জাতীয় সংবাদ

জুলাইয়ে উৎপাদনে যাচ্ছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ আগামী জুলাইয়ে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনে যাচ্ছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের (আরএনপিপি) প্রথম ইউনিট। এর আগে আগামী ৭ এপ্রিল বিদ্যুৎকেন্দ্রটির পারমাণবিক চুল্লিতে জ্বালানি ইউরেনিয়াম লোড করা শুরু হবে। তবে জুলাইয়ে উৎপাদন শুরু হবে সীমিত পরিমাণে। পুরো মাত্রায় উৎপাদনে যেতে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। এই জ্বালানি লোডের জন্য রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের কাজ সম্পন্ন করে সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। আগামী ৭ এপ্রিল চুল্লিতে ইউরেনিয়াম রড লোড করা হবে। এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে ৪ থেকে ৫ সপ্তাহ বা প্রায় এক মাস সময় লাগতে পারে। ৭ এপ্রিল চুল্লিতে ইউরেনিয়াম লোডের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তারা উভয়েই অনুষ্ঠানে ভার্চ্যুয়াল মাধ্যমে যুক্ত থাকবেন। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন বাংলানিউজকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব আনোয়ার হোসেন বলেন, আগামী ৭ এপ্রিল রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুল্লিতে জ্বালানি ইউরেনিয়াম লোড করা শুরু হবে। অনুষ্ঠানে ভার্চ্যুয়ালি উপস্থিত থাকবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। এ ছাড়া প্রকল্প সাইটে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম, রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি করপোরেশন রোসাটমের মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক উপস্থিত থাকবেন বলেও তিনি জানান। সচিব বলেন, জ্বালানি লোডের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি চলছে। জ্বালানি লোডের কাজ শেষ হতে ৪ থেকে ৫ সপ্তাহ সময় লাগবে। এর পর ধাপে ধাপে প্রক্রিয়াগুলো শেষ করে আগামী জুলাইয়ে বাণিজ্যিকভাবে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে। পরে পর্যায়ক্রমে সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর নাগাদ পুরো মাত্রায় উৎপাদনে যাবে কেন্দ্রটি। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মূল স্থাপনা হলো রিয়্যাক্টর প্রেসার ভেসেল বা চুল্লিপাত্র। এই রিয়্যাক্টরে পারমাণবিক বিদ্যুতের জ্বালানি ইউরেনিয়াম লোড বা সংযোজন করা হবে। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয় ইউরেনিয়াম-২৩৫ নামের মৌলিক পদার্থ। খনি থেকে সংগ্রহ করে ছোট আকৃতিতে এটি একত্রিত করা হয়, যার নাম পেলেট। এরকম কয়েকশ পেলেট একত্রিত করে একটি ধাতব টিউবে ঢোকানো হয়, যাকে বলা হয় ইউরেনিয়াম রড। অনেকগুলো ফুয়েল রড একত্রিত করে তৈরি করা হয় ফুয়েল অ্যাসেম্বলি। একেকটি অ্যাসেম্বলি লম্বায় সাড়ে তিন থেকে সাড়ে চার মিটার হয়। রূপপুরের রিয়্যাক্টর-১-এ ১৬৩টি অ্যাসেম্বলি লোড করা হবে। এসব ইউরেনিয়াম রড রাশিয়া থেকে এনে প্রকল্প এলাকায় সংরক্ষণ করা হয়েছে। এ প্রকল্পের জ্বালানি রাশিয়া সরবরাহ করবে। সূত্র থেকে আরও জানা যায়, ইউরেনিয়াম লোড করার পর চুল্লিতে ফিশন বিক্রিয়া চালু করা হবে। পারমাণবিক চুল্লিতে ইউরেনিয়াম-২৩৫ লোড করতে সাধারণত প্রায় ৩০ দিন সময় লাগে। এরপর ইউরেনিয়াম রডকে সঠিক অবস্থানে স্থাপন করে নিউট্রন হিটের মাধ্যমে ফিশন বিক্রিয়া শুরু করা হয়। সেটিকে নিয়ন্ত্রণ করে চেইন রিয়্যাকশনে নেওয়া হয়। এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে কমপক্ষে ৩৪ দিন সময় প্রয়োজন। প্রথমে এক শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়, যা ধীরে ধীরে দুই শতাংশ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত নেওয়া হয়। এরপরই বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়। পুরো প্রক্রিয়াটি শেষ করতে প্রায় ৪০ দিন সময় লাগে। এ সময় প্রতিটি ধাপে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলতে থাকে। এদিকে রূপপুর প্রকল্পের নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার পর কেন্দ্রটি পরিচালনা করবে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি অব বাংলাদেশ (এনপিসিবিএল)। চুক্তি অনুযায়ী, এর জনবল কাঠামো এবং প্রশিক্ষণ দিয়েছে রাশিয়া। শুরুতে রাশিয়ার অপারেটরদের নেতৃত্বে বিদ্যুৎ চুল্লিটি চালু করা হবে, যেখানে সহযোগী হিসেবে থাকবেন বাংলাদেশিরা। তিন বছরের মধ্যে ধীরে ধীরে নেতৃত্বে আসবেন তারা। পাঁচ থেকে সাত বছরে পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি পরিচালনা করবে বাংলাদেশিরাই। রাশিয়ার অর্থনৈতিক ও কারিগরি সহায়তায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণ করা হচ্ছে। রাশিয়ান ফেডারেশনের সঙ্গে একটি সাধারণ চুক্তির মাধ্যমে এ কাজ চলছে। এর আগে ২০১৩ সালে সমীক্ষা চুক্তি এবং ২০১৫ সালে নির্মাণ চুক্তি হয়। এই চুক্তি অনুযায়ী প্রকল্পে অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে রাশিয়া। মূল প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ১২.৬ বিলিয়ন ডলার বা এক লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা। এ প্রকল্পে দুটি ইউনিট রয়েছে। প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদন ক্ষমতা ১,২০০ মেগাওয়াট। সে অনুযায়ী এ প্রকল্প থেকে মোট ২,৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। প্রথম ইউনিটের নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে এবং সেটিতে উৎপাদন প্রক্রিয়া শুরু হতে যাচ্ছে। দ্বিতীয় ইউনিটের নির্মাণ এখনও চলছে। আগামী বছরের শেষ নাগাদ এর নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হতে পারে। প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, পুরো প্রকল্পের কাজ শেষ হতে ২০২৮ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button