স্থানীয় সংবাদ

চব্বিশের জুলাইয়ে যাত্রাবাড়ীতে গুলিতে নিহত হন খুলনার রূপসার তরুণ ইয়াসিন

# যে ছেলের জীবন গেল দেশের জন্য,
সেই দেশের সরকার খোঁজ রাখে না
# একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে মায়ের
বিলাপ আমাকে এখন কে খাওয়াবে!

এম এ আজিম : খুলনা জেলার রূপসা উপজেলার নৈহাটি ইউনিয়নের রহিমনগর গ্রামে জন্ম ইয়াসিনের। জন্মের পরই বাবাকে হারায় সে। মা মনজিলা বেগম মানুষের বাড়ি কাজ করে কোনো রকমে টেনেটুনে ছোট এ সংসাটি চালাতেন। অভাবের সংসারে জন্ম নেওয়া ভীষণ বিবেকবান এ ছেলেটি ছোটবেলা থেকেই একটা স্বপ্ন বুকে লালন করত সে বড় হয়ে নিজের উপার্জনেই তিন বোনের বিয়ে দেবে। তার বাবার মৃত্যুর পর ৫০ বছর বয়সী মা মনজিলার জীর্ণ কাঁধের বোঝাটা কাঁধে তুলে নিতেই গ্রাম ছেড়ে পাড়ি জমিয়েছিল ইট-পাথরের রাজধানী ঢাকায়। কিন্তু একটা বুলেট চোখের নিমিষেই শেষ করে দিল মায়ের সেই স্বপ্ন, আর তিন বোনের আদরের একমাত্র ভাইয়ের বেঁচে থাকার আকুতি। চব্বিশের জুলাইয়ের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে গুলিতে নির্মমভাবে নিহত হন খুলনা জেলার রূপসা উপজেলার নৈহাটী ইউনিয়নের রহিমনগর গ্রামের বাসিন্দা ১৭ বছর বয়সী তরুণ মোহাম্মদ ইয়াসিন আলী শেখ। অভাবের তাড়নায় যাত্রাবাড়ীর একটি এলপি গ্যাস সিলিন্ডারের দোকানে ডেলিভারি ম্যানের কাজ নেওয়া এই কিশোর কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিল না। পেটের তাগিদে কাজ করতে গিয়েই রাজনীতির নির্মম শিকার হতে হলো তাকে।
অভাবের সংসারে আলোর প্রদীপ তিন বোনের পর জন্ম নেওয়া একমাত্র ভাইকে নিয়ে মায়ের আশার অন্ত ছিল না। অভাবের কারণে বেশি দূর পড়াশোনা করতে না পারলেও ইয়াসিন ছিল অমায়িক ব্যবহারের অধিকারী। প্রতিবেশীদের সুখ-দুঃখে সবসময় পাশে দাঁড়াত সে।
ইয়াসিনের বোনেরা জানান, নিজেরা না খেয়ে থাকলেও ইয়াসিন সবসময় বোনদের খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে সচেতন থাকত। মায়ের কষ্ট দূর করতে এবং পরিবারের হাল ধরতে একদিন সে সিদ্ধান্ত নেয় ঢাকায় যাওয়ার। যাত্রাবাড়ী এলাকায় একটি গ্যাস সিলিন্ডারের দোকানে কাজ শুরু করে সে। তার আয়েই ঢাকার রাজধানীর মাতুয়াইলে ছোট একটি ঘর ভাড়া নিয়ে থাকতে শুরু করেন মা ও ছেলে।
সেদিন যা ঘটেছিল : ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই, শুক্রবার। কোটা সংস্কার আন্দোলন তখন রূপ নিয়েছে ছাত্র-জনতার গণবিক্ষোভে। সকাল থেকেই যাত্রাবাড়ী এলাকার পরিস্থিতি ছিল থমথমে। জুমার নামাজের পর পরই এলাকায় ছাত্র-জনতার সাথে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ব্যাপক ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ শুরু হয়। ঠিক ওই সময়টাতে ইয়াসিন এক গ্রাহকের বাসায় গ্যাসের সিলিন্ডার পৌঁছে দিয়ে দোকানে ফিরছিল। পথচারী এই কিশোর হঠাৎ করেই রণক্ষেত্রে পরিণত হওয়া যাত্রাবাড়ী মোড়ে সংঘর্ষের মাঝে পড়ে যায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সংঘর্ষের একপর্যায়ে পুলিশের ছোঁড়া বুলেট এসে সরাসরি আঘাত করে ইয়াসিনের শরীরে। রক্তাক্ত অবস্থায় লুটিয়ে পড়ে সে। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে দ্রুত মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। হাসপাতালে টানা ৫ দিন চিকিৎসা শেষে ২৫ জুলাই (সরকারি নথিতে ২৪ জুলাই সন্ধ্যা) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে এই সংগ্রামী তরুণ।
‘মা’য়ের বিলাপ আমাকে এখন কে খাওয়াবে : রহিমনগর গ্রামে ইয়াসিনদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। জীর্ণশীর্ণ কুঁড়েঘরে বসে আছেন মা মনজিলা বেগম। ছেলের ছবি বুকে জড়িয়ে ধরে অশ্রুসজল চোখে তিনি বলেন, “আমার ছেলে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর কয়েকজন ছেলে মাতুয়াইলের ভাড়া বাসায় এসে খবর দেয়। তখন আমার কাছে একটা টাকাও ছিল না। অনেক অনুরোধের পর এক রিকশাচালক বিনা ভাড়ায় আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। টাকা না থাকায় গ্রামের মানুষের চাঁদা তোলা টাকায় এম্বুলেন্স ভাড়া করে ইয়াসিনের লাশ খুলনায় এনেছি। আসার পথেও পদে পদে হয়রানি হতে হয়েছে।
কান্নায় ভেঙে পড়ে মা আরও বলেন, “আমার ছেলের তো কোনো দোষ ছিল না। সে তো মিছিলে যায় নাই, কোনো দল করতো না৷ কাজ করতো, ভাত খাইতো।
আমার ইয়াসিনের আয় দিয়েই বাসা ভাড়াসহ সংসার চলতো। আমি এখন কী করে চলবো, আমাকে কে খাওয়াবে? আমার তো সব শেষ হয়ে গেল!”
বর্তমানে তার মা মনজিলা বেগম ও বড় বোন স্বামী পরিত্যাক্তা নূর জাহান ঢাকার মাতুয়াইলেই থাকেন। অন্যের বাড়িতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। আর মেঝো মেয়ে নাসরিনকে নড়াইলে এবং ছোট মেয়ে শারমিনকে বরিশালে বিয়ে দিয়েছেন। তাদের দিন আনে দিন খায় অবস্থা। আমার আর দেখার কেউ নাই।
১৭ বছর আগে হারিয়েছি স্বামীকে। আর দুই বছর আগে হারালাম একমাত্র ছেলেকে। বৃদ্ধা মা মোমেনা বেগম (৮৫) কে দেখতে হয় আমাকে। বড় একটি নিশ্বাস ফেলে কষ্টের কথা বলতে বলতে আর চোখ মুছতে মুছতে বললেন আমার ছেলের হত্যাকারীদের ফাঁসি চাই। সাথে সাথে সরকারের দেয়া প্রতিশ্রুতি দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানান। তিনি বলেন, একমাত্র জামায়াতে ইসলাম আমার ছেলের জন্য দুই লাখ টাকা দিয়েছিল। আর এ পর্যন্ত কেউ কোন কিছুই দেয় নাই। ১০/১১ দিন পর আমার ছেলে মৃত্যুবার্ষিকী। তিনি বলেন, সবার জীবন চলছে, আমার জীবনও চলছে। কিন্তু একমাত্র উপার্জনক্ষম ছেলেকে হারিয়ে আজ আমি দিশেহারা। যে ছেলের জীবন গেল দেশের জন্য। সেই দেশের সরকার তো আমাদের খোজ রাখে না। ইয়াসিনকে হারিয়ে পরিবারটি এখন সম্পূর্ণ দিশেহারা ও অভিভাবকহীন। একটি সুন্দর আগামীর স্বপ্ন নিয়ে যে কিশোরের পথচলা শুরু হয়েছিল, বুলেট তার জীবনের গতি থামিয়ে দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু রহিমনগরের কলোনি কবরস্থানের লাল মাটিতে ঘুমিয়ে থাকা ইয়াসিন এখন একবিংশ শতাব্দীর এক নতুন বাংলাদেশের ইতিহাসের অংশ। তবে ইতিহাস কি পারবে তার মায়ের শূন্য কোল আর বোনদের কান্নার ঋণ শোধ করতে? সেই প্রশ্নই এখন বাতাসে ভাসছে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button