স্থানীয় সংবাদ

ওষুধের দামে জিম্মি খুমেক হাসপাতালের রোগীরা, মুক্তি মিলবে কবে?

শেখ মোঃ জাকির হোসেন, খুমেক প্রতিনিধি : মায়ের চিকিৎসা করাতে বাগেরহাটের চিতলমারী থেকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এসেছেন রাহমাতুল্লাহ। চিকিৎসকের পরামর্শে প্রয়োজনীয় ওষুধ কিনতে গিয়ে পড়েছেন বাড়তি খরচের চাপে।
তাঁর অভিযোগ, কয়েকদিন আগেও যে মেরোজেক্ট ইনজেকশন ৭১০ থেকে ৭২০ টাকায় কিনেছিলেন, সেটিই এখন কিনতে হয়েছে ৯১০ টাকায়। জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনে হাসপাতালের সামনে থেকেই ওষুধ কিনতে হচ্ছে তাঁকে। তাই দামের বিষয়ে আপত্তি থাকলেও কার্যত কিছু করার থাকছে না।
তিনি বলেন, আমাদের অনেকটা জিম্মি করেই এই দাম রাখা হচ্ছে। রাহমাতুল্লাহর মতো এমন অভিজ্ঞতার কথা জানাচ্ছেন আরও অনেক রোগী ও তাঁদের স্বজন।
তাঁদের অভিযোগ, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনের ওষুধের দোকানগুলোতে একই ওষুধ আগের তুলনায় বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। এতে চিকিৎসার ব্যয়ের চাপে থাকা অসহায় রোগীদের ভোগান্তি আরও বাড়ছে। এ পরিস্থিতির নেপথ্যে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গেটসংলগ্ন ওষুধ ব্যবসায়ী সমিতির নতুন সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সমিতির জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে ১১ অক্টোবর সকাল ৬টা থেকে সব ওষুধ নির্ধারিত সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (এমআরপি) অনুযায়ী বিক্রির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সদস্যদের সমিতির সিদ্ধান্ত ও নিয়মাবলি মেনে ঐক্যবদ্ধভাবে ব্যবসা পরিচালনার আহ্বান জানানো হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে স্বাক্ষর করেছেন সমিতির সভাপতি শেখ ফরহাদ হোসাইন এবং এমআরপি বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক মোহাম্মদ আসিফুজ্জামান। তবে এই নির্দেশ ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে।
তাঁদের প্রশ্ন, এমআরপি অনুযায়ী বিক্রির নির্দেশ কার্যকর হলে ওষুধের দাম নির্ধারণে স্বচ্ছতা কীভাবে নিশ্চিত হবে? আর আগে তুলনামূলক কম দামে পাওয়া ওষুধের ক্ষেত্রে এখন বেশি টাকা নেওয়া হচ্ছে কেন?
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে ওষুধ কিনতে গিয়ে দামের পার্থক্যের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন খালিশপুরের এক রোগীর ভাই মো. আফরোজ। তিনি বলেন, যে ট্রাকশন ইনজেকশন আগে ১১০ থেকে ১২০ টাকায় কিনতাম, তা আজ ১৯০ টাকায় কিনতে হয়েছে। গ্যাসের ইনজেকশন প্যানটোনিক্স আগে ৬০ টাকায় কিনতাম, এখন ৯০ টাকা দিতে হচ্ছে। এভাবে আমাদের জিম্মি করা হলে আমরা যাব কোথায়? কীভাবে এই জিম্মিদশা থেকে মুক্ত হব? যেখানে তিন দিন আগেও রোগীরা যাচাই-বাছাই করে ওষুধ কিন্তু এবং কম দামে পেত, এখন আর সে সুযোগ নেই, অথচ খুলনার আর কোথাও এরকম নাই।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে প্রায় ৮০ থেকে ৮৫টি ওষুধের দোকান রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। অন্যদিকে, হাসপাতালে প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার রোগী ভর্তি হয়ে চিকিৎসাসেবা নিয়ে থাকেন। তাঁদের সবাইকেই জরুরি প্রয়োজনে হাসপাতালের আশপাশের দোকান থেকে ওষুধ কিনতে হয়। স্থানীয়ভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, হাসপাতালের সামনে ওষুধ বিক্রির পরিমাণ বেশি হওয়ায় বেশির ভাগ দোকান তুলনামূলক কম লাভে, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে পাইকারি দামের কাছাকাছি মূল্যে ওষুধ বিক্রি করত। এতে আর্থিকভাবে অসচ্ছল রোগীরা উপকৃত হতেন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু নতুন নির্দেশের পর সেই সুবিধা না থাকাই, তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, সরকারদলীয় রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে বেশি মুনাফার উদ্দেশ্যে এ নিয়ম চালুর উদ্যোগ নিয়েছে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী।
খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, আমাদের দেশে যার যে দায়িত্ব, তিনি যদি তা যথাযথভাবে পালন না করেন, তাহলে অসাধু চক্রের অপতৎপরতা বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়। মুনাফা অর্জন করতে গিয়ে কোনো ব্যবসায়ী যদি অসহায় রোগীদের জরুরি প্রয়োজনকে পুঁজি করেন, তাহলে তা অত্যন্ত অমানবিক। মানুষ যখন নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করে, তখন সেখানে আইনের কঠোর প্রয়োগ জরুরি। রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা প্রভাবের ঊর্ধ্বে থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় থেকে অনিয়মের সুযোগ পাচ্ছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। ওষুধের বাজারে রোগীদের জিম্মি করে অতিরিক্ত মুনাফা করার কোনো সুযোগ থাকা উচিত নয়। আমরা চাই, ওষুধের মূল্য নিয়ে ওঠা অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত হোক, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হোক এবং সাধারণ মানুষ যেন ন্যায্য মূল্যে ওষুধ পেয়ে চিকিৎসার অধিকার নিশ্চিত করতে পারেন। চিকিৎসা নিতে এসে ওষুধের বাড়তি ব্যয় বহন করা অসহায় রোগীদের জন্য বড় চাপ। অনেকের কাছে চিকিৎসকের ফি, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধের খরচ জোগাড় করাই কঠিন। এমন পরিস্থিতিতে ওষুধের দাম নিয়ে অনিশ্চয়তা তাঁদের দুশ্চিন্তা আরও বাড়িয়ে তুলছে। রোগীদের প্রশ্ন একটাই- চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে এসে ওষুধ কিনতে গিয়ে যদি বাড়তি দামের চাপে পড়তে হয়, তাহলে এই ভোগান্তি থেকে মুক্তি মিলবে কীভাবে?

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button