জাতীয় সংবাদ

জুনে সহিংসতায় নিহত ৪০, আহত ৪১৫

এইচআরএসএস

প্রবাহ রিপোর্ট : চলতি বছরের জুন মাসে সারাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতায় ৯ জন নিহত এবং ৩৪৬ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে গণপিটুনি ও মব সহিংসতায় আরও ৩১ জন নিহত এবং ৬৯ জন আহত হয়েছেন। ফলে দুই ধরনের সহিংসতায় মোট প্রাণহানির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪০ জন। বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানায়।
সংস্থাটি জানায়, দেশের ১৬টি জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন, এইচআরএসএসের সংগৃহীত তথ্য এবং ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ২০২৬ সালের জুন মাসের মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুনে ৫৮টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৯ জন নিহত ও ৩৪৬ জন আহত হয়েছেন। মে মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হয়েছিলেন ৫ জন এবং আহত হন ২৮৯ জন। সে তুলনায় জুনে হতাহতের সংখ্যা বেড়েছে। রাজনৈতিক সহিংসতার মধ্যে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ২১টি ঘটনায় ৩ জন নিহত ও অন্তত ১৪৬ জন আহত হয়েছেন। বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষের ৮টি ঘটনায় ২ জন নিহত ও ৩৬ জন আহত হন। বিএনপি-আওয়ামী লীগ সংঘর্ষের ১৪টি ঘটনায় ২ জন নিহত ও ১১৫ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া বিএনপি-এনসিপির মধ্যে ৫টি ঘটনায় ১৮ জন এবং বিএনপির সঙ্গে অন্যান্য দলের ৫টি ঘটনায় ৯ জন আহত হন। বিভিন্ন দলের মধ্যে সংঘটিত আরও ৫টি ঘটনায় ২ জন নিহত ও ২২ জন আহত হয়েছেন। নিহত ৯ জনের মধ্যে বিএনপির ৪ জন, আওয়ামী লীগের ২ জন, শিবিরের ১ জন, ইউপিডিএফের ১ জন এবং একটি চরমপন্থী দলের ১ সদস্য রয়েছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ, দলীয় ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে অধিকাংশ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া দুষ্কৃতকারীদের হামলায় ১২টি ঘটনায় ৯ জন নিহত ও ২২ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে আওয়ামী লীগের ৩ জন, বিএনপির ৫ জন এবং একটি চরমপন্থী দলের ১ সদস্য রয়েছেন। একই সময়ে অন্তত ১৫ জন রাজনৈতিক নেতা-কর্মী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এছাড়া আধিপত্য বিস্তার, দখলদারিত্ব, রাজনৈতিক সহিংসতা ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে ১৫টি ঘটনায় অন্তত ৪৫টি বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও দলীয় কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। রাজনৈতিক মামলার বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, জুনে বিভিন্ন দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ২২টির বেশি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ৬২৭ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং আরও প্রায় ১ হাজার ২৬২ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। একই সময়ে রাজনৈতিক ও অন্যান্য ঘটনায় মোট ২৫৭টি অভিযানে অন্তত ৪ হাজার ৭৭৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারদের মধ্যে আওয়ামী লীগের অন্তত ১ হাজার ৫৫৯ জন, বিএনপির ৩৫ জন এবং জামায়াতে ইসলামীর ২ জন রয়েছেন। মব সহিংসতা ও গণপিটুনির বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, বাকবিত-া, আধিপত্য বিস্তার ও ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে ৬৩টি ঘটনায় ৩১ জন নিহত এবং ৬৯ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, অভিযান, আসামি ছিনিয়ে নেওয়া ও স্থানীয় জনতার হামলাসহ ২৯টি ঘটনায় ৬৬ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য আহত হয়েছেন। জুন মাসে ৩৯টি ঘটনায় ৪৭ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ২৮ জন আহত, ৫ জন লাঞ্ছিত এবং ৯ জন হুমকির মুখে পড়েন। ৫ জন সাংবাদিককে আটক করা হয়েছে এবং ৭টি মামলায় ১২ জন সাংবাদিককে আসামি করা হয়েছে। সভা-সমাবেশ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, জুনে ৬টি সভা-সমাবেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বাধা দেয়। এতে ১৭ জন আহত এবং ৩৬ জনকে আটক করা হয়। এছাড়া মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের ১১টি ঘটনায় ১১ জনকে আটক এবং ৭টি মামলা করা হয়েছে। এসব মামলায় অন্তত ১২ জনকে আসামি করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কন্যা জাইমা রহমান ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের সমালোচনার অভিযোগে ৬ জন এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে ৫ জনকে আটক করা হয়েছে। পাশাপাশি সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫-এর আওতায় ৪টি মামলায় ৯ জনকে আসামি এবং ৪ জনকে আটক করা হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, জুনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ, হেফাজত ও নির্যাতনের ঘটনায় ৩ জন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ২ জন কথিত বন্দুকযুদ্ধে এবং ১ জন ডিবি হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগে মারা যান। এছাড়া গ্রেপ্তার এড়াতে পালানোর সময় আরও ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই মাসে দেশের বিভিন্ন কারাগারে ৭ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে ৪ জন দ-প্রাপ্ত কয়েদি এবং ৩ জন হাজতি ছিলেন। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ১২টি হামলার ঘটনায় ৭ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া ১২টি মন্দির, ১১টি প্রতিমা ও ৭টি বসতবাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর এক নারী গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন। সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ৫টি ঘটনায় ২ জন নিহত, ২ জন আহত এবং ৪ জন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। বিএসএফ একজনকে আটক করেছে। এছাড়া ৭ জনকে পুশইন করা হয়েছে এবং ৪ শতাধিক নারী, পুরুষ ও শিশুকে পুশইনের চেষ্টা করা হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে পুঁতে রাখা স্থলমাইন বিস্ফোরণের ৩টি ঘটনায় একজন রোহিঙ্গাসহ ৩ জন নিহত হয়েছেন। এছাড়া ৩টি ঘটনায় ১২ জনকে আরাকান আর্মি আটক করেছে। শ্রমিক নির্যাতনের বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, জুনে ৫৫টি ঘটনায় ১১ জন শ্রমিক নিহত এবং ১৮৪ জন আহত হয়েছেন। অস্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তা সরঞ্জামের অভাবে কর্মস্থলে দুর্ঘটনায় আরও ৩৯ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া বেতন-ভাতার দাবিতে আন্দোলনের সময় ২৬ জন পোশাকশ্রমিককে আটক করা হয়। একই মাসে দুইজন গৃহকর্মীর রহস্যজনক মৃত্যু এবং একজন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, জুনে ৩৫২ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১০৬ জন ধর্ষণের শিকার হন, যার ৭৫ জনই ১৮ বছরের কম বয়সী। এছাড়া ১৯ জন গণধর্ষণের শিকার হন এবং ধর্ষণের পর ২ কন্যাশিশুকে হত্যা করা হয়। যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন ৯৪ জন নারী ও কন্যাশিশু। অন্যদিকে ২৯১ জন শিশু বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তাদের মধ্যে ৫৪ জন নিহত এবং ২৩৭ জন শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, জুন মাসে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি একটি সংবেদনশীল ও উদ্বেগজনক পর্যায় অতিক্রম করেছে। রাজনৈতিক সহিংসতা, গণপিটুনি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, সাংবাদিক নির্যাতন, নারী ও শিশু নির্যাতন, সীমান্ত সহিংসতা এবং শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। তিনি বলেন, বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতপ্রকাশকে কেন্দ্র করে গ্রেপ্তার, হয়রানি ও আইনি পদক্ষেপের ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এসব সমস্যার কার্যকর সমাধান না হলে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা রয়েছে। তিনি মানবাধিকার সুরক্ষায় সরকারের আরও জবাবদিহিমূলক ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোকে আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button