বাজেটে যেসব পণ্যের দাম কমতে পারে

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা হতে যাচ্ছে বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকেলে। বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। বাজেটের অর্থ সংগ্রহে সরকারকে আয় করতে হবে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। তাই আয় বৃদ্ধি করতে যেমন শুল্ক-কর বৃদ্ধি করে নতুন নতুন খাত করজালের আওতায় আনতে হয়, তেমন জনকল্যাণে অনেক খাতে শুল্ক-করে ছাড় দিতে হয়। জনস্বাস্থ্য, কৃষি, তথ্যপ্রযুক্তি, পরিবেশবান্ধব পরিবহন, শিল্পায়ন এবং ডিজিটাল অর্থনীতিকে উৎসাহ দিতে শতাধিক পণ্য ও সেবায় কর-শুল্ক কমানো বা প্রত্যাহারের প্রস্তাব রাখা হয়েছে প্রস্তাবিত বাজেটে। যার প্রভাবে অনেক পণ্যের উৎপাদন ব্যয় কমবে, কিছু পণ্যের বাজারদরও কমতে পারে। বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী, তথ্যপ্রযুক্তি পণ্য, চিকিৎসাসামগ্রী, কৃষি উপকরণ, বৈদ্যুতিক যানবাহন, খেজুর, মসলা এবং বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামালের ক্ষেত্রে সরাসরি প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। চাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় ৬০ পণ্য। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং লাগামহীন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে একটি বড় ও জনমুখী পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। চাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় ও মৌলিক কৃষিজাত ৬০টি পণ্যের ওপর উৎসে কর উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস করার প্রস্তাব করা হয়েছে আসন্ন বাজেটে। সাধারণ মানুষের জীবনে স্বস্তি ফেরাতেই গণতান্ত্রিক সরকারের ওই বিশেষ উদ্যোগ। আগে বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় ও কৃষিপণ্যের ওপর উৎসে করের হার ছিল পণ্যভেদে ৫ শতাংশ, ২ শতাংশ কিংবা ১ শতাংশ। নতুন প্রস্তাবে এই সব ধরনের করের হার এক ধাক্কায় কমিয়ে মাত্র ০.৫ শতাংশ নির্ধারণ করার কথা বলা হয়েছে। কমতে পারে খেজুরের দাম। পবিত্র রমজানসহ সারা বছর ভোক্তাদের জন্য স্বস্তি দিতে খেজুর আমদানিতে বিদ্যমান রেগুলেটরি শুল্ক ৫ শতাংশ সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে আমদানিকারকদের খরচ কমবে এবং বাজারে খেজুরের দাম কিছুটা কমতে পারে। সব ধরনের মসলা ঃ সব ধরনের মসলা আমদানিতেও ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক প্রত্যাহারের প্রস্তাব রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে। এতে দারুচিনি, এলাচ, লবঙ্গ, গোলমরিচসহ আমদানিনির্ভর বিভিন্ন মসলার বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। শিশুখাদ্য ঃ শিশুখাদ্য উৎপাদনের কাঁচামালের আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে। এতে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত শিশুখাদ্যের উৎপাদন ব্যয় কমতে পারে। ফলে দেশের বাজারে শিশুখাদ্যের দাম হ্রাস পেয়ে সাধারণ মানুষের নিকট আরও সুলভ ও সহজলভ্য হবে। সার ঃ সারের ব্যবসায়ী পর্যায়ে ৭.৫ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। একইসঙ্গে জিংক সালফেট সার উৎপাদনের কাঁচামাল জিংক অ্যাশ আমদানিতে শুল্ক শূন্য শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে। কীটনাশক ঃ কীটনাশক উৎপাদনের কাঁচামাল আমদানিতে ভ্যাট সম্পূর্ণ প্রত্যাহার এবং আমদানি করা কীটনাশকের ওপর ৭.৫ শতাংশ অগ্রিম কর মওকুফের প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে কৃষকদের উৎপাদন খরচ কমতে পারে। পোল্ট্রি, ডেইরি ও মৎস্য খাদ্য ঃ পোল্ট্রি, ডেইরি ও মাছের খাদ্য উৎপাদনের তিনটি কাঁচামালকে শূন্য শতাংশ রেয়াতের আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে পশু ও মাছের খাদ্যের উৎপাদন ব্যয় কমতে পারে। পোল্ট্রি যন্ত্রপাতি ঃ পোল্ট্রি ও ডেইরি খাতের যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্ক শূন্য শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ খামারিরা কম দামে পেতে পারে। স্বাস্থ্য খাত ঃ কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টার। দেশের বিপুল সংখ্যক কিডনি রোগে আক্রান্ত মানুষের জীবন বাঁচাতে এবং ডায়ালাইসিস প্রক্রিয়া সচল রাখতে ডায়ালাইসিস ফিল্টার একটি সংবেদনশীল ও অপরিহার্য চিকিৎসাসামগ্রী। কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টারের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট এবং ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর প্রত্যাহারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সরকারের হিসাব অনুযায়ী, এতে প্রতিবার ডায়ালাইসিসে প্রায় ৮০০ টাকা পর্যন্ত খরচ কমতে পারে বলে জানা গেছে। ব্লাড টিউবিং সেট ঃ হেমোডায়ালাইসিসে ব্যবহৃত ব্লাড টিউবিং সেট আমদানিতে ৭.৫ শতাংশ অগ্রিম কর প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। হার্টের রিং ঃ হার্টের রিং বা স্টেন্ট সরবরাহের ওপর ১০ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে প্রতিটি স্টেন্টের দাম প্রায় ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত কমতে পারে। চোখের ইন্ট্রাওকুলার লেন্স ঃ ইন্ট্রাওকুলার লেন্সের ওপর ভ্যাট প্রত্যাহার করা হলে প্রতিটি লেন্সের দাম প্রায় ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত কমতে পারে। মৃতদেহ সংরক্ষণের খরচ ঃ মৃতদেহ সংরক্ষণে ব্যবহৃত মর্চুয়ারি আমদানির শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে। ক্যান্সারের ওষুধ ঃ ক্যান্সারবিরোধী ওষুধ উৎপাদনের নতুন ৯টি কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ও ভ্যাট শূন্য শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ওষুধ ঃ ওষুধের কাঁচামাল এপিআই তৈরির ৫১টি নতুন উপকরণের আমদানি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ফলে বাজারে ওষুধের দামে কমবে। ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল ঃ আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি ওষুধের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে বিদ্যমান রেয়াতি সুবিধা সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনে নতুন করে আরও ১৭টি মৌলিক কাঁচামাল অন্তর্ভুক্ত করে আমদানি শুল্ক শূন্য শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি খাত ঃ ল্যাপটপ, ডেস্কটপ কম্পিউটার ও প্রিন্টার। উন্নত বাংলাদেশ এবং আইটি খাতে ব্যাপক কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্যে ল্যাপটপ, ডেস্কটপ কম্পিউটার, সার্ভার, কম্পিউটার প্রিন্টার ও কম্পিউটার মনিটর আমদানির ক্ষেত্রে সমুদয় আমদানি শুল্ক, রেগুলেটরি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহার করার প্রস্তাব করা হয়েছে। কম্পিউটারের এসএসডি ঃ এসএসডি আমদানির ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক ব্যতীত সমুদয় রেগুলেটরি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহার করার প্রস্তাব করা হয়েছে। সার্ভার ঃ সার্ভার আমদানিতে শুল্ক-কর অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে। পস মেশিন ঃ পয়েন্ট অব সেলস মেশিনের আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশ এবং অগ্রিম কর শূন্য শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ফলে বাজারে ইতিবাচক প্রভাব আশা করা যায়। পরিবহন খাত ঃ ইলেকট্রিক গাড়ি ঃ ২৫ হাজার ডলার পর্যন্ত মূল্যের ইলেকট্রিক গাড়ির করভার ৯৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬৪ শতাংশ এবং ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত গাড়ির করভার ৮০ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে। এতে ইভি গাড়ির দাম কমতে পারে। প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ি ঃ ১৮০০ সিসি পর্যন্ত প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ির মোট করভার ৯৩.১৬ শতাংশ থেকে কমে ৭৩.৪৩ শতাংশে নামানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। ইভি চার্জার ও চার্জিং স্টেশন ঃ ইলেকট্রিক গাড়ির চার্জার ও চার্জিং স্টেশনের ওপর বিদ্যমান ৩৯.৭৫ শতাংশ করভার সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব রয়েছে। ফলে সস্তায় সেবা পাওয়া যেতে পারে। ক্রিয়েটিভ ও মিডিয়া খাত ঃ গিটার, পিয়ানো, ভায়োলিন ঃ মিউজিক্যাল ইন্সট্রুমেন্ট এবং যন্ত্রাংশ আমদানিতে ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। সিনেমা ক্যামেরা ঃ উচ্চপ্রযুক্তির সিনেমাটোগ্রাফিক ক্যামেরার আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে প্রস্তাবিত বাজেটে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য ঃ স্বাধীন চলাচলে সহায়ক ২১ ধরনের বিশেষ সহায়ক যন্ত্র আমদানিতে সব ধরনের আমদানি শুল্ক, রেগুলেটরি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও আগাম কর সম্পূর্ণ অব্যাহতির প্রস্তাব করা হয়েছে।


