স্থানীয় সংবাদ

হাত ছাড়া হতে যাচ্ছে খুলনার নৌপরিবহন ব্যবসা : বাস্তবায়নে চলছে নানামুখী ষড়যন্ত্র

ব্যক্তি স্বার্থে বহিরাগত ব্যবসায়ীদের হাতে মোংলা বন্দরের পণ্যখালাশ কাজ তুলে দেওয়ার অপচেষ্টা

স্টাফ রিপোর্টার : হাত ছাড়া হতে যাচ্ছে খুলনার নৌপরিবহন ব্যবসা। চলছে নানামুখী ষড়যন্ত্র। হঠাৎ করে মোংলা বন্দরে পণ্য খালাশে চট্টগ্রাম, ঢাকা ও নওয়াপাড়ার ব্যবসায়ীদের যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে খুলনা বিভাগীয় অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন মালিক গ্রুপ। পণ্য খালাশের ক্যারিয়ার নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে সংগঠনটি। সেখানে ক্যারিয়ার হতে আবেদন করেছেন চট্টগ্রামভিত্তিক মাদার শিপিং, ঢাকার আকিজ গ্রুপের ডেইলী ট্রেডিং, থ্রী লাইট নেভিগেশন ও নওয়াপাড়া ১০টি প্রতিষ্ঠান। এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে খুলনার নৌপরিবহন ব্যবসায়ীরা কাজ পাবে না। আমদানিকারক ও বড় ব্যবসায়ীদের কাছে পাওনা প্রায় ১০০ কোটি টাকা আদায় করাও সম্ভব হবে না। একপর্যায়ে সবাই পথে বসে যাবে।
খুলনার ব্যবসায়ীরা জানান, প্রায় ৭৫ বছর ধরে মোংলা বন্দরে আসা জাহাজ থেকে পণ্য খালাশ এবং নৌযানে পরিবহন নিয়ন্ত্রণ করছেন বৃহত্তর খুলনার ব্যবসায়ীরা। এতে খুলনা অঞ্চলের নৌপরিবহন ব্যবসা নতুন রূপ পায়। শত শত মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়। এই খাতে এই অঞ্চলের ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগ কয়েকশ’ কোটি টাকারও বেশি।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বাইরের ব্যবসায়ীদের জন্য মোংলা বন্দর উন্মুক্ত করার ক্ষেত্রে অতি উৎসাহী ভূমিকা পালন করছেন হাফিজুর ইসলাম চন্দন নামের এক ব্যবসায়ী। মালিক গ্রুপের সভাপতিকে ভুল বুঝিয়ে মোটা অংকের অর্থের লেনদেনের মাধ্যমে বাইরের ব্যবসায়ীদের বন্দরের কাজে যুক্ত করতে চাইছেন তিনি। বর্তমানে নৌপরিবহন মালিক গ্রুপ তার কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে।
তারা জানান, ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর সৈয়দ জাহিদ হোসেনকে সভাপতি এবং মফিজুর রহমানকে মহাসচিব করে খুলনা নৌপরিবহন মালিক গ্রুপের ২০ সদস্যের পরিচালনা পরিষদ গঠন হয়। এবার চন্দন নির্বাচন করতে পারেননি। কিন্তু মালিক গ্রুপের সংঘ স্মারক (মেমোরেন্ডাম অব এ্যাসোসিয়েশন) বা গঠনতন্ত্র লঙ্ঘন করে লা সিরিয়াল প্রথা, সর্বনি¤œ দর ও বিলম্ব মাশুল বিষয়ক, ড্যামারেজ বিল যাচাই-বাছাই চার্জ নিষ্পত্তি বিষয়ক উপ-কমিটিতে আহ্বায়ক করা হয়েছে হাফিজুল ইসলাম চন্দনকে। নির্বাচিত না হয়েও নির্বাহী কমিটির বৈঠকে অংশগ্রহণ করছেন তিনি। মালিক গ্রুপের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কক্ষে দুইজনের মাঝে তার জন্য চেয়ার-টেবিল বসানো হয়েছে। মালিক গ্রুপের অর্ধশত বছরের ইতিহাসে এমন ঘটনা ঘটনা ঘটেনি। দেশের কোনো সংগঠনেই সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মাঝে অনির্বাচিত কারও চেয়ার থাকার নজির নেই।
মালিক গ্রুপ থেকে জানা গেছে, মোংলা বন্দরে জাহাজ থেকে পণ্য খালাশে জড়িত ছিলেন ১২ জন ক্যারিয়ার। জাহাজ কমে যাওয়াসহ নানা সংকটের কারণে বর্তমানে ব্যবসায় টিকে আছেন ৬/৭ জন। নৌপরিবহন মালিক গ্রুপের ১৫৩ জন সদস্যের কার্গো ও লাইটার জাহাজ ভাড়া নিয়ে তারা পণ্য পরিবহন করেন।
সূত্রটি জানায়, গত ডিসেম্বর মাস থেকেই ঢাকা, চট্টগ্রাম ও নওয়াপাড়ার ব্যবসায়ীরা মোংলা বন্দরে সরাসরি পণ্য খালাশে যুক্ত হতে তৎপরতা শুরু করেন হাফিজুল ইসলাম চন্দন। তার সঙ্গে নির্বাহী কমিটির কয়েকজনও রয়েছে। গত ৩ মার্চ ক্যারিয়ার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। ৩১ মার্চ পর্যন্ত ২৮ জন ব্যবসায়ী ক্যারিয়ার হতে আবেদন করেন। এর মধ্যে চট্টগ্রামভিত্তিক মাদার শিপিং, ঢাকার আকিজ গ্রুপের ডেইলী ট্রেডিং, থ্রী লাইট নেভিগেশন, মালিক গ্রুপের বর্তমান মহাসচিবের ছেলের ঈশা ট্রেডার্স, কমিশন এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও মদিনা গ্রুপের মাহাবুব আলমের সোনার বাংলা এবং নওয়াপাড়া ১০টি প্রতিষ্ঠান আবেদন করেছেন।
ব্যবসায়ীরা বলেন, নব্বইয়ের দশকেও মোংলা থেকে খুলনা নদী বন্দর ও রুজভেল্ট জেটিকে কেন্দ্র করেই নৌপরিবহন ব্যবসা সম্প্রসারিত হয়। তখন পুরো ঘাট এলাকার অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল রমরমা। এরশাদ শিকদারের অত্যাচারের কারণে ব্যবসায়ীরা খুলনা থেকে মুখ ফিরিয়ে নওয়াপাড়ায় শিপিং ব্যবসা সরিয়ে নিতে থাকেন। তারপরও খুলনার বিচক্ষণ নেতাদের কারণে পণ্য খালাশের নিয়ন্ত্রণ খুলনার ব্যবসায়ীদের হাতে ছিল। এখন সেই ব্যবসা নওয়াপাড়া, ঢাকা ও চট্টগ্রামের আমদানিকারকদের হাতে তুলে দেওয়া হলে পুরো খাতই ধংস হয়ে যাবে। ধুকে ধুকে যে সব কার্গো মালিকও পথে বসে যাবে। নৌপরিবহন ব্যবসায়ীদের সজাগ থাকার অনুরোধ জানিয়েছেন তারা।
নৌ-পরিবহন মালিক গ্রুপের মহাসচিব মোঃ মফিজুর রহমান বলেন, গঠনতন্ত্র মেনেই চন্দনকে উপ-কমিটির আহবায়ক করা হয়েছে। ব্যবসার স্বার্থে তাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সবার সুবিধার জন্য নতুন ক্যারিয়ার নিয়োগের চেষ্টা চলছে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button