অগ্নিঝরা মার্চ’ ৭১

বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের এক ঐতিহাসিক দিন
এফএনএস: ১৯৭১ সালের ২২ মার্চ বাঙালি জাতির ইতিহাসে একটি অবিস্মরণীয় দিন। এই দিনটি ছিল স্বাধীনতা অর্জনের পথে বাঙালির দৃঢ় প্রত্যয় ও সংগ্রামের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র, বৈঠকের নামে কালক্ষেপণ, এবং বাঙালির ওপর চরম আঘাত হানার নীলনকশাÑসবকিছুই এই দিনে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। অন্যদিকে, বাঙালি জাতি তাদের স্বাধীনতার লক্ষ্যে সশস্ত্র প্রস্তুতি ও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে শুরু করেছিল।
এই দিনে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে বৈঠক অব্যাহত ছিল। কিন্তু এই বৈঠক যে শুধুই কালক্ষেপণের কৌশল ছিল, তা বঙ্গবন্ধু সহজেই বুঝতে পেরেছিলেন। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর আসল উদ্দেশ্য ছিল বাঙালির স্বাধীনতা আন্দোলনকে ধ্বংস করে দেওয়া। ইয়াহিয়া খান ও জুলফিকার আলী ভুট্টোর উপস্থিতিতে ঢাকায় চলা এই বৈঠককে ভুট্টো ‘উৎসাহব্যঞ্জক আলোচনা’ বলে অভিহিত করলেও, বাস্তবে এর পেছনে লুকিয়ে ছিল এক ভয়াবহ পরিকল্পনা।
২২ মার্চের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো, পূর্ব পাকিস্তানের সব দৈনিক পত্রিকার প্রথম পাতায় স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত এই পতাকা শুধু দেশের মানুষকেই নয়, সারাবিশ^কে জানান দিচ্ছিল যে, বাঙালি জাতি তাদের স্বাধীনতা অর্জনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এই পতাকা প্রকাশের মাধ্যমে বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়েরও চেষ্টা চলছিল।
এদিন ঢাকার প্রেসিডেন্ট হাউস থেকে প্রচারিত এক ঘোষণায় ২৫ মার্চ আহূত সংসদ অধিবেশন আবারও অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করা হয়। এ সংবাদে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে স্বাধীনতাকামী পূর্ব পাকিস্তানের কোটি জনতা। ঢাকাসহ সারাদেশে মিছিল, সমাবেশ ও প্রতিরোধ আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বীর বাঙালিরা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। কিন্তু তখনও কেউ জানত না যে, ইয়াহিয়া খানের এই ঘোষণার পেছনে লুকিয়ে আছে এক নারকীয় গণহত্যার নীলনকশা।
পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনার নামে পর্দার আড়ালে পূর্ব পাকিস্তানে সৈন্য ও অস্ত্রশস্ত্র জমা করছিল। তাদের লক্ষ্য ছিল বাঙালির স্বাধীনতা আন্দোলনকে চিরতরে দমন করা। কিন্তু বাঙালিরাও পিছিয়ে থাকেনি। স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ, আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতারা গোপনে গেরিলা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তারা আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ সংগ্রহ করে বাঙালির প্রতিরোধ শক্তিকে শাণিত করছিলেন।
১৯৭১ সালের ২২ মার্চের এই দিনটি বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র, বৈঠকের নামে কালক্ষেপণ, এবং গণহত্যার নীলনকশাÑসবকিছুকে উপেক্ষা করে বাঙালি জাতি তাদের স্বাধীনতার লক্ষ্যে এগিয়ে গিয়েছিল। এই দিনটি ছিল বাঙালির আত্মত্যাগ, সংগ্রাম ও বিজয়ের এক উজ্জ্বল নিদর্শন।



