সংসদ থেকে আবারও বিরোধী দলের ওয়াকআউট

জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল সংশোধন বিল পাশ
প্রবাহ রিপোর্ট : ‘গণবিরোধী’ বিল পাসের অভিযোগ তুলে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছে বিরোধীদল। বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) সন্ধ্যা ৬টার কিছুক্ষণ আগে বিরোধীদল ওয়াকআউট করেন। এনিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বিরোধীদল তৃতীয়বারের মত ওয়াকআউট করেছে বিরোধীদল। এসময় ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল সংসদের বৈঠকের সভাপতিত্ব করছিলেন।
ওয়াকআউটের আগে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দুঃখজনক হলেও সত্য বিরোধী দলের যৌক্তিক বাধা সত্ত্বেও যে কয়টি গণবিরোধী বিল আজকে পাস হয়েছে। আমরা তার দায় নিতে চাই না। এজন্য আমরা সংসদ থেকে ওয়াকআউট করছি। এ ঘোষণা দেওয়ার পরই ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে বিরোধী দলের সদস্যরা সংসদ কক্ষ ত্যাগ করেন।
ওয়াকআউট করার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন এনসিপির সদস্যসচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন। তিনি বলেন, আজকের দিন বিচারবিভাগের স্বাধীনতার জন্য বেদনাদায়ক দিন। আলোচনা কিছুটা করতে পারলেও সরকার দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে আইনটি রহিত করা হলো।
তিনি বলেন, যে আইনগুলো সরকারের ক্ষমতাকে বৃদ্ধি করতে পারে তারা কেবল সেগুলো পাস করছে। সরকারের এ দ্বিমুখী অবস্থান দেশের জন্য ভালো কিছু বয়ে আনতে পারে না। সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় একতরফা ভাবে আইন পাস করছে সরকার।
এদিকে, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী হিসেবে তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী ও নেজামে ইসলাম পার্টির নাম বহাল রেখে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) অধ্যাদেশকে সংশোধন করে আইনে রূপ দিতে বিল পাশ হয়েছে জাতীয় সংসদে। এতে জামায়াতের পক্ষ থেকে আপত্তি জানিয়ে দলটির আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বক্তব্য দেন। তবে তাদের জোটসঙ্গী জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) পক্ষ থেকে এই বিলের ওপর কোনো আপত্তি নেই বলে স্পিকারকে লিখিতভাবে জানানো হয়। বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) সংসদের বৈঠকে বিলটি উত্থাপন করেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান। পরে বিলটি কণ্ঠভোটে পাশ হয়।
বিরোধীদলীয় নেতা বিলের ওপর আপত্তি জানিয়ে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ বক্তব্য দিলেও বিলের কোন ধারায় তিনি সংশোধন চান, তা উল্লেখ করেননি। ফলে স্পিকার তার আপত্তির বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে ভোট দেননি।
অন্তর্র্বতী সরকারের আমলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টি হুবহু বিল আকারে উত্থাপনের জন্য সুপারিশ করেছে সংসদের বিশেষ কমিটি। বিশেষ কমিটির ওই প্রতিবেদনে নোট অব ডিসেন্ট (আপত্তি) জানিয়ে জামায়াতের এমপিরা বলেছিলেন, জামুকা অধ্যাদেশটি বর্তমান অবস্থায় কোনো পরিবর্তন ছাড়া পাশ হলে দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক দল মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলামের মতো দলগুলো পাকিস্তানের হিসেবে বিদ্যমান থেকে যাবে, যা কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়।
জামায়াতের এমপিরা এই অধ্যাদেশের ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ ও মুক্তিযুদ্ধের সংজ্ঞা পরিবর্তনের দাবি রাখেন। কমিটির প্রতিবেদনে জামায়াতের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, ২০০২ সালে খালেদা জিয়ার সরকারের আইনে দলগুলোকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী বলা হয়নি। রাজনৈতিক দলকে সশস্ত্র বাহিনী চিহ্নিত করা ফ্যাসিবাদী রাজনীতির সমর্থন।
অন্তর্র্বতী সরকারের আমলে জারি করা এই অধ্যাদেশে মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযোদ্ধা সহযোগী, মুক্তিযোদ্ধা পরিবার ও মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্যের সংজ্ঞা ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
জারি করা অধ্যাদেশে মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞায় বলা হয়, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন এবং যেসব ব্যক্তি যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য ভারতের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন এবং যারা স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে হানাদার ও দখলদার পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী এবং তাদের এ দেশীয় সহযোগী রাজাকার, আলবদর, আলশামস, মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম এবং দালাল ও শান্তি কমিটির বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন, এমন বেসামরিক নাগরিকেরা (ওই সময়ে যাদের বয়স সরকার নির্ধারিত সর্বনি¤œ বয়সের মধ্যে ছিল) মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাবেন। এর পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনী, মুক্তিবাহিনী, বিএলএফ ও অন্যান্য স্বীকৃত বাহিনী, পুলিশ বাহিনী, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর), নৌ কমান্ডো, কিলো ফোর্স ও আনসার সদস্যরাও বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গণ্য হবেন।
জারি করা অধ্যাদেশে ‘মুক্তিযুদ্ধ’-এর সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষায় হানাদার ও তাদের সহযোগী রাজাকার, আলবদর, আলশামস, তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম এবং দালাল ও শান্তি কমিটির বিরুদ্ধে পরিচালিত যুদ্ধ।
উল্লেখ, বৃহস্পতিবার সংসদ অধিবেশনে, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (রহিতকরণ ও পুন:প্রচলন) বিল, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) বিল এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ (রহিতকরণ) বিল; জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল বিল, জেলা পরিষদ বিল, পৌরসভা বিলসহ কয়েকটি বিলে আপত্তি দেয়। তবে তাদের আপত্তি থাকলেও কণ্ঠভোটে সবগুলো বিল পাস হয়।



