খেলাধুলা

৪০ ঘণ্টার বাসযাত্রা, যুদ্ধ ও ভিসা জটিলতা পেরিয়ে বিশ্বকাপের আঙিনায় ইরান

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যখন ইরানের মাটিতে প্রথম মার্কিন বোমা আছড়ে পড়েছিল, তখন হয়তো খুব কম মানুষই ভেবেছিল ২০২৬ বিশ্বকাপে অংশ নিতে পারবে ইরান। যে দেশের সঙ্গে তাদের যুদ্ধ চলছে, সেই যুক্তরাষ্ট্রই আবার বিশ্বকাপের অন্যতম আয়োজক। ফলে বিশ্বকাপে ইরানের অংশগ্রহণই যেন একসময় অবাস্তব কল্পনা বলে মনে হচ্ছিল। কিন্তু সব অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও প্রশাসনিক জটিলতাকে পেছনে ফেলে অবশেষে শনিবার বিকেলে তুরস্কের আন্তালিয়া বিমানবন্দর থেকে মেক্সিকোর তিজুয়ানার উদ্দেশে উড়াল দিয়েছে ইরান জাতীয় ফুটবল দল। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাস্তবতা, মার্কিন ভিসা নিয়ে দীর্ঘ অনিশ্চয়তা এবং শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তা পার করে উত্তর আমেরিকার ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরে অংশ নিতে যাচ্ছে পার্সিয়ানরা। পর্তুগাল কিংবা বেলজিয়ামের মতো দলগুলো যখন নির্বিঘেœ বিশ্বকাপের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন ইরানের প্রতিটি দিন কেটেছে উৎকণ্ঠার মধ্যে। মেক্সিকোর ভিসা আগেই মিলেছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্রে গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলো খেলতে প্রয়োজন ছিল মার্কিন ভিসার। ১৫ ও ২১ জুন লস অ্যাঞ্জেলেসে নিউজিল্যান্ড ও বেলজিয়ামের বিপক্ষে এবং ২৭ জুন সিয়াটলে মিশরের বিপক্ষে খেলবে তারা। গত শুক্রবার রাতে খবর আসে, হেড কোচ আমির গ্যালেনোই ও ফুটবলারদের বেশিরভাগই ভিসা পেলেও টিম ম্যানেজমেন্ট, অ্যানালিস্ট ও মিডিয়া কর্মকর্তাসহ ১৩ জনের ভিসা আটকে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা এক বিবৃতিতে জানান, প্রয়োজনীয় স্টাফদের ভিসা দেওয়া হয়েছে। তবে এই ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে কোনো ‘সন্ত্রাসী’ যাতে দেশে প্রবেশ করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা হচ্ছে। মার্কিন প্রশাসনের এই মন্তব্য ইরান শিবিরে বড় ধাক্কা দেয়। ইরান ফুটবল ফেডারেশন ক্ষোভ প্রকাশ করে জানায়, দলের প্রত্যেক সদস্যের ভিসা নিশ্চিত করার দায়িত্ব ছিল ফিফার। শেষ পর্যন্ত জটিলতা এড়াতে অ্যারিজোনায় ক্যাম্প করার পরিকল্পনা বাতিল করে মেক্সিকোর সীমান্ত শহর টিজুয়ানাকে ঘাঁটি হিসেবে বেছে নেয় ইরান। মার্কিন শহর সান দিয়েগোর একদম পাশে অবস্থিত এই শহরে অন্তত মার্কিন দূতাবাসের সরাসরি সহযোগিতা ও প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সুবিধা পাওয়ার আশা করছে তারা। বিশ্বকাপের পথে ইরানের যাত্রা মোটেও সহজ ছিল না। মার্চে যুদ্ধ তীব্র আকার ধারণ করলে তেহরান থেকে তুরস্কের সীমান্তে পৌঁছাতে দলকে টানা ৪০ ঘণ্টা বাসে ভ্রমণ করতে হয়। দলের ৬ ফুট ৫ ইঞ্চি উচ্চতার গোলরক্ষক আলীরেজা বেইরানভান্দ এতটাই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন যে বাসের মেঝেতেই শুয়ে হাত-পা ছড়িয়ে বিশ্রাম নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। যুদ্ধের কারণে ঘরোয়া লিগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় ১৭ জন খেলোয়াড়কে নিয়ে তখন থেকেই দীর্ঘমেয়াদি ক্যাম্প পরিচালনা করছে ইরান ফুটবল ফেডারেশন। তুরস্কের ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে অবস্থিত পাঁচ তারকা মারদান প্যালেস হোটেল শেষ পর্যন্ত তাদের জন্য কিছুটা স্বস্তির জায়গা হয়ে ওঠে। সেখানে অনুশীলনের পাশাপাশি ফুটবলাররা একসঙ্গে সিনেমা দেখে সময় কাটিয়েছেন। বিশেষভাবে তাদের অনুপ্রাণিত করেছে ২০০৭ সালে এশিয়ান কাপজয়ী ইরাক দলকে নিয়ে নির্মিত একটি ডকুমেন্টারি। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাস্তবতার মধ্যেও ভিন্ন সংস্কৃতির খেলোয়াড়রা কীভাবে একত্রিত হয়ে সাফল্য অর্জন করেছিলেন, সেই গল্পই উঠে এসেছে সেখানে। দলের ৩২ বছর বয়সী অভিজ্ঞ উইঙ্গার আলিরেজা জাহানবাখশ (যিনি বর্তমানে বেলজিয়ান ক্লাব ডেন্ডারে খেলেন) বলেন, ‘পরিস্থিতি মোটেও সহজ ছিল না। তবে অভিজ্ঞ খেলোয়াড় হিসেবে আমরা দলকে ঐক্যবদ্ধ রেখেছি। আমরা সবাইকে একটাই কথা বলি, বাইরের পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। কিন্তু দলের ভেতরের পরিবেশ ও সম্পর্ক আমরা ধরে রাখতে পারি।’ নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘পার্সিয়ান হিসেবে আমরা অত্যন্ত গর্বিত জাতি। আমাদের রক্তে আছে প্রতিরোধ এবং ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতা।’ মার্চে ইরানের ক্যাম্পে গিয়ে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো তাদের বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ নিয়ে আশ্বস্ত করেছিলেন। তবে সেটি বাস্তবে রূপ দিতে বেশ বেসগ পেতে হয়েছে ইরানি দলকে। তবে মাঠের খেলাতেও নিজেদের রাজনৈতিক ও মানবিক অবস্থান তুলে ধরেছে ইরান। মার্চে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে খেলোয়াড়রা স্কুলব্যাগ হাতে মাঠে নামেন। যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত স্কুলছাত্রীদের স্মরণে এটি ছিল প্রতীকী প্রতিবাদ। পরে মার্কিন তদন্তেও উঠে আসে, ওই ক্ষেপণাস্ত্রটি যুক্তরাষ্ট্রের ছিল। কোস্টারিকার বিপক্ষে ম্যাচের আগে তারা যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ক্রীড়া অবকাঠামোর ছবিও প্রদর্শন করে। সেখানে তেহরানের ঐতিহাসিক আজাদি কমপ্লেক্সের ১২ হাজার আসনের ইনডোর স্টেডিয়ামের ধ্বংসাবশেষও ছিল। এদিকে ইরান দলের ভেতরেও ঝামেলা কম হয়নি। কূটনৈতিক কারণে দল থেকে বাদ পড়েছেন তারকা স্ট্রাইকার সর্দার আজমুন। যুদ্ধ শুরুর পর সংযুক্ত আরব আমিরাতের শাসকের সঙ্গে ছবি প্রকাশ করায় দেশের নীতিনির্ধারকদের অসন্তোষের মুখে পড়েন তিনি। যদিও বিষয়টিকে পরে ‘দলের অভ্যন্তরীণ বিষয়’ বলে এড়িয়ে যায় ফেডারেশন। মেক্সিকো যাত্রার মাত্র দুই দিন আগে মালিকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়েছে ইরান। রুদ্ধদ্বার এই ম্যাচে কৌশল গোপন রাখার স্বার্থে ভিডিও ধারণ নিষিদ্ধ ছিল। সামান গোডোসের কর্নার থেকে দুর্দান্ত হেডে গোল করেন সাঈদ এজাতোলাহী। পরে রামিন রেজায়িয়ানের গোলে জয় নিশ্চিত হয়। পুরো ম্যাচে মালি দলের তুলনায় ইরানকে অনেক বেশি গোছানো এবং দীর্ঘদিনের চেনা ছন্দে খেলতে দেখা গেছে। বিশ্বকাপকে সামনে রেখে এরইমধ্যে প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে ইরান। দলটি নানা প্রতিবন্ধকতা জয় করেই দারুণ কিছু করে দেখাতে চায়। দেশটির রাষ্ট্রীয় টিভি চ্যানেল-৩ এর উপস্থাপক পেইমান আসাদিয়ান বলেন, ‘আমরা সেখানে শুধু জিততেই যাচ্ছি।’ অন্যদিকে সাবেক কোচ ও বর্তমান বিশ্লেষক মেহদি তুতুনচি মনে করেন, ‘খেলোয়াড়রা আমেরিকায় গিয়ে দুটি বিষয় দেখাবে। প্রথমত, তারা শান্তির পক্ষে। দ্বিতীয়ত, তারা নিজেদের ফুটবলীয় শক্তির পরিচয় দেবে।’ সবশেষে তারা কল্পনা করেন এক অবিশ্বাস্য সম্ভাবনার কথা। যদি গ্রুপ পর্বে রানার্সআপ হয়ে নকআউট পর্বে টেক্সাসে মুখোমুখি হয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান! তুতুনচির ভাষায়, ‘যুদ্ধ হয়তো অনেক খারাপ সময় নিয়ে এসেছে। কিন্তু ফুটবল মাঠে হয়তো দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্বের একটি মুহূর্তও তৈরি হতে পারে।’

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button