স্থানীয় সংবাদ

মশার উৎপাতে দিশেহারা নগরবাসী

# কেসিসির মশা নিধন কার্যক্রম কি তাহলে প্রশ্নবিদ্ধ?
# ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের মত মশার লার্ভা পেলেই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে বড় অংকের জরিমানার বিধান খুলনায় চালু করা প্রয়োজন #
# নগরবাসির অভিযোগ, মশা নিধনে যে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল ও নামমাত্র
# নাগরিক নেতারা বলছেন, মশা নিধনের কেসিসির যে পদক্ষেপ গ্রহন করা উচিত তা কখনোই নেয় না #

মোঃ আশিকুর রহমান : খুলনা মহানগরীতে সম্প্রতি ব্যাপক আকারে মশার রাজত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। মশার উৎপাতে দিশেহারা হয়ে পড়েছে নগরবাসী। মশার রাজত্ব এতোটা বেড়েছে সকাল নেই, সন্ধ্যা নেই, রাত নেই, মশা বিরতিহীনভাবে কামড়েই চলছে। বিশেষ করে সন্ধ্যা পর এই উৎপাত আরো বাড়ে, মশার কামড় শরীর ফুলিয়ে দিচ্ছে। মশার কয়েল, স্প্রে ও ইলেকট্রিক ব্যাট ব্যবহার করেও কোন সুফল মিলছে না। নগরবাসীর অভিযোগ, মশা নিধনে যে কার্যক্রম চলানো হচ্ছে তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল ও নামমাত্র। পাশাপাশি মশা নিধনে সংশ্লিষ্টরা যে পদক্ষেপ গ্রহন করা উচিত তা কখনোই বাস্তবায়ন করে না। তাছাড়া মশা নিধনের জন্য যে ওষুধ ব্যবহার করা হচ্ছে তার মান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা। এই অবস্থায় খুলনা সিটি কর্পোরেশন (কেসিসি)’র মশা নিধন কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন খুলনার সুশীল সমাজ। বিপরীতে কেসিসির সংশ্লিস্ট দপ্তর বলছে, তারা নিয়মিত নগরীর বিভিন ওয়ার্ডে পানি নিষ্কাশনের পথ, বর্জ্য অপসারণ, যত্রতত্র আবাসিক গৃহস্থালির ব্যবহৃত বর্জ্য অপসারণসহ ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নতকরণে কাজ করছেন। মশা নিধনে নিয়মিত কার্যক্রমের পাশাপাশি বাড়তি কার্যক্রমও অব্যহত রেখেছেন। নাগরিক নেতারা মশা নিধনের ব্যাপারে মন্তব্য করে বলেছেন, শহরের প্রতিটি অলিগলি, আনাচে-কানাচে কেসিসির নিয়মিত ওষুধে স্প্রে করা উচিত। সেই সাথে একজন সচেতন নাগরিক হিসাবে আমাদেরও কিছু দায়-দায়িত্ব আছে। যত্রতত্র বাড়ীর ময়লা আর্বজনা না ফেলা, এতে শহর নোংরা হবে, মশা বংশ বিস্তার করবে। এ ব্যাপারে সকলকে অধিক সচেতন হতে হবে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন ও দক্ষিন সিটি কর্পোরেশনের মতো নিজ বাড়ীর আঙ্গিনায় বা অন্যত্র নোংরা, অপরিচ্ছন্ন থাকলে, যেখানে মশার লার্ভা জন্ম নেয়। এমন অবস্থা পেলেই ওই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে বড় অংকের জরিমানার বিধান খুলনায় চালু করা প্রয়োজন। খুলনায় এই নিয়ম চালু হলে মশার বংশ বিস্তার বহুঅংশে কমে যাবে বলে ধারনা করছেন নাগরিক নেতারা।
খুলনা নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, খুলনার বিভিন্ন এলাকাতে ড্রেন ও রাস্তায় সংস্কারের কাজ চলছে। ওই সকল কাজের সময় অনেকাংশে ড্রেনের মুখবন্ধ রেখে কাজ করতে হয় শ্রমিকদের। সেখানে জমে থাকে নোংরা পানি, বদ্ধ নোংরা পানি থেকে জন্ম নেয় মশার লার্ভা। সেই সাথে ড্রেনগুলোতে পলিথিন, কাগজ ও বিভিন্ন ধরনের ময়লা জমে রয়েছে। এছাড়া শহরের বিভিন্ন স্থানে ময়লার ভাগাড়েও মশার বংশ বিস্তার বেড়ে চলেছে। যদিও কেসিসির পরিচ্ছন্ন কর্মীরা নিয়মিত বাসা-বাড়ী হতে ময়লা-আবর্জনা সংগ্রহ করলেও কিছু অসচেতন মানুষ নিজ এলাকার মধ্যে, সড়কে যত্রতত্র বর্জ্য আর্বজনা ফেলে নোংরা করছে। ওই নোংরা স্থান তৈরী হচ্ছে মশার বংশ বিস্তারের ‘আতুড় ঘর’। একটি পরিচ্ছন্ন শহর হিসাবে খুলনাকে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বর্জ্য নিষ্কাসনে কেসিসির সংশ্লিষ্টদের উদাসীনতা রয়েছে অভিযোগ রয়েছে নগরীর একাধিক এলাকার বাসিন্দাদের। ভুক্তভোগী নগরবাসী আরো বলছেন, কেসিসি মশা নিধনে যে ব্যবস্থা গ্রহন করেছেন তা প্রয়োজনের তুলনায় কম এবং অনেকটাই নামমাত্র ব্যবস্থা গ্রহন। যেমন ১/২ সপ্তাহ পর পর ফগার দ্বারা স্প্রে করা। এর ফলে দূর্ভোগ যেন আরো বাড়ে, মশা তো মরেই না, বরং বাইরের মশা ঘর এসে হাজির হয়। কেসিসির সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, চলতি ২০২৪-২০২৫ অর্থ বছরে কেসিসি মশা নিধনের জন্য ৪ কোটি ৭ লক্ষ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। ওই বরাদ্দের বিপরীতে সর্বশেষ তথ্যনুসারে মশা নিধনের জন্য ৩০০০ হাজার লিটার এডাল্ডটি সাইড ক্রয়ে ব্যয় ১৯ লক্ষ ৪৭ হাজার টাকা, ২০০০ হাজার লিটার লার্ভি সাইড ক্রয়ে ব্যয় ১৯ লক্ষ ৮৪ হাজার টাকা, ৩০০০ হাজার লিটার ফার্নেস (কালো তেল) ক্রয়ে ব্যয় ২ লক্ষ ৪৯ হাজার টাকা এবং ৫২ টি হ্যান্ড স্প্রে মেশিন ক্রয়ে ব্যয় ৯৮ হাজার ২৮০ টাকা টাকা। মশা নিধনের জন্য ওষুধ ও মেশিনারী (হ্যান্ড স্প্রে) কেনা সংক্রান্তে সর্বমোট ব্যয় করা হয়েছে ৪২ লক্ষ ৭৮ হাজার ২৭০ টাকা। মশা নিধনের জন্য বরাদ্দকৃত টাকা হতে ব্যয়ের পরও এখনো উদ্বৃত্ত টাকা রয়েছে ৩ কোটি ৬৪ লক্ষ ২১ হাজার ৭২০ টাকা বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। যা মশা নিধন কার্যক্রমে টেন্ডারের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যয় করা হবে। এ খবরে সুশীল সমাজের ব্যক্তিবর্গ বলছেন, মশা নিধনের জন্য কেসিসির বরাদ্দকৃত টাকা থাকা সত্ত্বেও কেন মশা নিধনে সংশ্লিস্টরা জোরদার পদক্ষেপ নিচ্ছেন না, এই প্রশ্ন অনেকেরই। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তারা নিয়মিত নগরীর বিভিন ওয়ার্ডে মশা নিধনের নিয়মিত কার্যক্রম অব্যহত রেখেছেন। তাছাড়া সোমবার হতে নিয়মিত প্রোগ্রামের পাশাপাশি সেন্ট্রালি ক্রাস প্রোগ্রাম চালু করা হবে। দৌলতপুর ঋষিপাড়া মোড় চা বিক্রেতা মোস্ত জানান, বর্তমানে সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে মশার উৎপাত শুরু হয়। সন্ধ্যার পর এমন পরিমানে মশার উৎপাত শুরু হয় যে দোকানে দাঁড়িয়ে কেনাবেচা করা দুস্কর হয়ে পড়েছে। মশার কামড়ে দোকানের কাস্টমার বেশিক্ষন বসে থাকতে পারছেনা। যে কারণে রাতের বেলার বেচাকেনা কমে গেছে। কয়েল জ¦ালিয়ে রেখেও কাজ হচ্ছে না। নৈশ প্রহরী আসলাম জানান, এলাকাকে সুরক্ষিত রাখার জন্য সারা রাত হেঁটে হেঁটে ডিউটি পালন করি। একটানা তো আর হেটে বেড়ানো যায় না। শরীরের ক্লান্তি দূর করার জন্য মাঝে মাঝে একটু বসে পড়ি। কিন্তু বর্তমানে খুব খারাপ অবস্থা। কোথাও বসার উপায় নেই, প্রচুর মশা। হাত-পা কামড়ে ফুলিয়ে দিচ্ছে। গ্লোব জ¦ালিয়ে রাখি, তবুও মশার কামড়ের হাত থেকে রেহায় মিলছে না। এই অবস্থা কি দেখা কেউ নেই? এমনটাই প্রশ্ন এই নৈশ প্রহরীর। দৌলতপুর দেয়ানা এলাকার বাসিন্দা আনিসুর রহমান জানান, কয়েকদিন ধরে মশার উপদ্রব চরম আকারে বেড়েছে। দিন ও রাতে সমান তালে চলছে এদের অত্যাচার। ঘরের দরজা ও জানালা খোলা রাখা যাচ্ছে না। জানালা খুললে ঘরে মশা ঢুকে পড়ে, শুরু হয় অত্যাচার। এদের হাত হতে রেহাই পেতে কয়েক জ¦ালিয়েও স্বস্তি মিলছে না। মঝে মধ্যে কেসিসির থেকে ওষুধ ছিটানো হয়, কিন্তু তাতে কোন কাজ হচ্ছে না। মশা হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় কি?
দৌলতপুর ইস্পাহানী কলোনীর বাসিন্দা তৌকির আহম্মেদ তাকি জানান, বর্তমানে ব্যাপক আকারে মশার অত্যাচার বেড়েছে। ঘরে বসে কাজ করার উপায় নেই, মশা কামড়িয়ে শরীর ফুলিয়ে দিচ্ছে। মশার কয়েল জ্বালিয়েও কাজ হচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট কর্তপক্ষের নিকট মশা নিধন কার্যক্রম বৃদ্ধির দাবি জানাচ্ছি। দৌলতপুর ঋষিপাড়া এলাকার বাসিন্দা সুজন জানান, কয়েক মাস হলো ঋষিপাড়ায় ঘর ভাড়া নিয়েছি। সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে ঘরের দরজা জানালা খোলা রাখা যাচ্ছে না। হুড়হুড় করে ঘরের ভেতর মশা ঢুকে যাচ্ছে। শরীর কামড়ে ফুলিয়ে দিচ্ছে। সন্ধ্যার সাথে সাথে মশারি টাঙ্গিয়ে ভতরে শুয়ে বসে থাকি। রুমের পাশে নোংরা ড্রেন, ওখানে মশার আতুর ঘর, জন্ম নিয়ে মশা। মশার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় কি? রিক্সা চালক আবুল কালাম আজাদ জানান, যাত্রী পাওয়া জন্য বিভিন্ন জায়গায় দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।
কোথাও আলো, কোথাও অন্ধকারে। বর্তমানে যেখানে দাঁড়াচ্ছি সেখানেই মশা। মশা কামড়াতে কামড়াতে হাত-পা ফুলিয়ে ফেলছে। এতো মশা এতো দিন কোথায় ছিল। রক্ত ঘাম পরা শরীর মশা কামড়ে শেষ করে ফেলছে।
গৃহিনী তানিয়া রহমান জানান, আমরা বাচার বয়স ১০ মাস। ঘরে বাইরে এতো মশা, জানালা-দরজা খোলা যায় না। বাচ্চা রেখে বাসার সব কাজ করা লাগে। তাই সারাদিন মশারি টাঙ্গিয়ে রাখি যেন বাচ্চাকে মশায় কামড়াতে না পাড়ে। তারপরও বাচ্চাটার গায়ে মশা কামড় বসিয়ে লাল করে ফলেছে। আমাদের বাড়ীর কাছে খুব কমই কেসিসির লোকজনদের আসতে দেখি। মাঝে মধ্যে আসে, ধোয়া ধোয়া করে ফেলে চারিদিক। এতে কোনো কাজ হয় না। মশা নিধনে কেসিসির নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করা উচিত। চাকুরিজীবি মো. আল-আমিন জানান, সারাদিন চাকুরির কাজ নিয়ে খুলনার এখানে সেখানে ছুটাছুটি করি। রাতে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে কল্পতরু খোলা মাঠে চেয়ার পেতে বসে গল্প করি। ওরে মা, চারিদিকে বর্তমানে মশার যে আমদানি মাথা নষ্ট। গুনগুন করে কান ঝালাপালা করে তুলছে মশা, সেই সাথে কামড় ফ্রি। মশা নিধনে কেসিসির কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালনায় উদাসীনতা রয়েছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) খুলনার সাঃ সম্পাদক এড.কুদরত-ই খুদা জানান, খুলনায় বরাবরই মশার উপদ্রব একটি কমন বিষয়। এ ব্যাপারে নতুন করে কিছু বলার নাই। মশা নিধনে সিটি কর্পোরেশনের যে ধরনের পদক্ষেপ গ্রহন করা উচিত তারা কখনোই তা করে না। তাদের প্রথম পদক্ষেপ নেওয়া উচিৎ মশার যখন ডিম পাড়বে, ওই সময় ওষুধ ছিটানো। শহরের প্রতিটি অলিগলি, আনাচে-কানাচে নিয়মিত ওষুধে স্প্রে করা উচিত। প্রতিটি ওয়ার্ডে মশা নিধনের ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। মশা নিধনে মানসম্মত ওষুধ ছিটানে প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। পর্যাপ্ত বরাদ্দ থাকার পর ও প্রয়োজনীয় ওষুধ না কেনা কেসিসির দায়িত্বহীনতার পরিচয়। তিনি আরো বলেন, কেসিসির পাশাপাশিথে একজন সচেতন নাগরিক হিসাবে আমাদেরও কিছু দায়-দায়িত্ব আছে। যত্রতত্র বাড়ীর ময়লা আর্বজনা না ফেলা, এতে শহর নোংরা হবে, মশা বংশ বিস্তার করবে। এ ব্যাপারে সকলকে অধিক সচেতন হতে হবে।
খুলনা সিটি কর্পোরেশনের তত্ত্ববধায়ক প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) ও প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মো. আব্দুল আজিজ জানান, মশা নিধনে নিয়মিত প্রোগ্রামের পাশাপাশি সোমবার হতে ক্রাশ প্রোগ্রাম চালু করা হচ্ছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে সকালে কালো তেল ও বিকালে ফগারের মাধ্যমে স্প্রে করা হচ্ছে। মশার উপদ্রব থেকে বাঁচার জন্য তিনি নগরবাসীকে সচেতন হওয়ার আহবান জানান। তিনি নগরবাসীকে নিজ বাড়ির জঙ্গল ও আশপাশের ড্রেনসমূহ নিয়মিত পরিস্কার করার প্রতি তাগিদ দিয়েছেন। পাশাপাশি তার সংশ্লিষ্ট বিভাগ মশা নিধনে নিয়মিত কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে বলেও আশ্বাস প্রদান করেছেন। তিনি আরো জানান, মশা নিধনে যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে টেন্ডার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button