খুলনায় টিসিবির স্মার্ট কার্ডধারীদের সমস্যার শেষ নেই : সমস্যা সমাধানে দিনের পর দিন ঘুরছে কার্ডধারীরা

# ওটিপি সমস্যা সবচেয়ে বেশী #
# কার্ড ওয়ার্ড অফিসে থাকলেও মাল তুলতে পারছেন না অর্ধেক কার্ডধারী #
খলিলুর রহমান সুমন ঃ টিসিবির স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড ধারীরা দ্বারে দ্বারে ঘুরলেও তাদের সমস্যা সমাধান হচ্ছে না। টিসিবি পণ্য পেতে মোবাইল নাম্বার বাধ্যতামূলক করাসহ অনলাইনে করা নিয়ে বিরুপ মন্তব্য করেছে অনেকে। অনলাইনে কার্ড না থাকার কারণে অনেকে টিসিবি পণ্য পাচ্ছেন না। এতে করে ওয়ার্ড কাউন্সিলর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা রয়েছে চরম চাপের মুখে। কেউ কেউ অফিস করা ছেড়ে দিয়েছেন।
খুলনা নগরীর ১০নং ওয়ার্ডের এনডি লাইনের বাসিন্দা জাহিদুল আলম। যার কার্ড নং-১২৮৩। তিনি টিসিবি কার্ড পেয়েছেন সেই শুরু থেকেই। প্রতিবার প্রাপ্য মাল তুলছেন। কিন্তু বিপত্তি বাধে গত ২ মাস থেকে। ওয়ার্ড অফিসের ঘোষণা অনুযায়ী তিনি কার্ড জমা দেন। নতুন করে কার্ড দেয়ার কথা বলে পুরাতন কার্ড জমা নেয়। কিন্তু ওয়ার্ড অফিসে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পুরাতন কার্ডের ফটোকপিতে সীল মেরে দেন। সেই কার্ড দেখিয়ে এত দিন টিসিবি মাল তুলেছেন। কিন্তু এখন আর হচ্ছে না। এই নতুন মাল সম্প্রতি দিয়েছে। তিনি কার্ড আনতে ৪/৫ বার ওয়ার্ড অফিসে গেলেন। কিন্তু ওটিপি না আসার কারণে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমানও নতুন কার্ড দিতে পারছেন না। এ জন্য তিনি তিন দফা মেবাইল পরিবর্তন করেছেন। কিন্তু কোন সুফল মেলেনি। এ রকম সমস্যায় আরো ২০/২৫ জন রয়েছে। তাদের কার্ড ঢাকায় পাঠিয়ে তারপর যদি কোন সিদ্ধান্ত হয় তবেই টিসিবির কার্ড পাবো বলে ওয়ার্ড অফিস জানিয়েছে। তিনি শুধু একা নন, এ সমস্যায় পড়ছে কেসিসির ৩১টি ওয়ার্ডের বিরাট একটি জনগোষ্ঠী। কেউ মায়ের কার্ডে ছেলের মোবাইল নাম্বার, স্ত্রীর কার্ডে স্বামীর মোবাইল নাম্বার, কারো ভোটার আইডি কার্ডের নাম্বার ভূলসহ এ রকম সমস্যায় নগরীর বড় একটি জনগোষ্ঠী টিসিবি’র কার্ড পাচ্ছেন না। কিন্তু তাদের কার্ড ওয়ার্ড অফিসে এসে বসে আছে। ১০নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলরের বিকল্প দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, খালিশপুর ১০নং ওয়ার্ডে বিগত দিনে টিসিবি পন্য সংগ্রহকারী সদস্য ছিল ৩১শ’। এর মধ্যে সিøপধারী ছিল ৪৩৪ জন। কার্ডধারী ছিল ২৬৬৬ জন। সরকারের পক্ষ থেকে পুরাতন টিসিবি কার্ড ফেরৎ নেয়ার পর অনলাইনে নতুন কার্ড করা হয়েছে। তার মধ্যে ১৭শ’ কার্ড ওয়ার্ড কার্যালয়ে এসেছে। এর মধ্যে মোবাইলে ওটিপি মেলে ১৩৫৬ জনের। বাকী ৩৪৪ জনের মোবাইলে ওটিপি মিলছে না। যার জন্য কার্ডধারী ব্যক্তিদের কার্ড দিতে পারছেন না তিনি। এ নিয়ে চরম অশান্তিতে রয়েছেন ওয়ার্ডের দায়িত্বশীল এই অফিসার। মানুষের তদ্বির আর ফোন বেশী করছে এই কার্ড নিয়ে। কিন্তু তিনি বড়ই অসহায় হয়ে পড়েছেন বলে তিনি জানান। বিষয়টি তিনি কেসিসির সচিবকে জানিয়েছেন বলে জানান। ১৯নং ওয়ার্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নাজমুল হক মুকুল বলেন, নতুন করে তিনি ওয়ার্ডের দায়িত্ব পেয়েছেন। এসেই টিসিবি কার্ডের সমস্যা মোকাবেল করতে গিয়ে অসহায় হয়ে পড়ছেন। টিসিবির স্মার্ট কার্ড ওয়ার্ড অফিসে পড়ে থাকলেও তিনি ওটিপি না মেলার কারণে তিনি সেই কার্ড দিতে পারছেন না গ্রাহককে। তার ওয়ার্ড অফিসে আগে ২৫শ’ কার্ড ছিল। তদন্ত শেষে এখন স্মার্ট কার্ড এসেছে ১৩শ’। এর মধ্যে ৮/৯ শত ব্যক্তিকে স্মার্ট কার্ড দিতে পেরেছেন। বাকী ৪শ’ মত স্মার্ট কার্ড ওয়ার্ড অফিসে পড়ে আছে। ওইসব কার্ডের গ্রাহকরা প্রতিদিনই ওয়ার্ড অফিসে আসছে কার্ড নেয়ার জন্য। কিন্তু ওটিপি না মেলার কারণে কার্ড দিতে পারছি না। এটাই সবচেয়ে বেশী সমস্যা। অন্যান্য সমস্যা কম আছে। এই নিয়ে গ্রাহকরা বিরক্ত করে খাচ্ছে। ২৯নং ওয়ার্ডের দায়িত্ব প্রাপ্ত কর্মকর্তা এড. হাফিজুর রহমান বলেন, তার ওয়ার্ডে ২৫৫০ জন টিসিবি কার্ডধারী রয়েছে। তদন্ত শেষে এখন স্মার্ট কার্ড এসেছে ১৮৫৮টি। এর মধ্যে প্রায় ১৪শ’ গ্রাহককে স্মার্ট কার্ড দিতে পেরেছেন। বাকী প্রায় সাড়ে ৪শ’ জনকে কার্ড দিতে পারেননি। কার্ড ওয়ার্ড অফিসে থাকলেও তা দিতে পারছেন না। কারণ কারোর ওটিপি মিলছে না। কারো মায়ের কার্ডে ছেলের বা স্বামীর মোবাইল নাম্বারসহ আরো অনেক ছোটখাটো ভূলের কারণে এসব কার্ড অফিসে পড়ে রয়েছে। দিনের পর দিন গ্রাহকরা অফিসে আসলেও কার্ড তিনি দিতে পারছেন না। কারণ হিসেবে বলেন, টিসিবি ডিলার কার্ড এ্যাকটিভ করতে না পারলে গ্রাহককে পন্য দিতে পারছেন না। শুধু একটি ওয়ার্ড নয় নগরীর ৩১টি ওয়ার্ডের টিসিবির স্মার্ট কার্ড গ্রাহকরা ওটিবিসহ নানা সমস্যার কারণে কার্ড পাচ্ছেন না। এতে করে তারা টিসিবি পন্য তুলতে পারছেন না। বিষয়টি সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তাকে অবগত করা হয়েছে। এ সমস্যা সমাধান না হলে ওয়ার্ড অফিসে বসে অন্য সেবা করা কঠিন হয়ে পড়ছে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বলে তিনি জানান। খুলনা সিটি কর্পোরেশনের টিসিবি কার্ড তদারকি কর্মকর্তা ও কেসিসির সচিব শরীফ আসিফ রহমান বলেন, নগরীর ৩১টি ওয়ার্ডে ৮৬ হাজার টিসিবির কার্ডধারী মানুষ রয়েছে। এর আগে ম্যানুয়ালে টিসিবি পণ্য উঠাতো। এখন ডিজিটাল পদ্ধতিতে করার কারণে অনেক ভূল ধরা পড়ছে। যার সমস্যা কেন্দ্রীয়ভাবে সমাধান করতে পারবে। স্থানীয়ভাবে সমস্যা সমাধান করা যাচ্ছে না। যার জন্য ওটিপিসহ যেসব সমস্যা ধরা পড়ছে তা কেসিসি তাৎক্ষণিক টিসিবি কর্তৃপক্ষকে অবগত করছেন। আজ সোমবার বাণিজ্য এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন দু’ দিনের সফরে খুলনা আসছেন। সফরসূচি অনুযায়ী উপদেষ্টা ১০ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা ছয়টায় খুলনা জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে টিসিবির ডিলার ও অংশীজনদের সাথে মতবিনিময় সভায় যোগদান করবেন। উপদেষ্টা ১১ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে নয়টায় টিসিবির ট্রাক সেল কার্যক্রমের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগদান, সকাল সাড়ে ১০টায় ও দুপুর আড়াইটায় টিসিবির ফ্যামিলি কার্ডধারী উপকারভোগীদের হোম ভিজিট করবেন। এ সময় টিসিবির ফ্যামিলি কার্ডধারীদের সমস্যা নিয়ে উপদেষ্টাকে জানানো হবে। তখন তিনি কি সিদ্ধান্ত দেন সেই অপেক্ষায় রইলাম। তবে সমস্যা শিগগিরই সমাধান হবে বলে তিনি মনে করেন। তবে কত কার্ড বাতিল ও কত কার্ড সমস্যায় আছে সেই কারেন্ট তথ্য এই কর্মকর্তার কাছে নেই বলে তিনি জানান। খুলনা জেলা প্রশাসক মোঃ সাইফুল ইসলাম বলেন, আজ বাণিজ্য উপদেষ্টা আসবেন। তিনি টিসিবির ব্যাপারে কয়েক ধাপে কথা বলবেন। এ সময় এসব সমস্যাগুলো তার নিকট তুলে ধরা হবে। আশা করি তিনি এসব সমস্যা সমাধানে একটি দিক নির্দেশনা দিয়ে যাবেন।



