স্থানীয় সংবাদ

খুলনায় নি¤œমানের বৈদ্যুতিক পণ্যের ছড়াছড়ি, ঠকছে ক্রেতা

তদারকি অভিযান নেই

স্টাফ রিপোর্টার ঃ খুলনার বিভিন্ন ইলেকট্রিক মার্কেটে বিক্রি হচ্ছে নকল ও নি¤œমানের বৈদ্যুতিক পণ্য। এসব পণ্যের কিছু আমদানি করা, আবার কিছু দেশেই তৈরি করা হচ্ছে। কারসাজি করে আসল ব্র্যান্ডের বলে রেপ্লিকা পণ্য পাইকারি ও খুচরা মূল্যে বিক্রি করা হচ্ছে। এসব পণ্য কিনে প্রতারিত হচ্ছেন ক্রেতারা। পাশাপাশি ভূয়া ওয়ারেন্টি-গ্যারান্টির মাধ্যমেও ঠকানো হচ্ছে ক্রেতাদের।
সরেজমিন ডাকবাংলা, খালিশপুর, দৌলতপুর বাজারের ইলেকট্রিক্যাল পণ্যের মার্কেটগুলোতে নকল ও নি¤œমানের বৈদ্যুতিক পাখা, পানির পাম্প, বাল্ব, টিউব লাইট, এলইডি লাইট, বৈদ্যুতিক সুইচ, সকেট, কাটআউট, হোল্ডার, রেগুলেটর, মাল্টিপ্লাগ. টিভি, ফ্রিজ ও বৈদ্যুতিক তারসহ নানা পণ্য বিক্রি করতে দেখা গেছে। এছাড়া ডাকবাংলা হার্ডমেটাল গ্যালারী, শহিদুল ইসলাম মার্কেট, এসএম রব শপিং কমপ্লেক্সের প্রায় দোকানেই নি¤œমানের ইলেকট্রিক পণ্য দেখা গেছে। মার্কেটের নিচতলার একটি দোকানে নামিদামি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বৈদ্যুতিক পাখা বিক্রি করতে দেখা যায়-যার সবই মূলত নি¤œমানের রেপ্লিকা। কিন্তু ক্রেতাদের এসব পণ্য আসল বলেই বিক্রি করা হচ্ছে। এমন কি কোন কোন দোকানে বসে শোনা যায়, ওমুক দোকানে নকল পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে। আমার দোকানে আসল পণ্য বিক্রি করা হয়, যার জন্য দাম একটু বেশী। বিশেষ করে ফ্যানের ক্ষেত্রে এসব কথা বেশী শোনা যায়। এ মার্কেটে রাইস কুকার বেশীর ভাগই নকল বলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন দোকানদার জানান।
অপরদিকে, নগরীর দৌলতপুর, খালিশপুর ও ফুলবাড়িগেটে হাঁকডাক দিয়ে বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের এলইডি লাইট। মাইকে ‘৩০০ টাকার লাইট ১৫০ টাকা’ বলে বিক্রি করা হচ্ছে। পাশাপাশি এক বছরের ভূয়া গ্যারান্টিও দেওয়া হচ্ছে। এদিকে ছাড়ের এই হুজুকে অনেক ক্রেতাই ভিড় করেন লাইট কিনতে। এছাড়া কয়েকদিন ব্যবহারের পর নষ্ট লাইট নিয়েও অনেকে হাজির হয়েছেন।
দৌলতপুর আফসানা ম্যানশন মার্কেটের ফ্যান, লাইট, ঘড়িসহ নানা ধরনের ইলেকট্রিক পণ্য বিক্রি করেন সুশান্ত দে। তিনি বলেন, এ মার্কেটে নকল পণ্য বিক্রি হয় না। যা হয় সবই ব্রান্ডের পণ্য। তবে পন্যের দামে কম বেশী হতে পারে বলে তিনি দাবি করেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৫০ টাকায় যেসব এলইডি লাইট বিক্রি হচ্ছে, তা কোনো ধরণের মানদ- নিশ্চিত ছাড়াই এই মার্কেটে কারিগর দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে। প্রতিটি লাইটে ৫-৬টি ছোট আকারে এলইডি লাইট, একটি নি¤œমানের আইসি ও মাদারবোর্ড যুক্ত করে ৪০-৫০ টাকা খরচে তৈরি করা হয়। এরপর বিক্রি হচ্ছে কয়েকগুণ বেশি দরে। কিছুদিন ব্যবহারের পর এসব লাইট নষ্ট হয়ে যায়। এতে ক্রেতার আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। পাশাপাশি নি¤œমানের এসব পণ্যের কারণে বড় ধরনের বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটের আশঙ্কাও থাকে। এ ধরণের বাল্ব তৈরী করতে দেখা যায় খালিশপুর চিত্রালী বাজারে।
রাহুল নামে এক ক্রেতা বলেন, ৮ দিন আগে এই পথ দিয়ে যাওয়ার সময় মাইকে ১৫০ টাকায় লাইট বিক্রির অফার শুনে দু’টি কিনেছিলাম। সঙ্গে ১ বছরের গ্যারান্টিও ছিল। কিন্তু আট দিন যেতে না যেতে দু’টা লাইটই নষ্ট হয়ে যায়। এখন ওরা বলছে, এই লাইট আমি এখান থেকে কিনি নাই।
আরেক ক্রেতা জাহিদুল হোসেন জানান, সাড়ে চার মাস আগে ৩২০০ টাকা দিয়ে একটি ‘জেএফসি’ (মূলত রেপ্লিকা) বৈদ্যুতিক পাখা কিনেছিলাম। ৪ মাসের গ্যারান্টি ও এক বছরের ওয়ারেন্টি ছিল। কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই পাখাটিতে সমস্যা দেখা দেয়। এরপর একদিন হঠাৎ পাখাটি বন্ধ হয়ে যায়। মিস্ত্রিকে দেখালে পাখাটি নকল বলে জানায়। এক বছরের ওয়ারেন্টি থাকলেও বিক্রেতারা পাখাটি বদলে বা ঠিক করে দিচ্ছে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিক্রেতা জানান, অনেক সময় পণ্য আসল বলে বিক্রি করতে হয়। কারণ এখানে যেসব পণ্য বিক্রি হয় তা বেশির ভাগই রেপ্লিকা বা বিভিন্ন দেশ থেকে অর্ডার করে বানানো। পাশাপাশি কিছু পণ্য যেমন সুইচ-সকেট, মাল্টিপ্লাগ, চার্জার ফ্যান, এলইডি লাইট ইত্যাদি কারিগর রেখে এখানেই তৈরি করা হয়। তাই ক্রেতাদের বুঝেশুনে দামাদামি করে কিনতে হয়। অনেক সময় এসব পণ্যে কোনো ধরনের সমস্যা হয় না। আবার অনেক পণ্য ব্যবহারের কিছুদিন পর নষ্ট হয়ে যায়।
হার্ডমেটাল গ্যালারীর একজন দোকানদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মনির ইলেকট্রনিক্স দোকানে ভোক্তা অধিকার দপ্তরের লোকজন সম্প্রতি অভিযান চালায় এবং নকল পণ্য জব্দ করে। এছাড়া মার্কেটে আরো দু’টি বড় মাপের দোকানে নকল পণ্য অহরহ বিক্রি হয়। যা মার্কেটের সুনাম চরমভাবে নস্ট হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।
শহিদুল ইসলাম ইলেকট্রিক মার্কেটের ব্যবসায়ী আলী আহমদ বলেন, পাটুয়াটুলি ও গুলিস্তানসহ পুরান ঢাকার বিভিন্ন স্থানে চীন থেকে আমদানি করা বিভিন্ন ব্র্যান্ডের হুবহু নি¤œমানের বৈদ্যুতিক পাখা বিক্রি হচ্ছে। যা কিছুদিন ভালো সার্ভিস দিলেও পরে নষ্ট হয়ে যায়। পুরান ঢাকায় একাধিক নি¤œমানের বৈদ্যুতিক তার তৈরির কারখানাও রয়েছে। নানা ধরনের ইলেকট্রনিক পন্যের সমাহার ভিশন শো রুমে। নগরীর শিববাড়িমোড় প্রবাহ ভবন সংলগ্নসহ নগরীর চারটি শো রুম রয়েছে এ কোম্পানীর।
ম্যানেজার শাকিল হোসেন বলেন, দেখতে ও শুনতে একই রকম হলেও শো রুমের বাইরে ইলেকট্রনিক পন্যের মান নিশ্চিত করা কঠিন। কারণ শো রুমের বাইরে বিক্রি করা ইলেকট্রনিক পণ্য আসল কি না তা ক্রেতারা সহজে বুঝতে পারবে না। কারণ যারা নকল করে তারা খুবই চতুর। এছাড়া তাদের কোম্পানীর পন্য নকল করে বাইরে যাতে বিক্রি করতে না পারে সে জন্য তাদের রয়েছে সিভিল টিম। এই সিভিল টিম সম্প্রতি নগরীর ডাকবাংলা মোড়ে হার্ডমেটাল গ্যালারীতে অভিযান চালিয়ে তিন লাখ টাকা মূল্যের অনেকগুলো নকল টিভি উদ্ধার করে। এভাবে তাদের নকল ধরতে অভিযান অব্যাহত আছে বলে জানান।
১১নং কেডিএ এভিনিউ স্কয়ার ইলেকট্রনিক শো রুমের ম্যানেজার মেহেদী হাসান বলেন, নকল পন্যের বিরুদ্ধে তাদেরও দৃঢ় অবস্থান। কিন্তু গ্রাহকরা বেশীরভাগই বুঝেন না। তারা শো রুমের বাইরে থেকে কম মূল্যের পন্য কিনে ঠকে। পরে আপসোস করেন। কিন্তু করার কিছু থাকে না। তবে সম্প্রতি বিএসটিআই খুলনা অফিস তাদের চিঠি দিয়েছেন। ওই চিঠিতে আগামী ৩ জুলাই ইলেকট্রনিক্স ব্যবসায়ীদের সাথে কর্মকর্তারা মত বিনিময় করবেন। তারা নকল পণ্যের ব্যাপারে ব্যবসায়ীদের সর্তক করবেন। এটা ভাল উদ্যোগ বলে তিনি মনে করেন। আমদানীকৃত পণ্যের বাইরে গিয়ে ইলেকট্রনিক্স পণ্যে কিনলে ঠকতে হবে, এটাই স্বাভাবিক। এ জন্য আমদানিকৃত ইলেকট্রনিক পণ্য ডিলার বা তার মনোনীত শো রুম থেকে ক্রয় করলে আসল পণ্য ক্রয় করা যাবে। শো রুমের বাইরে গিয়ে যতই সস্তা হোক না কেন ইলেকট্রনিক্স পণ্য না কেনার আহবান জানান তিনি।
এ বিষয়ে বাজার তদারকি সংস্থা জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর খুলনার সহকারী পরিচালক মোঃ ওয়ালিদ বিন হাবিব বলেন, নগরীতে এসব ইলেকট্রিক্যাল মার্কেট থেকে পণ্য কিনে প্রতিনিয়ত ঠকছেন ক্রেতা। এমন সুনির্দিষ্ট অভিযোগ কেউ দেয়নি। এখানে কম দামে পণ্য পাওয়া যায়, তাই ক্রেতারাও ভিড় করেন। কিন্তু বিক্রেতারা ক্রেতার সরলতার সুযোগে নি¤œমানের পণ্য ধরিয়ে দিয়ে থাকেন তাহলে তাদের নজরে আসলে তারা আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। এখন থেকে এসব মার্কেটে নিয়মিত অভিযান চালানো হবে। তিনি বলেন, খুলনার হার্ডমেটাল গ্যালারীতে গত গ্রীষ্ম মৌসুমে তদারকি অভিযান পরিচালনা করা হয়। তবে সেখানে পণ্যের দাম নিয়ে তদারকি করা হয়। নকল পণ্য আছে-কি না সে বিষয়টি কোন পক্ষ থেকে বলা হয়নি। তবে এবার বিষয়টি দেখা হবে বলে তিনি জানান।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button