স্থানীয় সংবাদ

পর্যটকদের কাছে সরাসরি সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী দেখা রোমাঞ্চকর

পর্যটকের ঢল সুন্দরবনে

মুহাম্মদ নূরুজ্জামান, সুন্দরবন থেকে ফিরে :
নৈস্বর্গিক সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি সুন্দরবন। বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন। প্রতিদিনই দেশি বিদেশি অসংখ্য পর্যটক সুন্দরবন দেখতে আসেন। সুন্দরবনে সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত, গাছ গাছালী, জীববৈচিত্র-সব কিছুই পর্যটকদের মুগ্ধ করে। পদ্মা সেতুর কারণে রাজধানী থেকে সুন্দরবনের দূরত্ব মাত্র চার ঘন্টায় নেমে আসায় সুন্দরবনে পর্যটকের সংখ্যা দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। শীত কমে আসায় সুন্দরবনের করমজল, দুবলার চর, হিরনপয়েন্ট, কোকিলমুনি, কচিখালি, জামতলা, হারবারিয়া-সব স্থানেই এখন পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড়।
পর্যটকদের কাছে অপার বিষ্ময়ের নাম সুন্দরবন। বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের সৌন্দর্য দেখতে দেশ-বিদেশের নানা প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন ভ্রমণপিপাসুরা। জীববৈচিত্র্যের প্রাণ-প্রাচুর্যের কারণে সুন্দরবন পৃথিবীর অন্যান্য পর্যটনকেন্দ্র থেকে স্বতন্ত্র। এই বনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের নাম। এছাড়া সুন্দরবনে আছে নানা ধরনের পাখি, চিত্রল হরিণ, বন্য শুকর, কুমির, ডলফিনসহ অসংখ্য প্রজাতির প্রাণী। সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য প্রতিবছর অসংখ্য দেশি-বিদেশি পর্যটক ভ্রমণে আসেন। বিশেষ করে শীত মৌসুমে পর্যটকদের আনাগোনা সবচাইতে বেশি ঘটে। এখন সেই পর্যটকের সমাগম ঘটছে সুন্দরবনে। বলা যায় পর্যটকে ভরপুর এখন সুন্দরবন। নভেম্বর মাস শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সুন্দরবনে পর্যটকদের আগমন শুরু হয়। শীত যত বাড়তে থাকে সেই সঙ্গে সুন্দরবনেও বাড়তে থাকে পর্যটকের সংখ্যা।

সমুদ্র বন্দর মোংলা থেকে নৌপথে এক ঘন্টা দূরত্বের করমজল পর্যটন কেন্দ্রে রয়েছে কুমির, কচ্ছপসহ বন্য প্রাণীর কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্র, চিড়িয়াখানা, বনের ভিতরে দীর্ঘ কাঠের ব্রীজ ওয়াকওয়ে, সুউচ্চ ওয়াচ টাওয়ার প্রভৃতি। ওয়াচ টাওয়ার থেকে সুন্দরবনের বড় একটি অংশ এক নজরে দেখা যায়। ওয়াকওয়ে দিয়ে হাঁটার সময় চোখে পড়ে বানর আর হরিণের দল। বানরগুলো নির্ভয়ে সামনে চলে আসে।
সুন্দরবেনর কটকায় জামতলায় রয়েছে প্রশ্বস্ত সমুদ্র সৈকত। কয়েক বছর ধরে জেগে ওঠা ডিমের চরে পর্যটকেরা মনের আনন্দে নিরাপদে পশুর নদীতে পা ভিজিয়ে হেঁটে বেড়ান। দূবলার চরে শুঁটকি পল্লী পর্যটকদের মুগ্ধ করে। আন্দারমািনক, কটকা, কচিখালি, হিরণপয়েন্ট, শেওলারচর, হারবাড়িয়া, পখ্খির খাল, টাইগার পয়েন্ট প্রভৃতি স্থানের সৌন্দর্যও মনোমুগ্ধকর।
সুন্দরবনের ট্যুর অপারেটররা বলেছন, ছুটির দিনে সুন্দরবনে পর্যটকদের ভিড় বেড়েছে। পর্যটকদের যে সকল সুযোগ সুবিধা দেয়া হয় তা মূলত ট্যুরিস্ট লঞ্চে। পর্যটকেরা লঞ্চেই রাত্রি যাপন করেন। সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত তাদের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। এবার পর্যটকদের ভিড় একটু বেশি। পর্যটকদের সর্বোচ্চ সুযোগ সুবিধা দেয়া হয়। পর্যটকেরা দুই রাত তিন দিন এর প্যাকেজ ট্যুরে সুন্দরবন ভ্রমন করেন। বর্তমানে ট্যুরিস্ট লঞ্চ ভেদে পর্যটকদের মাথা পিছু ৮ থেকে ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়।
বনবিভাগের সূত্রমতে, হিরণ পয়েন্ট ও দুবলারচরের চেয়ে এ বছর আন্ধারমানিক, কচিখালী, কটকা, ডিমেরচর, জামতলা সী বিচে পর্যটকের আগমন বেশি। তবে এ বছর বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা কম। পর্যটন স্পটগুলোতে প্রতিদিন ৭-৮ টি ছোট-বড় ভেসেল জাহাজ নোঙ্গর করছে।
পর্যটকদের কাছে সরাসরি সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী দেখা রোমাঞ্চকর। আন্ধারমানিক, কচিখালী, কটকা, ডিমেরচর, জামতলা সী বিচে যাওয়ার পথে দেখা মিলেছে- বানর ও হরিণের দলবদ্ধ ছোটাছুটি, বন্য শুকর, সুন্দরবনের বিলুপ্ত প্রায় বিশাল আকৃতির মদনটাক ও ঈগলের। করমজলের খালের পাড়ে বিশাল আকৃতির কুমিরের রোদ পোহানো ও পানিতে ভেসে থাকতে দেখা পর্যটকদের রোমাঞ্চিত করে। এছাড়াও নদীতে ডলফিনের ডুব সাতার হৃদয়কাড়ে। সুন্দরবনের নদী, খালে সাদা বক, মাছরাঙা, শঙ্খচিল, গাংচিলের মাছধরা ও উড়াউড়ি চোখে পড়ার মতো। সুন্দরবনের লক্ষিপেঁচা, দোয়েল, মৌটুসিসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখির কলরবও মনোমুগ্ধকর।
সুন্দরবনে খুলনা প্রেসক্লাব থেকে আসা পর্যটক সাংবাদিক কেএম জিয়াউস সাদাত বলেন, সরাসরি সুন্দরবনের জীব-জন্তু দেখে অনেক আনন্দ উপভোগ করা যায়। যা অন্যকোনো ভাবে সম্ভব না।
অপর পর্যটক সোহেল মাহমুদ বলেন, সরাসরি সুন্দরবনের হরিণ, কুমির, বানর এবং অন্যান্য পশু পাখির দেখা পাওয়া খুবই রোমাঞ্চকর। বনের জীববৈচিত্র্য বাঁচিয়ে রাখা দরকার।
একইভাবে পর্যটক কাজী শামীম আহমেদ বলেন, সুন্দরবনের অনেক জায়গার বন উজাড় করা হয়েছে। এ কারণে বন্যপ্রাণীও আগের মত দেখা পাওয়া যায়না। তবে তারপরও যা দেখা যায় তার ফিলিংস অন্যরকম।
বনরক্ষী দিলীপ বলেন, সুন্দরবনে হরহামেশা বানর, হরিণ, শুকর দেখা যায়। তবে খুব একটা বাঘ-কুমির দেখা যায় না। যে সব পর্যটকের চোখে বাঘ-কুমির পড়ে তারা ভাগ্যবান।
বনবিভাগ সূত্র জানায়, আগে সুন্দরবনের হারবাড়িয়া, কচিখালি, কটকা, হিরণ পয়েন্ট, দুবলারচর, কলাগাছিয়া ও করমজল এই সাতটি স্থানে পর্যটন স্পট ছিল। নতুন করে শরণখোলার আলীবান্ধা, চাঁদপাই রেঞ্জের আন্ধারমানিক, খুলনা রেঞ্জের শেখেরটেক ও কৈলাশগঞ্জে আরো চারটি পর্যটন স্পট হয়েছে ।
ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব সুন্দরবনের (টোয়াস) সাধারণ সম্পাদক এবং রূপান্তর ইকোট্যুরিজমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাজমুল হাসান ডেভিড বলেন, লাক্সারি লঞ্চগুলোতে ভালো পর্যটক হচ্ছে। তবে ছোট ছোট লঞ্চে তেমন পর্যটক নেই। আন্ধারমানিক, কচিখালি ও কটকা পর্যটন কেন্দ্রে এ বছর পর্যটকদের আগ্রহ বেশি। এছাড়া সন্দরবনের প্রবেশমুখ করমজল পর্যটন স্পটে স্কুল, কলেজের শিক্ষার্থীরা বেশি যাচ্ছেন।
সুন্দরবন বন সংরক্ষক (সিএফ) মিহির কুমার দো বলেন- পর্যটনের জন্য বনবিভাগের পক্ষ থেকে রাজস্ব টার্গেট থাকে না। আমরা চাই সহনশীল মাত্রায় সুন্দরবনে পর্যটক আসুক। যাতে করে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের উপর বিরূপ প্রভাব না পড়ে।
প্রসঙ্গত, প্রতিবছর সুন্দরবনে দেড় থেকে দুই লক্ষ পর্যটক এসে থাকেন। বাংলাদেশে সুন্দরবনের আয়তন ৬ হাজার ৫১৭ বর্গ কিলোমিটার। যার শতকরা ৮০ ভাগ স্থানে পর্যটকেরা প্রবেশ করতে পারেন না। বর্তমানে সুন্দরবনের প্রায় ৫৩ শতাংশ এলাকা অভয়ারণ্য এর অন্তর্ভুক্ত। ১৯৯৭ সালের ৬ ডিসেম্বর সুন্দরবনকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি দেয় ইউনেস্কো। সুন্দরবনে এখন ৩৩৪ প্রজাতির উদ্ভিদ, ১৬৫ প্রজাতির শৈবাল, ১৩ প্রজাতির অর্কিড এবং ৩৭৫ প্রজাতির বন্যপ্রাণী পাওয়া যায়। বন্যপ্রাণীর মধ্যে ৪২ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৩৫ প্রজাতির সরীসৃপ, ৮ প্রজাতির উভচর, ৩১৫ প্রজাতির পাখি, ২১০ প্রজাতির মাছ, ২৪ প্রজাতির চিংড়ি, ১৪ প্রজাতির কাঁকড়া আছে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button