খুলনায় ‘শেখ বাড়ী’, প্রেস ক্লাব এবং নগর ও ওয়ার্ড আ’লীগ কার্যালয়ে দফায় দফায় ভাংচুর-অগ্নিসংযোগ

আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগ নেতাসহ আহত অর্ধশতাধিক
শেখ শাহজালাল সুজন ও এমডিএ বাবুল রানার অবস্থা আশঙ্কাজনক
স্টাফ রিপোর্টার : খুলনা নগরীর শেরে বাংলা সড়কের ‘শেখ বাড়ি’ হিসেবে পরিচিত শেখ হাসিনার চাচা শেখ আবু নাসেরের পুত্র সংসদ সদস্য শেখ হেলাল উদ্দীন ও শেখ সালাহউদ্দিন জুয়েলের বাসভবন, খুলনা প্রেস ক্লাব, এবং মহানগর ও কয়েকটি ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের অফিসে দফায় দফায় অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া খুলনা সিটি মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক ও আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুস সালাম মূর্শেদীর বাড়ি এবং জেলা আওয়ামী লীগ নেতা কামরুজ্জামান জামালের অফিসে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় বিভিন্ন স্থানে কমপক্ষে ১০-১২টি মটরসাইকেল ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। রোববার (০৪ আগস্ট) দুপুর ও বিকেলে আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার বিক্ষোভ মিছিল থেকে এসব ঘটনা ঘটে।
হামলায় খুলনা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এমডিএ বাবুল রানা এবং নগর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ শাহাজালাল হোসেন সুজন, জেলা যুবলীগের সভাপতি চৌধুরী রায়হান ফরিদ, জেলা স্ব্চ্ছোসেবক লীগ সভাপতি শেখ মো. আবু হানিফ ও জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি পারভেজ হাওলাদারসহ উভয় পক্ষের অর্ধশতাধিক আহত হয়েছে।
সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দিনব্যাপী নগরীর বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও তা-বের ঘটনা ঘটলেও পুলিশের সক্রিয় ভূমিকা দেখা যায়নি।
অপরদিকে, বিএনপি’র নির্বাহী কমিটির ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক রকিবুল ইসলাম বকুলের খালিশপুরের বাসভবনেও ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর আগে সরকারের পদত্যাগের একদফা দাবিতে ডাকা অসহযোগ আন্দোলনের অংশ হিসেবে রোববার (৪ আগস্ট) বেলা পৌনে ১১টার দিকে নগরীর শিববাড়ি মোড়ে অবস্থান নিয়ে সড়ক অবরোধ করে করে ছাত্র-জনতা। এসময় আন্দোলনকারীদের দফায় দফায় মিছিল ও বিক্ষোভ করতে দেখা যায়। আটকে দেওয়া হয় মোড়ের চতুর্দিকের চলাচলের পথ।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বেলা ১১টার দিকে নগরীর প্রাণকেন্দ্র পিকচার প্যালেস মোড়ে অসহযোগ আন্দোলনের সমর্থনে মিছিল বের হয়। অপরদিকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা দলীয় কার্যালয় থেকে পাল্টা মিছিল বের করে। দুটি মিছিল মুখোমুখি হলে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ শুরু হয়। এ সময় বেশ কয়েক রাউন্ড গুলির ঘটনা ঘটে। এ সময় খুলনা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম ডি এ বাবুল রানা, মহানগর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ শাহজালাল সুজন, জেলা যুবলীগের সভাপতি চৌধুরী রায়হান ফরিদ, জেলা স্ব্চ্ছোসেবক লীগ সভাপতি শেখ মো. আবু হানিফ, জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি পারভেজ হাওলাদার, অ্যাডভোকেট কণিকা বিশ^াস, অ্যাডভোকেট বিজন কুমার ম-লসহ উভয় পক্ষের অর্ধশতাধিক আহত হয়। সংঘর্ষের একপর্যায়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা পিছু হটলে বিক্ষুব্ধ আন্দোলনকারীরা আওয়ামী লীগ অফিসে ঢুকে ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। এ সময় দোকানপাট ভাঙচুর ও আওয়ামী লীগ অফিসের নিচে রাখা বেশ কয়েকটি মোটরসাইকেলে অগ্নিসংযোগ করা হয়। পরে সিটি করপোরেশন ভবনে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এরপর জেলা পরিষদ ভবন ভাঙচুর করে। এ সময় জেলা পরিষদের নিচেয় রাখা যমুনা টেলিভিশনের খুলনা প্রতিনিধি প্রবীর বিশ^াসের মোটরসাইকেলসহ ৫টি মোটরসাইকেলে অগ্নিসংযোগ করা হয়। এছাড়া আহসান আহমেদ রোডে জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক কামরুজ্জামান জামালের অফিস ভাঙচুর করা হয়। এছাড়া জামালের অফিসের গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র এবং ৩টি মোটরসাইকেল অগ্নিসংযোগ করা হয়। পরে যশোর রোডস্থ নৌপরিবহন অফিস ভাঙচুর করা হয়। এরপর খুলনা প্রেসক্লাবে হামলা ও প্রেসক্লাবের অভ্যন্তরে বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল ভাঙচুর করা হয়। এ সময় সাংবাদিক ও প্রেসক্লাবের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। দুপুর ৩টার দিকে নগরীর গগনবাবু রোডস্থ আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুস সালাম মূর্শেদীর বাসভবনে হামলা করে। এ সময় বাড়ির নিচেই রক্ষিত ৩টি মোটরসাইকেলে অগ্নিসংযোগ করা হয়। পরে মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেকের বাড়িতে হামলা করা হয়। বিকাল ৪টার দিকে জেলা পরিষদ ভবনে পুনরায় অগ্নিসংযোগ করা হয়। এ সময় ১টি পাজেরো, একটি একজিও জিপ ও দুটি মোটরসাইকেলে আগুন দেওয়া হয়। বিকাল পৌঁনে ৫টার দিকে পুনরায় খুলনা প্রেসক্লাবে অগ্নিসংযোগ করা হয়। এছাড়া শেখ হেলালউদ্দিন এমপি ও সেখ সালাউদ্দিন এমপির বাসায় দু’ দফায় ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। এছাড়াও কেডিএ এভিনিউস্থ বাংলালিংক ও রবি অফিস ভাংচুর এবং নগরীর শিববাড়ী মোড়, সাতরাস্তার মোড়, ডাকবাংলোর মোড়, পিকচার প্যালেস মোড়, সদর থানা মোড়সহ নগরীর বিভিন্ন স্থানে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
খুলনা সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. রুলিয়া আফরোজ জানান, সংঘর্ষে আহত ২৫-৩০ জন সদর হাসপাতালে আসার পর কয়েকজনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। কয়েকজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এছাড়া গুরুতর আহত এমডিএ বাবুল রানা ও শেখ শাহজালাল হোসেন সুজনকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে। সেখানে তারা আইসিইউতে রয়েছেন।
এদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে গতকাল রবিবার খুলনা থেকে দূরপাল্লার কোনো বাস ছেড়ে যায়নি। নগরীর অধিকাংশ দোকানপাট বন্ধ ছিল। অফিস-আদালত খোলা থাকলেও মানুষের উপস্থিতি ছিল খুবই কম। নগরীতে ইজিবাইক, রিকশা, বাইসাইকেল ও মোটরসাইকেল চলাচল করলেও ভারী কোনো যানবাহন চলাচল করেনি।
এর আগে সরকারের পদত্যাগের একদফা দাবিতে ডাকা অসহযোগ আন্দোলনের অংশ হিসেবে খুলনায় সড়ক অবরোধ করে আন্দোলনকারীরা। রোববার (৪ আগস্ট) সকাল পৌনে ১১টার দিকে নগরীর শিববাড়ি মোড়ে অবস্থান নিয়ে সড়ক অবরোধ করে তারা। এসময় আন্দোলনকারীদের দফায় দফায় মিছিল ও বিক্ষোভ করতে দেখা যায়। আটকে দেওয়া হয়েছে মোড়ের চতুর্দিকের চলাচলের পথ। আন্দোলনকারীরা স্লোগানে স্লোগানে উত্তাল করে রাখে শিববাড়ি মোড়। এসময় আন্দোলনকারীদের ‘দফা এক দাবি এক শেখ হাসিনার পদত্যাগ’, দিয়েছি তো রক্ত, আরও দিব রক্ত’, ‘আঠারোর হাতিয়ার, গর্জে ওঠো আরেকবার’, ‘আমার সোনার বাংলায়, বৈষম্যের ঠাঁই নাই’সহ বিভিন্ন ধরনের স্লোগান দিতে শোনা যায়।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সকাল ১১ টার দিকে ক্যাম্পাস থেকে একটি মিছিল নিয়ে নগরীর শিববাড়ির দিকে যাত্রা করে। মিছিলটি যখন নগরীর সোনাডাঙ্গা মোড় এলাকায় আসে। সর্বশেষ সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা নাগাদ নগরী ছাত্র-জনতার দখলে ছিল।
এদিকে শহর ছাত্র জনতার দখলে থাকলেও মাঠে অবস্থান নিতে দেখা যায়নি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের। তবে পুলিশ বিজিবি দুই একটি গাড়ি দখল দিতে দেখা গেছে।
এ বিষয়ে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ পুলিশ কমিশনার দক্ষিণ মোঃ তাজুল ইসলাম বলেন, পুলিশ ডিউটিতে কিছুটা পরিবর্তন এনেছে। এই মুহূর্তে কোন পয়েন্টে অবস্থান নিয়ে ডিউটি করা হচ্ছে না। তবে মোটরসাইকেল ও পুলিশ ভ্যানে করে টহলে রয়েছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।



