স্থানীয় সংবাদ

ডুমুরিয়ায় জমি জালিয়াতি, ভুয়া দলিল ও অবৈধ নামজারি সিন্ডিকেট চক্রের হোতা উৎপল সাহা বেপরোয়া

# জমি উদ্ধারের আশ্বাসে অর্থ ও জমি হাতিয়ে নিয়েছেন উৎপল
# মন চায় এখন আত্মহত্যা করে মরে যেতে- ভুক্তভোগী #

এম রুহুল আমিন-: খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার রঘুনাথপুর, দেড়ুলি ও কৃষ্ণনগর এলাকায় জমির দলিল, খতিয়ান, নামজারি এবং আদালতের মামলা ঘিরে একাধিক অনিয়ম ও প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, জমি উদ্ধারের আশ্বাস দিয়ে তাঁদের কাছ থেকে অর্থ ও জমি নেওয়া হয়েছে। কয়েকটি ঘটনায় জাল দলিল তৈরি, রেকর্ড পরিবর্তন এবং আদালতের নাম ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও সামনে এসেছে। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
ডুমুরিয়ায় জমি জালিয়াতির, ভুয়া দলিল ও অবৈধ নামজারি সিন্ডিকেট চক্রের হোতা উৎপল সাহা। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন উৎপল কুমার সাহা এবং তাঁর সঙ্গে নেহার ম-ল, অসিত বিশ্বাস ও বেল্লাল শেখসহ সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি। তবে এসব অভিযোগের বেশ কয়েকটি জাল দলিল ও খতিয়ান নিয়ে প্রমানিত ভূমি অফিসে সুত্রে জানা যায়।
পাওয়ার অব অ্যাটর্নি ও জমির নামজারি নিয়ে প্রশ্ন ঃ ভুক্তভোগী আসলাম ফকির’র দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নকুল চন্দ্র সাহা ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১২ তারিখে এফএম আসলাম উদ্দিনকে একটি অপ্রত্যাহারযোগ্য পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দলিল সম্পাদন করে দেন। দলিল নম্বর ৫৫১০/১২। পরবর্তী সময়ে ১২ অক্টোবর ২০১৫ তারিখে ওই ক্ষমতাপত্রের সূত্রে ৫০ শতক জমির একটি সাফ-কবলা দলিল সম্পাদিত হয়, যার নম্বর ৪৮৩৬/১৫ বলে জানানো হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, পরবর্তীতে জমির ভূমি উন্নয়ন করের দাখিলা কাটতে গিয়ে তাঁরা জানতে পারেন, সংশ্লিষ্ট জমির রেকর্ড পরিতোষ সাহার নামে করা হয়েছে। ২২ আগষ্ট ২০১৭ তারিখে ৫৪২২/১৭ নং দানপত্রের দ্বারা মালিক হয়েছে। কিন্তু দান পত্রে নকুল কুমার সাহার কথিত স্বাক্ষর এবং এফ এম আসলাম ফকিরের ৫৫১০/২০১২ নং আমমোক্তারনামায় নকুলের স্বাক্ষরের মধ্যে ভিন্নতা রয়েছে।যার মূল দলিল ডুমুরিয়া এসিন্যান্ড অফিসে অভিযুক্ত উৎপল সাহার পিতা দেখাতে পারেনি। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ৮৮ শতক জমির নামজারি-সংক্রান্ত একটি মিস কেসের নম্বর এমএল ১৪১৭/১৮-১৯ এবং সংশ্লিষ্ট ধারায় ১৪০ ও ১১৭ উল্লেখ রয়েছে।
ভুক্তভোগীদের আরও অভিযোগ, ৫৪২২/১৭ ও ২০৭৮/১৮ নম্বরের দলিলের মাধ্যমে জমির মালিকানা ও নামপত্তন নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে। তাঁদের দাবি, সংশ্লিষ্ট নামজারি নথি তহসিল অফিস ও সহকারী কমিশনারের (ভূমি) কার্যালয়ে খুঁজে পাওয়া যায়নি।
বিদেশে বসবাসের দাবি, মালিকানা যাচাইয়ের প্রশ্ন ঃ অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, আশুতোষ সাহা প্রায় ৩০ বছর আগে বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যান। অন্যদিকে নকুল চন্দ্র সাহা ২০১৩ সালে দেশত্যাগ করে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মধ্যমগ্রামে বসবাস করছেন বলে দাবি করা হয়েছে। তাঁদের বর্তমান অবস্থান, পরিচয়পত্র বা জম্মনিবন্ধন এবং জমি হস্তান্তরের সময়কার আইনগত সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।
জমি উদ্ধারের আশ্বাসে অর্থ ও জমি নেওয়ার অভিযোগ ঃ ডুমুরিয়া উপজেলার রঘুনাথপুর এলাকার তরুণ কান্তি সাহা অভিযোগ করেন, দেড়ুলি এলাকার উৎপল সাহা তাঁর কাছে এসে নিজেকে আদালতের পেশকার পরিচয় দিয়ে জমি উদ্ধারের আশ্বাস দেন। তাঁর দাবি, নিজের জমির কাগজপত্র দেখানোর পর উৎপল সাহা তাঁকে জমি উদ্ধার করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন এবং বিনিময়ে তিন শতক জমি লিখে দিতে বলেন। তরুণ কান্তি সাহার ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি তিন শতক জমি লিখে দেন। চার মাসের মধ্যে জমির কাগজপত্র ঠিক করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও সাড়ে চার বছরেও সমস্যার সমাধান হয়নি। বরং মামলা পরিচালনার খরচসহ বিভিন্ন সময়ে টাকা দিতে হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
প্রতিপক্ষের সঙ্গে যোগসাজশের কারণে মামলা দীর্ঘায়িত হচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, জিডি করার পরও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো প্রতিকার পাননি। তিনি আরও দাবি করেন, তাঁর কাছ থেকে ৪২টি মূল খতিয়ানসহ গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র এবং স্বাক্ষর করা তিনটি ১০০ টাকা মূল্যের নন-জুডিশিয়াল অলিখিত সাদা স্ট্যাম্প প্রতারণা করে নেওয়া হয়েছে। যাহা থানার জিডিতে উল্লেখ করেছেন ভ’ক্তভোগী তরুন কান্তি সাহা।তিনি বলেন,আমি চিন্তায় চিন্তায় অসুস্থ হয়ে পরেছি। মন চায় এখন আত্ম হত্যা করে মরে যেতে।এ ঘটনায় তিনি ৭ জুলাই ২০২৫ তারিখে ডুমুরিয়া থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন, যার নম্বর ৩৩১। ১৬ মাস অতিবাহিত হলেও এখন এসব অভিযোগের বিষয়ে পুলিশ কোন তদন্ত করেনি।ডুমুরিয়া থানার ওসি হাফিজুর রহমান এবিষয়ে জানান,স্বাক্ষী দিতে স্টেশনের বাহিরে আছেন।
পুরোনো দলিল ও খতিয়ান নিয়ে বিরোধ ঃ ভুক্তভোগীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সিএস দাগ নম্বর ১১৮, ২৩৭ ও ২৪৯ এবং খতিয়ান নম্বর ২৮০-সংক্রান্ত জমি নিয়েও বিরোধ রয়েছে। সন্তোষ কুমার সাহার নামে বিএস/বিআরএস রেকর্ড থাকার দাবি করে অভিযোগকারীরা জানান, পুরোনো দলিল ও মালিকানা নিয়ে আদালতে মামলা চলছে। এ ছাড়া ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১০ তারিখের ৭৯০/২০১০ নম্বরের একটি দলিলকে ভুয়া বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট পক্ষ। তাঁদের দাবি, ওই দলিলের মাধ্যমে ৪৮৩ নম্বর দাগ এবং ৬৪ ও ২৬ নম্বর খতিয়ানের অধীন ৫ দশমিক ৭ শতক জমির নামজারি করা হয়েছিল।যার নথিপত্র ভূমি অফিসে প্ওায়া যায়নি। পরে আসলাম ফকির ১৫০ ধারার অধীনে মামলা করে মূল খতিয়ান ফেরত পেয়েছেন বলে অভিযোগকারীদের ভাষ্য। সংশ্লিষ্ট মামলার আদেশ ও ভূমি অফিসের নথি যাচাই করে বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছি।উৎপলের কারনে এলাকার সাধারন মানুষ আতষ্কিত।এ চক্রের কাছে অসহায় মানুষ মামলা করে আদালতে দৌড়িয়ে সর্বোচ্চ খুইয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছে। উৎপল সব আদালতে ভ’মিদস্যু চক্রের প্রধান হিসাবে কাজ করে। অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেছেন, উৎপল সাহার সিন্ডিকেটের সঙ্গে নেহার ম-ল ও অসিত বিশ্বাসের ও ভূমি অফিসের অসৎ কিছু কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে । নেহার ম-ল ও অসিত বিশ্বাসের নামে ডুমুরিয়া থানায় জিডি করা রয়েছে।
আদালতের পরিচয় ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ ঃ ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, উৎপল সাহা বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে নিজেকে আদালতের পেশকার বা প্রভাবশালী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দিয়ে জমি-সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিতেন। তাঁদের দাবি, এভাবে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ ও জমি নেওয়া হয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, উৎপল সাহা ২০১৮ সালে আদালতে অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার পদে চাকরি পান বলে খুলনা জেলা জজের ফুলতলা উপজেলা কোর্টের সেরেস্তাদার অফিস সূত্রে জানা যায়। অভিযোগকারীদের আরও দাবি, দেড়ুলি এলাকায় তাঁর পরিবারের একটি বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে, যার ব্যয় আনুমানিক ৫০ লাখ টাকা। কেবল সম্পদ বৃদ্ধি বা বাড়ি নির্মাণের ভিত্তিতে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত যে টাকার উৎস কোথায়।
প্রশাসনের বক্তব্য ও তদন্তের দাবি : খুলনা জেলা জজ আদালতের নাজির মো. জাকারিয়া শেখ জানান, এ বিষয়ে তাঁর কাছে কোনো অভিযোগ আসেনি। অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।অন্যদিকে উৎপল সাহা তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সঠিক নয়। আমি আমার নিজের পৈতৃক সম্পত্তি নিয়ে লড়ছি।”
ভুক্তভোগীরা সংশ্লিষ্ট দলিল, নামজারি নথি, আদালতের মামলা, জিডি এবং ভূমি অফিসের রেকর্ড পরীক্ষা করে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, জমির মালিকানা ও রেকর্ড নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তিতে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর ভূমিকা জরুরি।এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, উৎপল সাহা চাকরি পাওয়ার পূর্বে তার পরিবার দু’মুঠো ভাত খেতে পারত না। আর সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের সাথে প্রতারণা করে টাকা আত্মসাৎ করে গড়ে তুলেছেন আলিশান বাড়ি।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button