খুলনাঞ্চলে সোনালী আঁশ’র নীরব বিপ্লব

লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়েছে আবাদ
সম্ভাব্য উৎপাদন ৯০ হাজার ৫৩৫ মেট্রিক টন
সম্ভাব্য আয় ৯০৫ কোটি ৩৪ লাখ টাকা
মো. আশিকুর রহমান : পাট বাংলাদেশের একটি অর্থকরী ফসল, যা ‘সোনালী আঁশ’ নামে খ্যাত। বাংলাদেশের জলবায়ূ ও মাটি পাট চাষের জন্য বিশেষ উপযোগী। এপ্রিল মাসে প্রথম সপ্তাহ থেকে পাটের বপন শুরু হয়। খুলনাঞ্চলে ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে কর্তন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলতি বছরে বৃষ্টির উপস্থিতি বেশি থাকায় কৃষকের কৃত্রিম বা সেচের পানির তেমন প্রয়োজন হয়নি, যে কারনে উৎপাদন খরচ কম হওয়ার এ বছর পাট উৎপাদনে কৃষক বেশি লাভবান হবেন। আশা করা যাচ্ছে খুলনাঞ্চলের সম্ভাব্য উৎপাদিত পাট ও আয় দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে, যা এই অঞ্চলের কৃষকদের পাট উৎপাদনে আরও বেশি আগ্রহী করে তুলবে। এ অঞ্চলে এবার পাটচাষে নীরব বিপ্লব ঘটতে যাচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খুলনাঞ্চল সূত্রে জানা গেছে, খুলনাঞ্চলে পাটের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থ বছরে পাটের আবাদ ও উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেন সংশ্লিষ্টরা। ওই লক্ষ্যমাত্রা অনুসারে চলতি বছরে খুলনাঞ্চলের ৪ জেলায় (দেশি, তোষা ও মেস্তা জাতের পাট) খুলনা জেলায় ১ হাজার ২৫৭ হেক্টর, বাগেরহাট জেলায় ১ হাজার ৯২০ হেক্টর, সাতক্ষীরা জেলায় ১১ হাজার ৬১০ হেক্টর ও নড়াইল জেলায় ২৩ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়।
লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আবাদের চুড়ান্ত অগ্রগতি খুলনা জেলায় ১ হাজার ২৩০ হেক্টর, হার ৯৭.৯%, বাগেরহাট জেলায় ১ হাজার ৯৩৯ হেক্টর, হার ১০১.০%, সাতক্ষীরা জেলায় ১১ হাজার ৬৭৫ হেক্টর, হার ১০০.৬% ও নড়াইল জেলায় ২৩ হাজার ৫১৭ হেক্টর, হার ১০০.১% , অঞ্চলে ৩৮ হাজার ৩৬১ হেক্টর, হার ১০০.২% সম্পন্ন হয়েছে। আবাদের চুড়ান্ত অগ্রগতির বিপরীতে পাট উৎপাদনের সম্ভাব্য লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে খুলনায় ২ হাজার ৮০৭ মেট্রিক টন, বাগেরহাটে ৪ হাজার ৪০১ মেট্রিক টন, সাতক্ষীরায় ২৫ হাজার ৬৫২ মেট্রিক টন ও নড়াইলে ৫৭ হাজার ৬৭৫ মেট্রিক টন।
খুলনাঞ্চলের ৪ জেলার সমন্বয়ে সম্ভাব্য উৎপাদন ৯০ হাজার ৫৩৫ মেট্রিক টন পাট। পাটের সম্ভাব্য উৎপাদনের বিপরীতে সম্ভাব্য আয় ধরা হয়েছে (গত বছর স্থানীয় মোকামে প্রতি মণ পাট বিক্রি হয় ৪ হাজার টাকা দরে, ওই দর অনুসারে) খুলনায় ২৮ কোটি ৬ লাখ ৬২ হাজার ২’শ টাকা, বাগেরহাটে ৪৪ কোটি ১ লাখ, ১২ হাজার ৪’শ টাকা, সাতক্ষীরায় ২৫৬ কোটি ৫১ লাখ ৬২ হাজার ৬’শ টাকা এবং নড়াইলে ৫৭৬ কোটি ৭৫ লাখ ৪৩ হাজার ৬’শ টাকা। ৪ জেলার সমন্বয়ে এ অঞ্চলের সম্ভাব্য আয় ধরা হয়েছে ৯০৫ কোটি ৩৪ লাখ ৮০ হাজার ৮’শ টাকা।
নড়াইলের কালিয়া উপজেলার জোকারচর গ্রামের কৃষক তৈয়েবুর কাজী জানান, আমি ৪ বিঘা জমিতে পাটের চাষ করেছি। প্রতি বছরই পাটের চাষাবাদ করি। প্রথমে জমি প্রস্তুতি করি, অতঃপর সার ছিটিয়ে বীজ বপন করি, ইতোমধ্যে পাটের কর্তন শুরু করেছি। এ বছর বৃষ্টির আনাগোনা ভালো, বিগত বছরের মতো বিকল্প পানি লাগেনি। তবে ক্ষেতে পানি বেশি হওয়ার দরুন গাছ ভেঙে পড়েছে। যে কারনে পাট কর্তনে খরচ বেশি লাগছে।
দিঘলিয়া উপজেলার গাজিরহাট ইউনিয়নের কৃষক শাহাবুদ্দিন জানান, এ বছরও জমিতে পাটের চাষাবাদ সম্পন্ন করেছি। পাটের বপণ শেষে এখন কর্তনের পালা, দ্রুত সময়ের মধ্যে পাট কাটা শুরু করবো। এ বছর বেশি ভারী বৃষ্টি হওয়ার দরুন, সেচের পানির প্রয়োজন হয়নি। উপজেলা কৃষি অফিস হতে সার্বিক বিষয়ে পরামর্শ ও সহায়তা করছেন।
দিঘলিয়া উপজেলার গাজীরহাট ইউনিয়নের বামনডাঙ্গা ব্লকের দায়িত্বরত উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা এম. এম আব্দুল্লাহ জানান, চলতি অর্থবছরে পাটের আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৫ হেক্টর, ইতোমধ্যে শতভাগ অর্জন হয়েছে। ইতোমধ্যে পাট কর্তন শুরু হয়েছে। সার্বিক বিষয়ে কৃষকদের পাশে থেকে পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে।
কালিয়া উপজেলা কৃষি অফিসের উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তা মোঃ আলী রেজা মিঠু জানান, আমার বড়নাল ইলিয়াছাবাদ ইউনিয়নের দায়িত্বরত ব্লকে চলতি অর্থবছরে ২৫ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারন করলেও অর্জিত হয়েছে ২৭ হেক্টর। এ বছর পাটের আবাদ ভালো হয়েছে এবং বৃষ্টিপাত বেশি থাকায় কৃষকের সেচের পানি ব্যবহার করতে হয়নি, যার দরুন খরচ কম হয়েছে। ইতোমধ্যে কর্তন শুরু হয়েছে। কর্তন থেকে শুরু করে বিপনন পর্যন্ত সার্বিক বিষয়ে কৃষকদের পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে।
খুলনার দিঘলিয়া উপজেলা কৃষি অফিসার মো. শফিকুল ইসলাম জানান, চলতি অর্থবছরে অত্র উপজেলায় পাটের আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ৪০ হেক্টর জমি নির্ধারিত করা হয়, যার শতভাগ ইতোমধ্যে অর্জিত হয়েছে। এ বছর বৃষ্টিপাত বেশি থাকায় পাটের চাষাবাদে বিকল্প পানির প্রয়োজন হয়নি। কৃষকেরা এখন পাট কর্তনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। পাট সঠিক প্রক্রিয়ায় বিপননের জন্য উপজেলার কৃষকদের সার্বিক বিষয়ে পরামর্শ ও সহয়তা করা হচ্ছে।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলা কৃষি অফিসার মো. আবু সাঈদ শুভ্র জানান, অত্র উপজেলাতে চলতি অর্থবছরে পাটের আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারন করা হয়েছে ৫,০২০ হেক্টর, শতভাগ অর্জন সম্পন্ন হয়েছে, ইতোমধ্যে কর্তন শুরু হয়েছে। এ বছর অধিক বৃষ্টিপাতের দরুন পাট চাষা বিকল্প পানির প্রয়োজন না হওয়ার দরুন কৃষকের খরচ কমেছে। এছাড়া অত্র উপজেলা হতে চলতি অর্থ বছরে ৫০০ জন কৃষককে পাটের প্রনোদনা হিসাবে (বীজ, ডিএবি ও এমওপি সার) প্রদান করা হয়েছে। কৃষক যেন পাট জাক দেওয়ার সময় কাদা-মাটি লাগিয়ে পাটের উজ্জ্বলতা না হারায় সেদিকে বিশেষ পরামর্শ ও খেয়াল রাখাসহ সার্বিক বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
নড়াইল কালিয়া উপজেলা কৃষি অফিসার জাহাঙ্গীর আলম জানান, কালিয়া উপজেলাতে চলতি অর্থবছরে পাটের আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারন করা হয়েছে ৪,৪০৮ হেক্টর, শতভাগ অর্জন সম্পন্ন হয়েছে, ইতোমধ্যে কর্তন শুরু হয়েছে। এ বছর অধিক বৃষ্টিপাতের দরুন পাট চাষা বিকল্প পানির প্রয়োজন না হওয়ার দরুন কৃষকের খরচ কমেছে। এছাড়া অত্র উপজেলা হতে চলতি অর্থ বছরে ৬৫০ জন কৃষককে পাটের প্রনোদনা হিসাবে (বীজ, ডিএবি ও এমওপি সার) প্রদান করা হয়। কৃষক যেন পাট জাঁক দেওয়ার সময় কাঁদা-মাটি লাগিয়ে পাটের উজ্জ্বলতা না হারায় সেদিকে বিশেষ পরামর্শ ও খেয়াল রাখাসহ সার্বিক বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তর নড়াইল জেলার উপপরিচালক মো. আরিফুর রহমান জানান, চলতি অর্থবছরে নড়াইল জেলার পাটের আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৩,৫০০ হেক্টর, লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ২৩,৫১৭ হেক্টর অর্জিত হয়েছে। ইতোমধ্যে পাট কর্তন শুরু হয়েছে। এ বছর পাটের আবাদ বেশ ভালো হয়েছে। যথেষ্ট বৃষ্টিপাতের কারনে বিগত বছরগুলোর মতো কৃষকের বিকল্প পানির ব্যবস্থা করা লাগেনি। পাট চাষে উৎবুদ্ধকরণের জন্য ৩২০০ জন কৃষককে প্রনোদনা হিসাবে বীজ ও সার প্রদান করা হয়েছে। কৃষকদের প্রদানকৃত বীজ (তোষা, সবুজ সোনা) চমৎকার ফলন হয়েছে। আশাবাদী এ জাতটি আগামী বছর পাট উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রাখবে।
কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের খুলনা অঞ্চল খুলনার অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ মো. রফিকুল ইসলাম জানান, চলতি অর্থবছরে পাট আবাদ ও উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা শতভাগ ইতোমধ্যে অর্জিত হয়েছে এবং কর্তনও শুরু হয়েছে। পাট চাষে আগ্রহী করে তোলার জন্য কৃষকদের প্রণোদনা হিসাবে উন্নত জাতের পাটের বীজ ও সার প্রদান করা হয়েছে। এ বছর পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হওয়ার দরুন বিকল্প সেচের প্রয়োজন হয়নি, কৃষকের খরচ কমেছে। আশাকরি এই অঞ্চলের পাটের সম্ভাব্য উৎপাদন ও আয় দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রাখার পাশাপাশি কৃষকদেরকেও আর্থিক লাভবানের মাধ্যমে আরও আত্মনির্ভরশীল করে তুলবে।



