বিশ্ববাজারে ৩ কারণে বেড়েছে স্বর্ণের দাম : ইতিহাস বলছে সামনে বড় পতন ঘটবে

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম গত জানুয়ারিতে প্রতি আউন্স ৫,৫০০ ডলারের রেকর্ড উচ্চতা ছোঁয়ার পর আর সামনে এগোতে পারেনি। এই পরিস্থিতিতে স্বর্ণে বিনিয়োগকারীদের কি হতাশ হওয়া উচিত, নাকি দামের পতন আরও মারাত্মক না হওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করা উচিতÑতা নিয়ে এখন বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এ বিষয়ে লিখেছেন রয়টার্সের এশিয়া কমোডিটিজ অ্যান্ড এনার্জি কলামিস্ট ক্লাইড রাসেল- বিগত দুই দশকের মূল্যের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বড় ধরনের উল্লম্ফনের পর স্বর্ণের বাজারে সাধারণত বড় পতন আসে, যদিও অর্জিত লাভের সিংহভাগই পরে এক জায়গায় এসে স্থিতিশীল হয়। যেমনÑ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত স্বর্ণ রেকর্ড ২৪৫ শতাংশ লাভ করেছিল। এর আগের ধারাগুলো দেখলেও একই চিত্র পাওয়া যায়। ২০০৮ সালের অক্টোবরে প্রতি আউন্স ৬৯৭.৪৫ ডলারের সর্বনিম্ন স্তর থেকে ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে তৎকালীন রেকর্ড ১,৮৮৪.৪০ ডলারে পৌঁছায় স্বর্ণ, যা ছিল ১৭০ শতাংশ বৃদ্ধি। এরপর সেখান থেকে ৩৭ শতাংশ পতন ঘটে ২০১৮ সালের আগস্টে দাম ১,১৯১.৩৫ ডলারে নেমে আসে। আবার সেই স্তর থেকে আউন্সপ্রতি ২০,৭২.৪৯ ডলারের চূড়ায় পৌঁছাতে স্বর্ণ ৭৪ শতাংশ লাফ দেয় (আগস্ট ২০২০), যার পর ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে ২২ শতাংশ কমে দাম দাঁড়ায় ১,৬২০.২০ ডলারে। এখানে লক্ষণীয় যে, দামের বৃদ্ধি যত বড় হয়, পরবর্তী পতনও ততটাই বড় হয়ে থাকে। আরেকটি বিষয় হলো, দামের এই পতন বা সংশোধনের চেয়ে দাম বাড়ার ঘটনাগুলো তুলনামূলক কম সময়ের মধ্যে ঘটে থাকে। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরের সর্বনিম্ন স্তর থেকে স্বর্ণের দাম রকেটের গতিতে ছুটতে শুরু করে এবং চলতি বছরের ২৯ জানুয়ারি ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রতি আউন্স ৫,৫৯৪.৮২ ডলারের সর্বকালীন রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছায়। তবে সেই রেকর্ড গড়ার পর থেকে দাম ২০ শতাংশ নরম বা হ্রাস পেয়ে গত বৃহস্পতিবার আউন্সপ্রতি ৪,৪৭৩.৮৯ ডলারে এসে ঠেকেছে। অতীতের এই চেনা উত্থান-পতনের ধারা বিবেচনা করলে ধারণা করা যায় যে, স্বর্ণের দীর্ঘমেয়াদি ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা আবার শুরু হওয়ার আগে আগামী মাসগুলোতেÑএমনকি বছরগুলোতেওÑদামের আরও বড় পতন দেখার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এই হিসাবটি তখনই মিলবে, যখন ধরে নেওয়া হবে যে অতীতে স্বর্ণের বাজারকে চালিত করা উপাদানগুলো আজও একইভাবে বিদ্যমান। অবশ্য আর্থিক বাজারে ‘এবার পরিস্থিতি ভিন্ন’ বলার মধ্যে সব সময়ই একধরনের ঝুঁকি থাকে এবং এমন ভাবনা ভুল প্রমাণিত হওয়ার ভুরি ভুরি উদাহরণ রয়েছে। তা সত্ত্বেও ক্লাইড রাসেলের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, স্বর্ণের এবারের ঐতিহাসিক রেকর্ড মূলত বেশ কয়েকটি তেজি উপাদানের যৌথ প্রভাবে অর্জিত হয়েছিল এবং এটি বেশ অস্বাভাবিক ছিল কারণ সব কটি উপাদান একই সময়ে একই দিকে কাজ করছিল। এখানে মূলত তিনটি প্রধান কারণ দৃশ্যমান ছিলÑপ্রথমত, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ কেনার রেকর্ড বৃদ্ধি; দ্বিতীয়ত, শীর্ষ দুই ক্রেতা দেশ চীন ও ভারতের খুচরা বাজারে শক্তিশালী চাহিদা; এবং তৃতীয়ত, ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা নিয়ে বিশ্বজুড়ে তৈরি হওয়া একধরনের আতঙ্ক । এই আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও প্রতিকূল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি। বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে পুনরায় ফিরে আসার পর বিনিয়োগকারীদের মনে এই ভয় দানা বেঁধেছে যে, তার নীতিগুলো বৈশ্বিক রিজার্ভ কারেন্সি হিসেবে মার্কিন ডলারের অবস্থানকে দুর্বল করতে পারে এবং এর হাত ধরে মার্কিন অর্থনৈতিক আধিপত্যের পতন ঘটতে পারে। তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ কেনার ধুম যেমন কমেছে, তেমনি চীন ও ভারতের বাজারেও সাধারণ ক্রেতাদের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের সর্বশেষ প্রান্তিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ২৪৩.৭ মেট্রিক টন স্বর্ণ কিনেছে, যা ২০২৫ সালের একই প্রান্তিকের চেয়ে মাত্র ৩ শতাংশ বেশি। তবে ২০২৫ সালের শুরু থেকেই ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ কেনা প্রতি প্রান্তিকে ২০০ টনের আশেপাশে থমকে রয়েছে, যা ২০২২ সালের মাঝামাঝি থেকে ২০২৪ সালের শেষদিকের তুলনায় অনেক কম। সেই সময়ে টানা পাঁচ প্রান্তিকে স্বর্ণ কেনার পরিমাণ ছিল ৩০০ টনেরও বেশি এবং কেবল একবার তা ২০০ টনের নিচে নেমেছিল। অন্যদিকে, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে চীনে গহনার চাহিদা ছিল ৮৫.২ টন, যা ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় ৩১ শতাংশ কম। ভারতের ক্ষেত্রে এই চাহিদা ১৯ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৬৬.১ টনে। কাউন্সিলের তথ্যমতে, বিশ্বজুড়ে গহনার সার্বিক চাহিদা প্রথম প্রান্তিকে ২৫ শতাংশ কমে ২৬০.২ টনে নেমে এসেছে। স্বর্ণের অতিরিক্ত দামই মূলত সাধারণ ক্রেতাদের চাহিদায় ব্রেক কষেছে। এর পাশাপাশি ভারত সরকার স্বর্ণ আমদানি কমাতে এবং লেনদেনের ভারসাম্যের ওপর চাপ কমাতে স্বর্ণ আমদানির ওপর কর বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে গোল্ড ইটিএফ (এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড ফান্ড)-এ বিনিয়োগের প্রবাহও কমেছে; বছরের প্রথম প্রান্তিকে ইটিএফ-এ ৬২ টন স্বর্ণ এসেছে, যা ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকের চেয়ে ৭৩ শতাংশ কম। সার্বিকভাবে, ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকে যেখানে স্বর্ণের মোট চাহিদা ছিল ১,৩১৫.৬ টন, সেখানে ২০২৬ সালের একই সময়ে তা ৯ শতাংশ কমে ১,১৯৫.৯ টনে দাঁড়িয়েছে। এই ব্যাপক চাহিদা হ্রাসের প্রেক্ষাপটে গত জানুয়ারির রেকর্ড উচ্চতার পর থেকে স্বর্ণের দামের বর্তমান পতনকে তুলনামূলকভাবে বেশ ‘নমনীয়’ এবং ভালো পারফরম্যান্স বলেই মনে করা হচ্ছে। তবে স্বর্ণে বিনিয়োগকারীদের জন্য এখন আসল সমস্যা হলো, বাজারটি এখন আর তার চেনা ও প্রথাগত উপাদানগুলোর ওপর ভিত্তি করে চলছে না, বরং এটি এখন মূলত মার্কিন মুদ্রানীতির পূর্বাভাসের ওপর ভর করে ওঠানামা করছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের সঙ্গে স্বর্ণের বিপরীতমুখী সম্পর্ক এর অন্যতম বড় উদাহরণ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাতের কারণে যখনই অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ে, তখনই স্বর্ণের দাম কমে যায়। বিপরীতভাবে, যখন একটি শান্তি চুক্তি আসন্নÑএমন আশায় তেলের দাম কমে, তখন স্বর্ণের দাম কিছুটা ঘুরে দাঁড়ায়। এর মূল কারণ, তেলের দামের ওপর এখন মার্কিন সুদের হারের পূর্বাভাস নির্ভর করছে। তেলের দাম বাড়লে সুদের হার আরও বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয় এবং সুদহার কমার আশা শেষ হয়ে যায়। অন্যদিকে তেলের দাম কমলে সুদের হার কমার আশা জাগে, আর কম সুদের হার সব সময়ই স্বর্ণের মতো অনুত্পাদনশীল বা সুদবিহীন সম্পদের দামকে চাঙ্গা করে। পরিশেষে বলা যায়, অন্য সব আর্থিক সম্পদের মতোই স্বর্ণের বাজারও এখন পুরোপুরি ইরান যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি এবং ভূ-রাজনীতির কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে।



