নবায়নযোগ্য জ্বালানী জনপ্রিয় করাসহ ৭ দফা দাবিতে সংবাদ সম্মেলন পরিবেশ সুরক্ষা মঞ্চের

স্টাফ রিপোর্টারঃ নবায়নযোগ্য জ্বালানী জনপ্রিয় করাসহ ৭ দফা দাবিতে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। বৃহস্পতিবার বেলা ১২টায় খুলনা প্রেসক্লাবে পরিবেশ সুরক্ষা মঞ্চ খুলনা এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন মঞ্চের সদস্য মেরিনা যুথি, বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন মঞ্জের সভাপতি এড. কুদরত ই খুদা। সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়, বর্তমানে বিশ্বব্যাপী ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতায় জীবাশ্ম জ্বালানি (তেল, গ্যাস, কয়লা) আমদানীতে জটিলতা এবং উচ্চ মূল্য এখন অসহনীয় পর্যায় পৌচেছে। জ্বালানির অভাবে দেশের শিল্প,কল-কারখানা বন্ধ হতে বসেছে। কৃষিতে পানি সেচের অভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে দেশের কৃষি এবং কৃষির উপর নির্ভশীল কৃষক। লোডশেডিং অসহনীয় হয়ে উঠছে জনজীবন। অন্যদিকে জীবস্ম জ্বালানি ব্যবহারে কার্বন নিঃসরণসহ ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে পরিবেশ এবং জলবায়ু। আক্রান্ত হচ্ছি বিভিন্ন দূর্যোগ, ঝড়, বন্যা ও জলচ্ছাসে। বর্তমান বাস্তবতায় বিশ্বব্যাপী বিকল্প জ্বালানি উৎস হিসেবে নবায়নযোগ্য সৌরশক্তি বা সোলার এনার্জি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং কার্যকর সমাধান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ি, বিশ্বব্যাপী মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের, ৩০ শতাংশ এখন নবায়নযোগ্য জ্বালানীর উৎস থেকে উৎপাদিত হচ্ছে। আনন্দের কথা বর্তমান সরকার সোলার বিদ্যুৎ উৎপাদনে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যে রিনিউয়েবল এনার্জি খাতে সর্ব্বোচ্চ বিনিয়োগ নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে দশ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন। এ খাতে বিশেষ গবেষনা কার্যক্রম পরিচালনার আহ্বান জানিয়েছেন। “নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা-২০২৫ এবং “জাতীয় সৌরশক্তি একশন প্লান ২০২১-২০৪১ সঠিক বাস্তবায়নের উপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তবে আমাদের দেশে এর ব্যাপক জনপ্রিয়তার প্রধান প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে, প্রাথমিক পর্যায় উচ্চ ব্যয় এবং আমদানীকৃত যন্ত্রাংশের উপর অধিক শুল্ক ও ভ্যাটের চাপ। বর্তমানে জার্মানির ব্যবহৃত মোট জ্বালানির প্রায় ৪৫ শতাংশ উৎপাদিত হচ্ছে নবায়নযোগ্য সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ এর মাধ্যমে। তারা ২০৫০ সালের মধ্যে এই ব্যবস্থা ৮০ শতাংশে উন্নিত করার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে। পাকিস্তানের সৌরবিদ্যুৎ বিপ্লব একটি উল্লেখযোগ্্য উদাহরণ। যেখানে স্বল্প সময়ে ব্যাপক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করে তারা আমদানি নির্ভরতা কমিয়েছে। ভুটানে ৮০ শতাংশ সৌরবিদ্যুত উৎপাদনে সক্ষমতা অর্জন করেছে। নেপালে উল্লেখযোগ্য হারে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। নেদারল্যান্ডে মোট বিদ্যুৎতের ৩২ শতাংশ শুধু বায়ু শক্তি দ্বারা উৎপাদিত হচ্ছে। বাকীটা সোলার, গ্যাস এবং ফসিল ফুয়েলের মাধ্যমে উৎপাদন করা হচ্ছে। নবায়ন যোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনে নেদারল্যান্ড সমগ্র বিশ্বের মধ্যে এখন একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। ইউরোপীয় দেশগুলোতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার যেভাবে ঘটছে, তাতে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ইউরোপের জ্বালানি খাত হবে সৌর, বায়ু ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি নির্ভর।বার্লিনভিত্তিক একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান মনে করেন, বাংলাদেশের সৌর জ্বালানি উৎপাদনে যথেষ্ট জোর দেওয়া উচিত। তিনি বলেন, সৌর বিদ্যুৎতের জন্য বাংলাদেশ খুবই সম্ভাবনাময় একটি দেশ। কারণ এখানে বছরে তিনশো দিনেরও বেশি রোদ থাকে। বর্তমানে বাংলাদেশের জ্বালানির বড় উৎস প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লা ও আমদানি করা তেল। গবেষকদের মতে, ক্রমাগতভাবে প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত কমে যাওয়া এবং বিশ্ববাজারে ক্রুড অয়েল, গ্যাস ও কয়লার দাম বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনায় দীর্ঘ মেয়াদে এসব জ্বালানির ওপর বাংলাদেশ যদি নির্ভরশীল থাকে, তাহলে এদেশের অর্থনীতির ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হবে।২০২৫-২৬ সালে বাংলাদেশে সর্ব্বোচ্য বিদ্যুত চাহিদা ১৬০০০-১৮০০০ মেগাওয়াট নির্দ্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশে যে পরিমান বিদ্যুৎ স্থাপনা আছে তাদের সর্ব্বোচ্চ উৎপাদন ক্ষমতা অনুযায়ি বর্তমানে আমাদের দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ২৫০০০ মেগাওয়াট এর বেশি। বাস্তবে জ্বালানি সংকট, গ্যাস ঘাটতির এবং কিছু অনিয়মের কারনে এর উৎপাদন এখন কমে ৫০ শতাংশে পৌচেছে। অর্থাৎ প্রতিদিন কমবেশি ২০০০ মেগাওয়াট মতো ঘাটটি। এর মধ্যে ৮ থেকে ১৫ শতাংশ আবার ভারতের আদানি থেকে আমদানী করা হচ্ছে। বাংলাদেশে জ্বালানি খাতে সৌর বিদ্যুৎ থেকে উৎপাদন খুবই কম। অর্থাৎ ১৫৫০ থেকে ১৬০০ মেগাওয়াট মতো। এর মধ্যে সৌর বিদ্যুত থেকে উৎপাদিত হচ্ছে ১২০০ মেগাওয়াট, বাকি ৪০০ মতো মেগাওয়াট পানি, বর্জ এবং অনান্য মাধ্যম থেকে উৎপাদিত হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার ২০২১ সালের মধ্যে জ্বালানি খাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশীদারত্ব ১০ শতাংশ হবে বলে পূর্বপরিকল্পনা করেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুত দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২০ শতাংশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ উৎপাদনের লক্ষমাত্রা নির্দ্ধারণ করা হয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে অনান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে যেহেতু খালি বা ফাকা জায়গা কম সেহেতেু সরকারি ভবনের ছাদে রুপটপ ব্যবহারকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। হাওড় কিম্বা জলাশয়ে ভাষমান প্রকল্প তৈরীর পরিকল্পনাও চলছে। বাংলাদেশের জ্বালানি খাতবিষয়ক সংস্থা আইইইএফএর বিশ্লেষণ, দেশে ছাদ বিদ্যুৎ একটা বড় সম্ভাবনার জায়গা। তাদের মতে, এ খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে, যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক কমিয়ে ঋণপত্র খোলার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিয়ে এবং বাংলাদেশ ব্যাংক বিশেষ তহবিল গঠনের মাধ্যমে ছাদবিদ্যুৎ উৎপাদনে উৎসাহী করা যেতে পারে। একই সাথে সরকার এই খাতে ব্যবসায়ীদের আগ্রহী করে তুলতে প্রণোদনার ব্যবস্থা রাখতে পারে। বর্তমান বিশ্বে সৌরবিদ্যুৎ একটি সম্ভাবনাময় এবং টেকসই সমাধান হিসেবে বিবেচিত হলেও, বাংলাদেশে এর উচ্চ ব্যয় এবং শুল্কের চাপ এর বিস্তারে প্রধান প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বাস্তবতায়, আমরা আগামী জাতীয় বাজেটে সৌরবিদ্যুৎ সংশ্লিষ্ট সকল যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তির ওপর আরোপিত শুল্ক সম্পূর্ণ মওকুফে সরকারের প্রতি জোর দাবি জানাচ্ছি। শুল্ক মওকুফের মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎতের ব্যবহার সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আসবে এবং দেশব্যাপী এর ব্যবহার দ্রুততম হারে বৃদ্ধি পাবে। দাবীসমূহ হলোঃ আসন্ন বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানির যন্ত্রপাতি-(সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি) আমদানিতে শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহার করতে হবে। সৌর বিদ্যুৎ স্থাপনে বিনিয়োগকারীদের জন্য সরকারি প্রণোদনা নিশ্চিত করতে হবে এবং সরকারি ভাবে সহজ স্বর্তে ঞন প্রদান নিশ্চিত করতে হবে। মাঠ পর্যায়ে কৃষি কাজে সৌরচালিত সেচ পাম্প ব্যবহারে সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। আইন করে সরকারি অবকাঠামোসহ প্রত্যেকটি বহুতল বিশিস্ট ইমারত এবং বড় বড় সপিং মলে বাধ্যতামূলক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার আইন করে নিশ্চিত করতে হবে। গ্রামীণ আবাসন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমূহে সরকারি ব্যবস্থাপনায় সৌর বিদ্যুৎ ব্যবহারে বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। সোলারে দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষে কারিগরি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তরুণ ও যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। সোলার ব্যবহারে গ্রামীণ ক্ষুদ্র শিল্পে নারীর ক্ষমতায়ণ এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে তাদের অবদানরাখার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। যেমন- সোলার দ্বারা পরিচালিত ইউকিবিটরে মুরগির বাচ্চা উৎপাদন, গ্রামীন সেচ প্রকল্পসহ বিভিন্ন কাজে অর্ন্তভূক্তি। জ্বালানি সংকট সমাধানে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনে দেশব্যাপী সকল স্তরে প্রচার এবং ঐকমত্য গড়ে তুলতে হবে।সরকারের সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে এবং একটি পরিবেশবান্ধব, টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে সহায়ক হবে। সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ সুরক্ষা মঞ্চের সদস্য অজান্তা দাস, এড, জাহাঙ্গীর সিদ্দিকী, নাজমুল আজম ডেভিড, আফজাল হোসেন রাজু, জাবেদ খালিদ জয়, খলিলুর রহমান সুমন।



