স্থানীয় সংবাদ

আজ থেকে বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন উন্মুক্ত

# দীর্ঘ তিন মাসের নিস্তব্ধতা ভেঙে #
# উপকূলীয় অঞ্চলের জেলে, বাওয়ালী ও পর্যটন ব্যবসায়ীদের মাঝে ফিরে এসেছে উৎসবের আমেজ ও কর্মচাঞ্চল্য
# স্বস্তির মাঝেও বনদস্যুদের আতঙ্কে বনজীবিরা

আবু-হানিফ ও রিয়াছাদ আলী ঃ দীর্ঘ তিন মাসের নিরবচ্ছিন্ন বিশ্রাম ও নিস্তব্ধতা ভেঙে মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) থেকে ফের দর্শনার্থী ও বনজীবীদের জন্য উন্মুক্ত হচ্ছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। জলজ প্রাণীর বংশবৃদ্ধি ও বন্যপ্রাণীর নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিতে জারি করা টানা ৯২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে সুন্দরবন ফিরে পেয়েছে তার আদিম ও সতেজ রূপ। অন্যদিকে, বন পুনরায় খুলে দেওয়ার খবরে উপকূলীয় অঞ্চলের জেলে, বাওয়ালী ও পর্যটন ব্যবসায়ীদের মাঝে ফিরে এসেছে উৎসবের আমেজ ও কর্মচাঞ্চল্য। গত ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত মানবসৃষ্ট কোলাহল ও যান্ত্রিক নৌযান মুক্ত থাকায় বন তার স্বাভাবিক ইকোসিস্টেম ফিরে পেয়েছে। বৃষ্টির জলে ধুয়ে যাওয়া সবুজে সুন্দরী, গেওয়া ও কেওড়া বনে লেগেছে নতুন সজীবতার ছোঁয়া। ভোলা ও আলীবান্দা নদীর মোহনায় শান্ত জলে হরিণের অবাধ বিচরণ এবং চরে নির্ভয়ে কুমিরের রোদ পোহানোর দৃশ্য এখন স্পষ্ট। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, “মানবসৃষ্ট চাপ কম থাকায় বনের ইকোসিস্টেম নিজের ক্ষত নিজেই নিরাময় করেছে। বিশেষ করে বাঘ ও হরিণসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণীর নিরাপদ প্রজনন এবং উদ্ভিদের স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য এই নির্দিষ্ট সময়ের নীরবতা অত্যন্ত কার্যকরী প্রমাণিত হয়েছে।” বন বিভাগের অফিসগুলো থেকে পাস-পারমিট সংগ্রহ করে বনের গহিনে যাত্রার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছেন হাজারো মৎস্যজীবী ও বাওয়ালী। শরণখোলা, মোংলা ও কয়রার জেলেপল্লীগুলোতে ট্রলার মেরামত, জাল তালি দেওয়া এবং রসদ সংগ্রহের ব্যস্ততা এখন চরমে। ট্যুর অপারেটর ও রিসোর্ট মালিকরাও পর্যটকদের জন্য জলযান প্রস্তুত রেখেছেন; শুরু হয়েছে অগ্রিম বুকিংও। তবে এই কর্মচাঞ্চল্যের আড়ালে জেলেদের মনে রয়েছে তীব্র দুশ্চিন্তা। টানা তিন মাস আয় বন্ধ থাকায় অধিকাংশ জেলেকে চড়া সুদে মহাজনের দাদন কিংবা এনজিওর ঋণ নিয়ে সংসার চালাতে হয়েছে। তার ওপর সম্প্রতি বনের ভেতরে দু-একটি দস্যুদলের আনাগোনার খবরে নতুন করে চাঁদা দাবির আতঙ্ক তাড়া করছে তাদের।
জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও বনজ সম্পদ রক্ষায় কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে বন বিভাগ। সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, বনের দুর্গম এলাকায় নিয়মিত বিশেষ অভিযানের পাশাপাশি ড্রোন দিয়ে আকাশপথে নিবিড় নজরদারি চালানো হচ্ছে। নিষেধাজ্ঞা চলাকালে বনরক্ষীরা ৬৩টি অভিযান চালিয়ে ৩৭ জন অপরাধীকে আটকসহ ৩৯টি মামলা দায়ের করেছে। পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সুন্দরবনে প্রবেশের ক্ষেত্রে এবার কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে: বনের বাস্তুসংস্থান রক্ষায় ওয়ান-টাইম প্লাস্টিক (সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিক) বোতল, প্লেট বা পলিথিন বহন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বনের নীরবতা ও বন্যপ্রাণীর বিচরণ স্বাভাবিক রাখতে সাউন্ডবক্স বা উচ্চ শব্দ তৈরি করে এমন যেকোনো যন্ত্র ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা থাকবে। নির্ধারিত ট্রেইল ও অনুমোদিত পথ ব্যতীত অভয়ারণ্যের গভীরে অবৈধ প্রবেশ কঠোরভাবে দমন করা হবে। সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও বিশ্ব ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে পর্যটক ও বনজীবী উভয়কেই এসব আইনি নীতি কঠোরভাবে মেনে চলার নির্দেশ দিয়েছে বন কর্তৃপক্ষ।
অপরদিকে আমাদের কয়রা (খুলনা) প্রতিনিধি ‎রিয়াছাদ আলী, জানান ঃ ‎টানা তিন মাসের আইনি নিষেধাজ্ঞা শেষে আজ ১ সেপ্টেম্বর খুলে দেওয়া হচ্ছে বিশ্বের ঐতিহ্য সুন্দরবন। বনের নদ-নদী ও খালে মাছ এবং কাঁকড়া আহরণের প্রজননকালীন দীর্ঘ বিরতি শেষ হওয়ায় আনন্দ বয়ে যাওয়ার কথা ছিল সুন্দরবনসংলগ্ন উপকূলীয় জেলে-বাওয়ালিদের পাড়ায়। কিন্তু কয়রাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ঘাটগুলোতে এখন কেবল ব্যস্ততার কোলাহলই নেই, তার নিচে চাপা পড়ে আছে গভীর এক শঙ্কা। দীর্ঘ মন্দা কেটে রুটি-রুজির নতুন পথ যেমন খুলছে, তেমনি জল ও জঙ্গলের জোড়া আতঙ্কে দিন কাটছে বনজীবীদের। তবে তারা শন্কা মাথায় নিয়ে সুন্দরবনে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। কারন বনদস্যুদের ভংকর নির্যাতন আর তাদের ধার্যকৃত টাকা। এ সব মাথায় নিয়েই তারা প্রবেশ করবে গহীন সুন্দরবনে জীবিকার সন্ধানে। জানা গেছে প্রজনন মৌসুমে মাছ ও বন্যপ্রাণীর নির্ভয় বিচরণ নিশ্চিত করতে গত ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সব ধরনের প্রবেশাধিকার বন্ধ রেখেছিল বন বিভাগ। নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার খবরের পর মহেশ্বরীপুর,কয়রা ,উত্তর বেদকাশী, দক্ষিণ বেদকাশীসহ বিভিন্ন এলাকার জেলেরাও নেমেছেন শেষ মুহূর্তের তড়জোড়ে। ভাঙা নৌকা মেরামত, নতুন কাঠ পাল্টানো, জাল সেলাই আর দড়ি দড়াট বাঁধার কাজে দিনরাত ব্যস্ত তারা। কয়রার উত্তর বেদকাশি গ্রামের প্রবীণ জেলে মোজাফফর আক্ষেপ করে বলেন, “প্রায় ৪২ বছর বনে জলজঙ্গল করে কোনোরকমে বেঁচে আছি। বন বন্ধ হলে আমাদের উপার্জনের আর কোনো পথ থাকে না। তিন মাস চাল-ডালের টান ছিল, পর্যাপ্ত কোনো সহায়তা পাইনি। তবে ১ সেপ্টেম্বর বন খুললে আবার নামতেই হবে।”‎বনযাত্রার এই আয়োজনের পেছনে রয়েছে বিশাল ঋণের বোঝা। স্থানীয় জেলে ও বনজীবীরা জানান, চাল-ডাল কেনা, ট্রলার বা নৌকার তেল, নতুন জাল ও পারমিটের আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে বনে নামার আগেই একটি নৌকা প্রতি ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা আগাম খরচ হয়ে যায়। আর এই টাকার বেশিরভাগই আসে চড়া সুদের মহাজনি ঋণ থেকে। কয়রার মৎস্য ব্যবসায়ী মোঃ কামরুল ইসলাম বলেন, উপকূলের বনজীবীদের এই যাত্রাকে কেবল সাধারণ কর্মসংস্থান বলা চলে না; এটি একপ্রকার জীবনের বাজি ধরা। একদিকে বনে পর্যাপ্ত মাছ পাওয়ার অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে পদ পদে মৃত্যুঝুঁকি। সুন্দরবনের নদী-খালে পা ফেলতেই ওঁৎ পেতে থাকে হিংস্র বাঘ। একটু অসাবধান হলেই কিংবা ম্যানগ্রোভের গহিনে কাঠ ও গোলপাতা কাটতে গেলে কার কপালে বাঘের থাবা জোটেÑসেই আতঙ্কে প্রতিটি মুহূর্ত কাটান বাওয়ালিরা। জলে নামলে রয়েছে নরখাদক কুমিরের ভয় আর ডালে ডালে সাপের ফোঁসফোঁসানি। কিন্তু প্রকৃতির এই হিংস্রতার চেয়েও এখন বেশি আতঙ্ক ছড়াচ্ছে সুন্দরবনে পুনরায় ‘বনদস্যু’ বা জলদস্যুদের মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার আশঙ্কা। দীর্ঘ তিন মাস বন নীরব থাকায় গহিন জঙ্গলে নতুন করে দস্যু দলগুলোর ঘাঁটি গাড়ার খবর চাউর হয়েছে এলাকা জুড়ে। বনে ঢুকলেই অপহরণ, মুক্তিপণ দাবি এবং প্রাণনাশের হুমকিতে নিঃস্ব হতে হয় সাধারণ জেলেদের। বনজীবীদের দাবি, একদিকে বিষ দিয়ে মাছ ধরা বন্ধ ও নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার রুখতে যেমন বন বিভাগের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন, তেমনি ডাঙ্গার ডাকাত ও বনের জলদস্যুদের তান্ডব থামাতে কোস্ট গার্ড ও আইনশৃঙ্খলা অন্যান্য বাহিনী নিয়মিত টহল অপরিহার্য। ১ সেপ্টেম্বর থেকে পাস-পারমিট নিয়ে যখন শত শত নৌকা সুন্দরবনের গহিনে ছড়িয়ে পড়বে, তখন তাদের সেই যাত্রায় বেঁচে থাকার আকুতির সঙ্গে সঙ্গে মিশে থাকবে কেবলই বেঁচে ফেরার প্রার্থনা। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সুরক্ষার পাশাপাশি উপকূলের এই অসহায় মানুষদের জীবনের নিরাপত্তাটুকু নিশ্চিত করা না গেলে বননির্ভর জীবিকা চিরতরে হুমকির মুখে পড়বে। সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ( ডিএফও) এজেডএম হাছানুর রহমান বলেন, ১ সেপ্টেম্বর থেকে সুন্দরবনে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে। ইতিমধ্যে জেলেদের পারমিট দেওয়ার জন্য সকল প্রস্তুুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। তারা যাতে নিবিঘেœ মাছ ও কাঁকড়া ধরতে পারে তার জন্য সবার্ত্মক নিরাপত্তার ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়েছে।

 

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button