ইয়ামিন হত্যা : ১৯ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নিলেন ট্রাইব্যুনাল

এপিসিতে গুলি করে ওপর থেকে ফেলে দেওয়া হয়
প্রবাহ রিপোর্ট : জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে সাভারে মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (এমআইএসটি) শিক্ষার্থী আসহাবুল ইয়ামিনকে গুলি করে এপিসি থেকে ফেলে হত্যার ঘটনায় সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলামসহ ১৯ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
রোববার (২৬ জুলাই) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ প্রসিকিউশনের দেওয়া এই অভিযোগ আমলে নেয়। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন— বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
শুনানি শেষে এই মামলার পলাতক ১৩ আসামির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন ট্রাইব্যুনাল।
একইসঙ্গে অন্য মামলায় গ্রেফতার ছয়জনকে এ মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আগামী ২৫ অগাস্ট ট্রাইব্যুনালে হাজির করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম। পরে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের কাছে মামলার বিস্তারিত তুলে ধরেন।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, আমরা ১৯ জন আসামির বিরুদ্ধে ফরমাল চার্জ (আনুষ্ঠানিক অভিযোগ) দিয়েছি। ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি প্রাথমিক অভিযোগ পাওয়ার পর আমার কাছে রিপোর্ট দাখিল করে এবং সেই অনুযায়ী আমি নিজে বাদী হয়ে আজ ফরমাল চার্জ দাখিল করলাম।
আন্দোলন চলাকালে ইয়ামিন হত্যার সেই মর্মান্তিক দৃশ্যের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনের সময় অত্যন্ত হৃদয়বিদারক যে ঘটনাটি ঘটেছিল— আসহাবুল ইয়ামিন, আপনারা সকলেই তার নাম জানেন। যাকে একটা এপিসিতে গুলি করে ওপর থেকে ফেলে দেওয়া হয়েছিল এবং টেনেহিঁচড়ে রাস্তার ওই পাড়ে ফেলে দেওয়া হয়। পরে লোকজনের সহায়তায় তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে সে মৃত্যুবরণ করে।
ওই ঘটনা সারা পৃথিবীর বিবেককে নাড়া দিয়েছিল মন্তব্য করে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, তার পরিপ্রেক্ষিতে সারাদেশের মানুষ তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমে পড়ে এবং দলমত নির্বিশেষে ছাত্র-জনতার সঙ্গে তারা সকলেই শরিক হয়েছিলেন।
আদালতের পরিবেশের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ট্রাইব্যুনাল এই ভিডিও ফুটেজটি দেখেছেন এবং অত্যন্ত আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছেন। তারা আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নিয়েছেন। আমাদের আবেদন অনুযায়ী যারা গ্রেফতার আছে, তাদেরকে এই মামলায় ‘শ্যোন অ্যারেস্ট’ করেছেন এবং পলাতকদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা দিয়েছেন। আগামী ২৫ অগাস্ট প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য করা হয়েছে।
আসামি যারা : এই মামলায় ১৯ আসামির মধ্যে অন্য মামলায় গ্রেফতার রয়েছেন ছয়জন; বাকি ১৩ জন পলাতক।
আসামিদের মধ্যে রয়েছেন— ঢাকা-১৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলাম, ঢাকা জেলার সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. আব্দুল্লাহিল কাফী, ঢাকা রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি সৈয়দ নুরুল ইসলাম, সাবেক পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান রিপন, সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাভার সার্কেল) মো. শাহিদুল ইসলাম, সাভার থানার সাবেক ওসি শাহজামান ও আশুলিয়া থানার সাবেক ওসি এ এফ এম সায়েদ। এছাড়া সাভার উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান মঞ্জুরুল আলম রাজিব, মো. আতিকুর রহমান, ফখরুল আলম সমর, মেহেদী হাসান তুষার, রাজু আহম্মেদ, মো. ফরিদ, জামান খান, মিজানুর রহমান জিএস মিজান ও শরীফ আশরাফুল আলম বাবুলকেও আসামি করা হয়েছে।
যেভাবে হত্যা করা হয় ইয়ামিনকে : নিহত আসহাবুল ইয়ামিন মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (এমআইএসটি) কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।
মামলার বিবরণে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ডে শান্তিপূর্ণ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হামলা চালায় পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। দুপুর দেড়টার দিকে ইয়ামিনকে ধরে পুলিশের সাঁজোয়া যানের (এপিসি) কাছে নিয়ে বুকের বাঁ পাশে গুলি করা হয়। এতে তার বুকে অসংখ্য স্প্লিন্টার বিদ্ধ হয়।
একপর্যায়ে গুলিবিদ্ধ ইয়ামিনকে টেনে সাঁজোয়া যানের ওপরে ফেলে রেখে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতাকে ভীতি প্রদর্শনের জন্য গাড়িটি এপাশ থেকে ওপাশ প্রদক্ষিণ করতে থাকে। প্রায় মৃত অবস্থায় তাকে রাস্তায় ফেলে দেওয়ার পর সাঁজোয়া যানের ভেতর থেকে এক পুলিশ সদস্যকে বের করে তার পায়ে পুনরায় গুলির নির্দেশ দেওয়া হয়।
ওই পুলিশ সদস্য ইয়ামিনকে মৃত ভেবে পায়ে গুলি না করে টেনে সড়ক বিভাজকের পাশে ফেলে দেন। তখনও ইয়ামিন শ্বাস নিচ্ছিলেন। পরে স্থানীয়রা উদ্ধার করে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।



