।
এর আগে ২০২৪ সালের গত ৫ নভেম্বর রাতে অস্ত্রধারীরা রফিকুল ইসলাম মুক্তা নামে এক ব্যবসায়ীকে হত্যার চেষ্টা করে। তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গেছে, পাঁচটি মোটরসাইকেলে মুখোশ পরা সন্ত্রাসীরা ওই প্রতিষ্ঠানের সামনে যায়। এর মধ্যে একজন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ঢুকে মুক্তাকে টেনেহিঁচড়ে বের করে। তাদের হাতে চাপাতি, রামদা ও পিস্তল ছিল। পুলিশের একটি সূত্র বলছে, হামলার সময় কালা লাবলু, নাছির ও অমিত নামে তিন সন্ত্রাসী ছিল।
এর আগে ২৮ অক্টোবর দুপুরে সন্ত্রাসীরা গুলি করে ও বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দৌলতপুর থানার কালীবাড়ি বাজারের দত্ত জুয়েলার্সে ডাকাতি করে। জুয়েলার্সটির সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গেছে, পাঁচজন ডাকাত প্রাইভেটকারে সেখানে যায়। এর মধ্যে চারজন জুয়েলার্সে ঢোকে। একজন বাইরে বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আতঙ্ক তৈরি করে। জুয়েলার্সে ঢোকা চারজনের মধ্যে একজন জুয়েলার্স মালিক উত্তম দত্তকে মারধর এবং একজন গুলি করে। স্বর্ণালংকার ও নগদ দুই লাখ টাকা লুট করে তারা। পরে প্রাইভেটকারসহ একজনকে অল্প কিছু স্বর্ণালংকারসহ আটক করে পুলিশ। এ ছাড়া নগদ ১ লাখ ৩৩ হাজার টাকা ও ৪৯টি স্বর্ণের নাকফুলসহ দুই নারীকে আটক করেছে।
এদিকে মাছ ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কে কয়েক দিন ধরে মাছের পিকআপে ছিনতাই, ডাকাতি ও চাঁদাবাজি হচ্ছে। এগুলো বন্ধের দাবিতে গত ৫ নভেম্বর ডুমুরিয়া এলাকায় মানববন্ধন করেছেন তারা।
এ ব্যাপারে খুলনা উপ-পুলিশ কমিশনার ( দক্ষিণ) মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান মিঠু বলেন, মোহাম্মদ নগরে ডাকাতির ঘটনায় আইনশৃঙ্খলার একাধিক বাহিনী মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে। আমরা আশাকরি দ্রুত সময়ের মধ্যে এ ঘটনার সাথে জড়িতদের গ্রেফতারে সক্ষম হবো।
অপরদিকে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নতীতে ব্যর্থ হওয়ায় খুলনা মহানগরীর সকল থানার ওসিদেরকে (অফিসার্স ইনচার্জ) অবিলম্বে অপসারণ দাবি করেছে খুলনা বিএনপি। ২৪ ঘন্টার মধ্যে সদর থানার ওসি মুনীর উল গিয়াসকে অপসারণের দাবি জানানো হয়। অন্যথায় খুলনা জেলা প্রশাসক ও মেট্রোপলিটন পুলিশের সদর দপ্তর ঘেরাও কর্মসূচিসহ খুলনা অচল কর্মসুচি ঘোষণার হুমকি দেওয়া হয়েছে। গত ২২ জানুয়ারি বেলা সাড়ে ১১টায় কেডি ঘোষ রোডস্থ বিএনপি কার্যালয়ের সামনের সড়কে খুলনা মহানগরীতে আইন-শৃঙ্খলার চরম অবনতি, ৩০নং ওয়ার্ড বিএনপি নেতা আমির হোসেন বোয়িং মোল্লা ও ২১নং ওয়ার্ড যুবদলের সহ সভাপতি মানিক হাওলাদার হত্যাকান্ড, ২৭নং ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহবায়ক মো. শাহিন ও ছাত্রদল কর্মী নওফেলের ওপর সন্ত্রাসী হামলার প্রতিবাদে মহানগর ও জেলা বিএনপির প্রতিবাদী বিক্ষোভ সমাবেশে এ দাবি করেন। বক্তারা বলেন, গত পাঁচ মাসে পুলিশ প্রশাসনের নির্লিপ্ততায় খুলনার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। একের পর এক হত্যাকা- সংঘটিত হচ্ছে। বিএনপির দুইজন সহ গত ৪ মাসে মহানগরীতে ১০টি হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু পুলিশ প্রশাসন অপরাধীদের গ্রেফতারে সম্পুর্ন ব্যর্থ। এছাড়া মাদক ব্যবসা বন্ধ, বিভিন্ন মামলার আসামিদের গ্রেপ্তার, খুন, জখম, ডাকাতি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পেলেও পুলিশ অপরাধীদের গ্রেফতার করছে না। পুলিশের সাথে সখ্যতা করে অপরাধীরা নগরীতে সন্ত্রাসী কর্মকা- পরিচালনা করছে। যাতে করে নগরবাসি চরম নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থেকে শৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যর্থ কর্মকর্তাদের দায়িত্বে থাকার কোন অধিকার নেই। মহানগর বিএনপির আহবায়ক এড. শফিকুল আলম মনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত প্রতিবাদ সমাবেশে মহানগরীর আইন-শৃঙ্খলার অবনতিতে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করে বক্তারা আরো বলেন, খুলনার অলিতে-গলিতে মাদকে সয়লাব হয়ে গেছে কিন্তু পুলিশ এ অপরাধ দমনে কার্যতঃ কোন ভূমিকা রাখছে না। ৩০ নং ওয়ার্ড বিএনপি নেতা আমিন মোল্লা বোয়িং, ২১নং ওয়ার্ড যুবদলের সহ-সভাপতি মানিক হাওলাদারকে হত্যা করা হয়েছে কিন্তু হত্যাকারীরা ধরা পড়েনি। মানিক নিহত হওয়ার আগে থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছিল। কিন্তু পুলিশ কোন ব্যবস্থা নেয়নি। পরে ৯৯৯ নম্বরে ফোন দেওয়ার পর পুলিশ মামলা নেয়। পরবর্তীতে একজনকে আটক করা হলেও অজ্ঞাত কারনে ছেড়ে দেওয়া হয়। ওই সন্ত্রাসীকে ছেড়ে দেওয়া না হলে আজ মানিক হত্যাকান্ড ঘটতো না।
বক্তারা বলেন, পুলিশ অপরাধীদের গ্রেপ্তার না করে বিশেষ একটি রাজনৈতিক দলের সাথে গোপন বৈঠক করছেন। বিএনপি অফিস ভাংচুর মামলার আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও তাদেরকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না। নগরীর রাজনৈতিক, ব্যবসায়ী, সাংবাদিকরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button