স্থানীয় সংবাদ

‘আল্লাহর কাছে ছেলে হত্যার বিচার ছেড়ে দিলাম, অন্য কারো কাছে বিচার চাই না’ : নিহত রনির ‘মা’

দৌলতপুরে রনি হত্যাকা-
# হত্যাকা-ের ৬ দিন কেটে গেলেও আসামী গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ #

স্টাফ রিপোর্টার ঃ খুলনা মহানগরীর দৌলতপুর থানাধীন মহেশ^রপাশা পশ্চিমপাড়া ঘোষপাড়া এলাকার মৃত: মোশারেফ হোসেনের ছেলে নির্মম, নিষ্ঠুর ও নৃশংস হত্যাকা-ের শিকার নিহত মনিরুল ইসলাম (রনি) পেশায় ছিলেন একজন দিনমজুর। তার বাবা মারা যায় ২০১৩ সালের মার্চ মাসে, তখন ছোট্ট রনির বয়স মাত্র ১২ বছর। বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের হাল ধরেন রনি। সর্বশেষ, তিনি একটি ওয়ার্কশপে শ্রমিকের কাজ করে বিধবা মা, স্ত্রী ও পনের মাসের একমাত্র শিশু সন্তানের ভরণপোষণ চালাতেন। ছোট্ট পরিবারের তিনটি মানুষের জীবন-জীবিকা নির্ভর করতো নিহত ওই রনির উপর। ঘাতকেরা নির্মম, নিষ্ঠুর ও নৃশংস অপরাধ সংগঠিত করে শুধু রনিকেই হত্যা করেনি, বরং পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তিকে হত্যা করে গোটা পরিবারকেই পথে বসিয়েছে। বিশেষ করে অবুঝ, নিষ্পাপ শিশুটিকে অভাব, অনাহার ও অনিশ্চিত ভবিষৎতের দিকে ঠেলে দিয়েছে, মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) সকালে অশ্রুসিক্ত কন্ঠে প্রতিবেদককে নিহত রনির মা নাসিমা বেগম এসব কথা বলেছেন।
তিনি অশ্রুসিক্ত কন্ঠে প্রতিবেদককে জানান, রনির বাবা যখন মারা যায়, তখন রনি ছোট্ট এক কিশোর। ওর বয়স তখন ১২ বছর আর ছোট বোনের বয়স ৭ বছর। তখন থেকে পরিবারের রুটিরুজি যোগাতে কর্মে নমে পড়ে। ‘ও’ কখনো বসে থাকেনি, কোনো না কোনো কাজ করে সংসার চালিয়েছে। গত মাসের ২৩ তারিখে রনি হঠাৎ নিখোঁজ হলো। সবখানে খুঁজেছি, সন্ধ্যান না পেয়ে থানায় জিডি করি। আমার রনি সাদামাঠা জীবন-যাপন করতো। ওর সাথে কারো শত্রুতা ছিল কিনা, আমার অজানা। বাবা হারা একমাত্র পুত্র ঘর থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হলো, ২৬ তারিখে ঘেরে মিললো আমার সন্তানের নিথর মরদেহ, ঘাতকেরা আমার সন্তানকে কি নির্মম, নিষ্ঠুর ও নৃশংসভাবে কষ্ট দিয়ে হত্যা করেছে। ঘাতকেরা আমার পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ছেলেকে হত্যা করলো। ‘ঘরে ওর পনের মাসের অবুঝ শিশু সন্তানটি মারাত্বক অসুস্থ (হৃদরোগে আক্রান্ত), অসুস্থ আমি ও পুত্রবধূ দু’জনই। আমাদের ভরণভোষণ এখন কে চালাবে, কে আমাদের মুখে আহার তুলে দেবে, সবাই শান্তনা দিচ্ছে, কেউ সাহায্য করবে না, করলেও কতদিন? বাস্তবতা অনেক কঠিন। এ শোক আমি সইবো কেমন করে। অশ্রুসিক্ত কন্ঠে তিনি আরও জানান, থানায় মামলা করলাম। মামলার করার ৬ দিন কেটে গেল, কারা আসামী? কারা এ খুন করেছে? কি কারণে খুন করেছে? কারা আমার আদরের সন্তানকে কেড়ে নিয়ে আমার বুক খালি করলো, জানতে পারলাম না,‘আল্লাহর কাছে ছেলে হত্যার বিচার ছেড়ে দিলাম, অন্য কারো কাছে বিচার চাই না,। তিনি আক্ষেপ করে আরও জানান, যার উপার্জন দিয়ে আমাদের মুখে ভাত উঠতো, সেই রনি আজ আর নেই, কি হবে মামলা করে, বিচার চেয়ে। ছেলে কি ফিরে আসবে? যেখানে আমাদের পেট চলছে না, সেখানে কেস (মামলা) চালানোর টাকা কোথায় পাবো? আদালতে দৌঁড়াবো কি করে, মামলা তুলে নিতে চাই আমি। আপনারা পারলে আমাদের একটু সাহায্য করুন, বাবা হারানো অসহায় অসুস্থ নাতির সুস্থতার জন্য একটু সাহায্য করুন, মনিরুল ইসলাম (রনি) হত্যাকা-ের ৬ অতিবাহিত হয়ে গেলেও মামলা তদন্তে কোনো অগ্রগতি বা আসামি গ্রেপ্তার না হওয়া এবং অর্থকষ্টে থাকার কারণেই প্রতিবেদকের কাছে এমনই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন নিহত রনির মা মামলার বাদী নাসিমা বেগম।
এদিকে, মনিরুল ইসলাম (রনি) হত্যাকা-ের ৬ অতিবাহিত হয়ে গেলেও নেই মামলার উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি, এখন পর্যন্ত পুলিশ ওই হত্যাকা-ে জড়িত কোনো আসামীকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। পুলিশ বলছে, নিহত নিখোঁজ যুবকের হত্যাকা- ও গুমের চেষ্টার ঘটনায় ইতোমধ্যে নিহতের মা বাদী হয়ে সংশ্লিষ্ট থানায় অজ্ঞাতনামা আসামীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছেন। মামলার পর থেকে তথ্য-প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তকে সামনে রেখে হত্যাকা-ের রহস্য উৎঘটনে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে মামলার তদন্তের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। আসামী শণাক্ত হয়েছে, গ্রেপ্তারে একাধীক টিম কাজ করছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে খুনের প্রকৃত কারণ, রহস্য উৎঘটন, জড়িতদের শণাক্ত ও আইনের আওতায় আনতে সক্ষম হবে পুলিশ।
এ বিষয়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও কার্তিককূল ফাঁড়ি ইনচার্জ এসআই সুফল জানান, কার্তিককূল এলাকায় যুবক খুনের ঘটনায় নিহতের মা বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামীর বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলার তদন্তের কার্যক্রম চলমান রয়েছে, আসামী গ্রেপ্তারেও অভিযান চলছে।
এ বিষয়ে দৌলতপুর থানা অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মুঃ মোরাদুল ইসলাম জানান, যুবক খুনের ঘটনায় নিহতের মা অজ্ঞাতনামা আসামীর বিরুদ্ধে হত্যা ও গুমের মামলা করেছেন। বিভিন্ন বিষয়কে সামনে নিয়ে আমরা তদন্তের কার্যক্রম চলমান রেখেছি, আসামী শণাক্ত হয়েছে, গ্রেপ্তারেও আমাদের একাধীক টিম কাজ করছে। আশাবাদী দ্রুত সময়ের মধ্যে হত্যাকা-ের প্রকৃত রহস্য উৎঘটন ও জড়িতদের গ্রেপ্তারে সক্ষম হবে পুলিশ।
উল্লেখ্য, দৌলতপুর থানাধীন বাইপাস সড়ক সংলগ্ন কার্তিককূল জনৈক নাসিরের মাছের ঘের হতে ভাসমান অবস্থায় নিখোঁজের তিন দিন পর গত, ২৬ আগষ্ট সন্ধ্যায় মনিরুল ইসলাম (রনি) নামের এক যুবকের অর্ধগলিত গলায় রশি দিয়ে চেপে ধরার দাগ, পেট ফাঁড়া (নাড়ি-ভুড়ি বের হওয়া), দু’হাত ও পা পিঠমোড়া দিয়ে বাঁধা এবং বালি ভরা বস্তা হাতের সাথে বাঁধা অবস্থার ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ এবং ২৭ আগষ্ট সকল আইনগত প্রক্রিয়ার কার্যক্রম সম্পন্ন করে নিহতের পরিববারের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করে পুলিশ, একই দিনের বাদ আসর মহেশ^রপাশা পশ্চিমপাড়া মোড় এলাকায় নিহতের জানাযা নামাজ সম্পন্নের পর সরকারি মহেশ^রপাশা (সাড়াডাঙ্গা) কবরখানায় দাফন সম্পন্ন হয়। সর্বশেষ, গত ২৮ আগষ্ট সকালে নিহতের মা বাদী হয়ে সংশ্লিষ্ট থানায় অজ্ঞাতনামা আসামী বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন। তবে, হত্যাকা-ের ৬ দিন অতিবাহিত হয়ে গেলেও ওই ঘটনায় জড়িত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button