জাতীয় সংবাদ

স্কুলে রামিসার শূন্য আসনে ফুলের তোড়া রেখে ক্লাস করলো সহপাঠীরা

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ রাজধানীর মিরপুরের পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির কক্ষ। সামনের বেঞ্চে প্রতিদিন যে শিশুটি হাসিমুখে বসতো, আজ সেখানে নেই কেউ। তার আসনে রাখা রঙিন ফুলের তোড়া। সহপাঠীদের চোখে কান্না, শিক্ষকদের কণ্ঠ ভারী। আর কখনো স্কুলে ফেরা হবে না দ্বিতীয় শ্রেণির মেধাবী শিক্ষার্থী রামিসা আক্তারের। গত ১৯ মে সকালে রাজধানীর মিল্লাত ক্যাম্প এলাকায় ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় রামিসাকে। পরে লাশ বিকৃত করে গুমের চেষ্টা করা হয়। ছোট্ট রামিসাকে হারিয়ে তার পরিবার যেমন শোকে মুহ্যমান, তেমনি কাঁদছে সহপাঠী-সঙ্গীরা। প্লে গ্রুপ থেকে এই স্কুলে পড়াশোনা করছিল রামিসা। স্কুলের ‘ফাস্ট গার্ল’ হিসেবে পরিচিত ছিল সবার কাছে। বৃহস্পতিবার (২১ মে) দুপুরে স্কুল শিক্ষিকার অনুমতি নিয়ে রামিসার শ্রেণিকক্ষে গিয়ে দেখা যায়, তার খালি বেঞ্চটি ফুল দিয়ে সাজিয়ে রেখেছে সহপাঠীরা। পুরো ক্লাসজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। রামিসার পাশের বেঞ্চে বসত তার সহপাঠী আয়শা হুমাইরা। কান্নাজড়িত কণ্ঠে সে বলে, ‘আমরা একসঙ্গে খেলতাম। রামিসা আমাকে খেতে দিত, আমিও ওকে দিতাম। আমি পড়া ভুলে গেলে ও মনে করিয়ে দিত।’ সে আরও বলে, ‘রামিসা অনেক ভালো স্টুডেন্ট ছিল। আমি হোমওয়ার্ক শেষ করতে না পারলে ও আমাকে সাহায্য করত।’ আরেক সহপাঠী রাইসা বলে, ‘রামিসা টিফিন আনলে আমার সঙ্গে ভাগ করে খেত। ক্লাসে পড়া না বুঝলে আমাকে শিখিয়ে দিত। ও ছিল ক্লাসের ফাস্ট গার্ল।’ বাংলা বিষয়ের শিক্ষিকা মালিহা ইসলাম বলেন, ‘রামিসা খুব মেধাবী ও চঞ্চল ছিল। ওর রোল নম্বর ছিল ১। ক্লাসে দেখা হলেই বলত, মিস, আপনাকে সুন্দর লাগছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ও প্রায়ই বলত, মিস, পড়াটা আমাকে বুঝিয়ে দেন। সামনের বেঞ্চে বসত বলে ওর সঙ্গে বেশি কথা হতো। এমন নিষ্ঠুর ঘটনার শিকার হবে, এটা কখনো ভাবিনি।’ ঘটনার পর রামিসার বাসায় গিয়ে নির্যাতনের ভয়াবহতা দেখেছেন বলেও জানান তিনি। হত্যাকারীর দ্রুত বিচার দাবি করে শিক্ষিকা বলেন, ‘যেহেতু আসামি জবানবন্দি দিয়েছে, তাই দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা হোক।’ কিছুদিন আগেই স্কুলে প্রথম সাময়িক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। সেই পরীক্ষায় বাংলা বিষয়ে ৯০, ইংরেজিতে ৯৩, গণিতে ৯৫.৫, ধর্মে ৯৫ এবং ড্রইংয়ে ৯৬ নম্বর পেয়েছিল রামিসা। স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. সাইফুল ইসলাম রামিসার পরীক্ষার খাতা দেখিয়ে বলেন, ‘ড্রইং পরীক্ষায় কাবা শরিফ এঁকে বাবাকে দেখিয়ে বলেছিল- বাবা, আমাকে কিন্তু এখানে নিয়ে যাবে। উত্তরে বাবা বলেছিলেন, সুযোগ হলে একদিন নিয়ে যাবেন ‘ এদিকে রামিসার হত্যার বিচার দাবিতে তার বাসার সামনে জড়ো হয়েছেন শিক্ষক, সহপাঠী ও স্থানীয় বাসিন্দারা। পুলিশ জানায়, গত মঙ্গলবার (১৯ মে) সকালে মিল্লাত ক্যাম্পসংলগ্ন একটি পাঁচতলা ভবনের তৃতীয় তলায় নিজ বাসার পাশের ফ্ল্যাট থেকে রামিসার লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় প্রতিবেশী সোহেল রানা (৩০) ও তার স্ত্রী স্বপ্নাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, শিশুটিকে প্রথমে যৌন নির্যাতনের পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। পরে লাশ গুম ও আলামত নষ্টের উদ্দেশে শরীরের বিভিন্ন অংশ বিচ্ছিন্ন করা হয়। ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন নজরুল ইসলাম জানান, অভিযুক্ত দম্পতি মাত্র দুই মাস আগে ওই ভবনের উল্টো পাশের ফ্ল্যাটে ভাড়া ওঠেন। নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ হয়ে পড়ার আশঙ্কায় রামিসাকে হত্যা করা হয়। ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সামনে আক্ষেপ করে রামিসার বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা বলেন, ‘আপনারা বিচার করতে পারবেন? পারবেন না। বড়জোর ১৫ দিন আলোচনা হবে, তারপর আরেকটা ঘটনা এলে সবাই ভুলে যাবে।’ তিনি জানান, ১৭ বছর ধরে ওই ভবনে থাকলেও প্রতিবেশীদের সঙ্গে খুব বেশি মেলামেশা ছিল না তাদের। স্থানীয় বাসিন্দা সিয়াম বলেন, সোহেল রানা ও তার স্ত্রী পাশের বিল্ডিংয়ের তৃতীয় তলায় সাবলেটে থাকতেন। যেদিন ঘটনা ঘটে, সেদিন সকালে বাসা থেকে চিৎকারের শব্দ শুনেছি। তার দাবি, ঘটনার পর সোহেল জানালার গ্রিল কেটে পালিয়েছেন। তার স্ত্রী বাসায় ছিলেন, তাই ধারণা করা হচ্ছে, তিনিও পালাতে সহায়তা করেছেন। যে দোকানে রামিসার বাবা প্রতিদিন চা খেতে যেতেন, সেই দোকানের মালিক আসগর আলি বলেন, হান্নান ভাই মাঝে মাঝে রামিসাকে নিয়ে আসতেন। চিপস আর চকলেট খেতে খেতে দোকানের সামনে নাচানাচি করত মেয়েটা। বুধবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদের আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন প্রধান আসামি সোহেল রানা। জবানবন্দিতে তিনি রামিসাকে ধর্ষণের পর হত্যা এবং স্ত্রী স্বপ্নার সহায়তায় লাশ বিকৃত করার কথা স্বীকার করেন। পরে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button