জাতীয় সংবাদ

বিমসটেক সম্মেলনে সভাপতিত্ব করবে বাংলাদেশ

প্রবাহ রিপোর্ট : আগামী দুই বছরের জন্য থাইল্যান্ডে বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করবে বাংলাদেশ। সে কারণে এবারের বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলন বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র সচিব এম জসীম উদ্দিন। গতকাল মঙ্গলবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ তথ্য জানান। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের চীন ও থাইল্যান্ড সফর সামনে রেখে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র সচিব এম জসীম উদ্দিন জানান, আগামী ৪ এপ্রিল থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে ষষ্ঠ বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এ শীর্ষ সম্মেলনে যোগদানের জন্য প্রধান উপদেষ্টা আগামী ৩ এপ্রিল ব্যাংককে পৌঁছাবেন। পররাষ্ট্র সচিব জানান, আগামী ২ এপ্রিল ব্যংককে অনুষ্ঠেয় বিমসটেক সদস্য রাষ্ট্রসমূহের পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের ২৫তম সভায় আমি অংশ নেবো। এ ছাড়া পররাষ্ট্র উপদেষ্টা আগামী ৩ এপ্রিল ব্যাংককে অনুষ্ঠেয় ২০তম বিমসটেকের মন্ত্রিপর্যায়ের সভায় অংশ নেবেন। প্রধান উপদেষ্টা শীর্ষ সম্মেলন শেষে আগামী ৪ এপ্রিল বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা হবেন। এবারের বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনের আগে আগামী ৩ এপ্রিল প্রধান উপদেষ্টা বিমসটেক ইয়ং জেনারেশন ফোরাম: হোয়ার দ্য ফিউচার মিটস শীর্ষক ফোরামে কি-নোট স্পিকার হিসেবে বক্তব্য দেবেন। আসন্ন বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনে বিমসটেক সদস্য রাষ্ট্রসমূহের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানরা বিমসটেক সহযোগিতার বিভিন্ন দিক নিয়ে মতবিনিময় করবেন এবং বিমসটেক অঞ্চলের জনগণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নসহ এই অঞ্চলকে আর্থ-সামাজিকভাবে আরও উন্নত, টেকসই ও শান্তিপূর্ণ হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়ে দিক-নির্দেশনা দেবেন। বিমসটেকের আওতায় ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিমসটেকমুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল প্রতিষ্ঠা, যোগাযোগ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন, জ্বালানি সহযোগিতা, প্রতিরক্ষা ও মানব নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন, দারিদ্র্য দূরীকরণ, মানবসম্পদ উন্নয়ন, কৃষি, সংস্কৃতি, পর্যটনের বিকাশ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অতিমারি মোকাবিলায় প্রস্তুতি প্রভৃতি বিষয়ে আঞ্চলিক সহযোগিতার অগ্রগতি পর্যালোচনাপূর্বক শীর্ষ সম্মেলনে রাষ্ট্র/সরকার প্রধানরা সর্বসম্মতিক্রমে যৌথ ঘোষণা জারি করবেন। জসীম উদ্দিন বলেন, বিমসটেকের ষষ্ঠ শীর্ষ সম্মেলনে বিমসটেকের সদস্য রাষ্ট্রসমূহের মধ্যকার ‘মেরিটাইম ট্রান্সপোর্ট কো-অপরেশন’ সংক্রান্ত একটি চুক্তি সইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। এ চুক্তি বাণিজ্যিক শিপিং এবং সামুদ্রিক পরিবহন শক্তিশালীকরণের মাধ্যমে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক এবং বাণিজ্যিক সম্পর্কের বাড়াতে সহায়তা করবে বলে আশা করা যাচ্ছে। এটা বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, এবারের ষষ্ঠ বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলন নতুন বাংলাদেশের জন্য বিমসটেকের মধ্য দিয়ে আঞ্চলিক অঙ্গনে নতুন পদচারণা। এবারের সম্মেলন আমাদের জন্য দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার একটি ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশকে উপস্থাপনের সুযোগ এনে দেবে। আমি বিশ্বাস করি, এবারের সম্মেলন বাংলাদেশ এবং অন্যান্য বিমসটেক সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ককে আরও দৃঢ় এবং গভীর করবে এবং আঞ্চলিক শান্তি ও উন্নয়নকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
মুহাম্মদ ইউনূস ও নরেন্দ্র মোদির সম্ভাব্য বৈঠকের বিষয়ে প্রস্তুত: প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের সম্ভাবনার বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা যেকোনো দেশের শীর্ষনেতার সঙ্গে বৈঠককে গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের যে বর্তমান প্রেক্ষাপট, সেই প্রেক্ষাপটের ভিত্তিতে এটিকে আমরা গুরুত্ব দিয়ে দেখছি। আমরা আশা করি, যদি এই বৈঠকটি হয়, তবে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে সৃষ্ট যে স্থবিরতা, সেটি কেটে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। আমাদের দিক থেকে বলতে পারি- আমরা বৈঠকের জন্য প্রস্তুত আছি এবং ভারতের দিক থেকে আমরা ইতিবাচক উত্তরের অপেক্ষায় আছি।
চুক্তি সই: বিমসটেকের শীর্ষ সম্মেলনে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার মেরিটাইম ট্রান্সপোর্ট কোঅপারেশন সংক্রান্ত একটি চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, এ চুক্তি বাণিজ্যিক শিপিং এবং সামুদ্রিক পরিবহন শক্তিশালী করার মাধ্যমে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক এবং বাণিজ্যিক সম্পর্কের বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে বলে আশা করা যাচ্ছে। বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলন নতুন বাংলাদেশের জন্য বিমসটেকের মধ্য দিয়ে আঞ্চলিক অঙ্গনে নতুন পদচারণা। এবারের সম্মেলন আমাদের জন্য দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশকে উপস্থাপনের সুযোগ এনে দেবে বলে তিনি জানান। সচিব বলেন, আমি বিশ্বাস করি, এবারের সম্মেলন বাংলাদেশ এবং অন্যান্য বিমসটেক সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ককে আরও দৃঢ় এবং গভীর করবে এবং আঞ্চলিক শান্তি ও উন্নয়নকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
ইউনূস-শি বৈঠকে তিস্তা প্রকল্প নিয়ে আলোচনার সুযোগ আছে: চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের মধ্যে বৈঠকে তিস্তা প্রকল্প নিয়ে আলোচনার সুযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র সচিব মো. জসীম উদ্দিন। তিনি বলেণ, এছাড়াও স্বাস্থ্য, রোহিঙ্গা, জিডিআই, অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। সংবাদ সম্মেলনে তিস্তা প্রকল্প নিয়ে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, চীনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে যে বৈঠকটি হবে, সেটি শীর্ষ নেতৃত্ব তাদের পছন্দ অনুযায়ী কথা বলবেন। তবে, আমাদের দিক থেকে এবং চীনের দিক থেকে পানি ব্যবস্থাপনার বিষয়ে কথা বলার আগ্রহ আছে। পানি ব্যবস্থাপনার আওতায় তিস্তা প্রকল্প নিয়ে কথা বলার সুযোগ আছে। উল্লেখ্য, চীনের হাইনান প্রদেশে বোয়াও সম্মেলন এবং বেইজিং এ চীনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক করার জন্য আজ বুধবার চীনের উদ্দেশে রওনা দেবেন প্রধান উপদেষ্টা। ২৭ মার্চ বোয়াও সম্মেলনের প্লেনারি সেসনে বক্তব্য রাখবেন তিনি। ২৮ মার্চ চীনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তার বৈঠক হবে। ২৯ মার্চ পিকিং বিশ্ববিদ্যালয় প্রফেসর মুহাম্মদকে বিশেষ সম্মাননা জানাবে। পররাষ্ট্র সচিব বলেন, ‘চীন আমাদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বন্ধু এবং আমরা সেই বন্ধুত্বকে ধারণ করি। চীনের দিক থেকেও একই ধরনের মনোভাব আছে এবং প্রধান উপদেষ্টার প্রথম দ্বিপাক্ষিক সফর হিসেবে চীনকে বেছে নেওয়ার মধ্য দিয়ে একটি বার্তা আমরা দিচ্ছি। তিনি বলেন, এই সফর থেকে আমাদের প্রত্যাশা বহুমাত্রিক। চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার এবং অন্যতম বড় উন্নয়ন সহযোগী। এছাড়া মানুষে মানুষে যোগাযোগ বাড়ছে। আমরা নতুন নতুন ক্ষেত্র আবিষ্কার করছি এবং সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছি বলে তিনি জানান।
চুক্তি ও ঘোষণা: এবারের সফরে বেশ কয়েকটি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হতে পারে। এছাড়া কিছু ঘোষণা আসতে পারে জানিয়ে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, এরমধ্যে রয়েছে পানি সম্পর্ক উন্নয়নে অর্থনৈতিক ও কারিগরি সহায়তা, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়াবিষয়ক সহায়তা, এবং গণমাধ্যম বিষয়ক সহযোগিতা। যেসব বিষযে ঘোষণা আসতে পারে সেগুলো হচ্ছে— অর্থনৈতিক বিনিয়োগ, অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিষয়ক, জানান জসীম উদ্দিন।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে প্রত্যাশা: পররাষ্ট্র সচিব জানান, রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘদিনের। এরমধ্যে সাত বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। বাংলাদেশের দিক থেকে বিভিন্নভাবে চেষ্টা করা হচ্ছে সমস্যার যেন সমাধান হয়। মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে আলোচনায় চীনও আমাদের সহায়তা করেছে জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা এ বৈঠকে যেটি করছি যে, মিয়ানমারের অভ্যন্তরে যে উদ্ভূত পরিস্থিতি— সেটি নিয়ে চীন কী ভাবছে তা আমরা দেখতে পারি। আমাদের চিস্তা তাদেরকে জানাতে পারি।
স্বাস্থ্য খাতে সহযোগিতা: স্বাস্থ্য খাতে সহযোগিতা নিয়ে গত কয়েক মাস ধরে আলোচনা চলছে এবং সহযোগিতা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানান পররাষ্ট্র সচিব। তিনি বলেন, চীনে বাংলাদেশি রোগীদের প্রথম ব্যাচ গিয়েছে। আমি যতটুকু জানতে পেরেছি, তারা চিকিৎসাসেবায় সন্তুষ্ট। এছাড়া বাংলাদেশি রোগীদের জন্য কুনমিংয়ে চারটি হাসপাতাল চিহ্নিত করা হয়েছে। সচিব বলেন, আমাদের প্রত্যাশা, সামনের সময়ে এই সহযোগিতা আরও বাড়বে এবং চীন বাংলাদেশে একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল করবে, যেটি বাংরাদেশ ও চীনের দ্বিাপক্ষিক সম্পর্কের যে সুবর্ণজয়ন্তী, তার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ বিষয় হবে। এ বিষয়টিকে জোর দেওয়ার জন্য আমরা শীর্ষ পর্যায়ে কথা বলবো। এদিকে বাংলাদেশের দিক থেকে সাধারণভাবে চীনের সঙ্গে যে সামরিক সহযোগিতা আছে, সেগুলোর সাধারণ একটি আলোচনা হবে, বলে সাংবাদিকদের জানান পররাষ্ট্র সচিব।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক আব্দুল মোতালেব সরকার, মোহাম্মদ নূরে আলম ও মোহাম্মদ রফিকুল আলম।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button