যুদ্ধবিরতি মধ্যেই হরমুজ প্রণালিতে ইরান ও মার্কিন নৌবাহিনী সংঘর্ষ

যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব খতিয়ে দেখছে ইরান
অবরোধ সত্ত্বেও টিকে থাকতে পারবে ইরান : সিআইএ’র মূল্যায়ন
প্রবাহ ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে পাঠানো সাম্প্রতিক প্রস্তাবটি ইরান এখনও পর্যালোচনা করছে এবং এর বিপরীতে নিজেদের প্রতিক্রিয়া বিবেচনা করছে বলে জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই। শুক্রবার (৮ ম) ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজ এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
বাঘাই জানান, তেহরান অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে প্রস্তাবটি খতিয়ে দেখছে এবং যথাযথ আলোচনার পরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।
একই সঙ্গে গত রাতে মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে ঘটে যাওয়া সামরিক সংঘাতের বিষয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বাঘাই। তিনি ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি চুক্তি এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের প্রকাশ্য অভিযোগ আনেন। তার মতে, গত রাতের এই ঘটনা কেবল উস্কানিমূলক নয়, বরং এটি বৈশ্বিক আইন কাঠামোর চরম অবমাননা।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই মুখপাত্র আরও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। যেকোনো ধরনের আগ্রাসন বা হঠকারিতার দাঁতভাঙা জবাব দিতে তারা সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।
বাঘাইয়ের এই মন্তব্য এবং ওয়াশিংটনের প্রতি কঠোর অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিতিশীল রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে, চলতি সপ্তাহে হোয়াইট হাউসে ইরান যুদ্ধ নিয়ে একটি গোপন মূল্যায়ন প্রতিবেদন জমা দিয়েছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ। সেখানে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের সত্ত্বেও ইরান অন্তত তিন থেকে চার মাস টিকে থাকতে পারবে এবং এরপরই কেবল গুরুতর অর্থনৈতিক সংকটে পড়বে। এছাড়া প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে যেমনটা দাবি করেছেন, তার চেয়ে ইরানের সামরিক শক্তি অনেক বেশি রয়ে গেছে। বৃহস্পতিবার (৭ মে) প্রকাশিত মার্কিন গণমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সিআইএর গোপন মূল্যায়ন প্রতিবেদনটি সম্পর্কে অবগত অন্তত চারজন ব্যক্তি নিশ্চিত করেছেন, মূল্যায়নে দেখা গেছে ইরানের যুদ্ধ-পূর্ব মোবাইল ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চারের প্রায় ৭৫ শতাংশ এখনও অক্ষত আছে।
একইভাবে তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতের প্রায় ৭০ শতাংশও এখনও রয়েছে। অথচ গত বুধবারই (৬ মে) ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি ‘প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে’ এবং তা নেমে এসেছে ‘১৮-১৯ শতাংশে’।
সিআইএ আরও জানিয়েছে, যেসব ভূগর্ভস্থ অস্ত্রভা-ারের প্রবেশপথে বোমা হামলা হয়েছিল, তার প্রায় সবই ইরান আবার চালু করেছে। ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষেপণাস্ত্র মেরামত করা হয়েছে এবং যুদ্ধ শুরুর আগে প্রায় প্রস্তুত অবস্থায় থাকা যন্ত্রাংশ থেকে নতুন ক্ষেপণাস্ত্রও তৈরি করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বরাবরই প্রশাসনের সরকারি বক্তব্যের তুলনায় বেশি সতর্ক ও বাস্তবধর্মী চিত্র তুলে ধরেছে। ট্রাম্প, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এই যুদ্ধকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘বড় সামরিক বিজয়’ হিসেবে তুলে ধরেছেন এবং অবরোধকে ইরানের অর্থনীতির জন্য ‘চূড়ান্ত শ্বাসরোধ’ বলে দাবি করেছেন। কিন্তু সিআইএর গোপন বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই দুই দাবির কোনোটিই পুরোপুরি সঠিক নয়।
ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, এই অবরোধের কারণে ইরান প্রতিদিন ৫০ কোটি ডলারের তেল রফতানি আয় হারাচ্ছে। তবে সিআইএর মতে, ইরান স্থলপথে তেল পাচারের মাধ্যমে সেই ক্ষতির কিছুটা পুষিয়ে নিতে পারে। ফলে তিন থেকে চার মাস টিকে থাকার যে হিসাব দেয়া হয়েছে, বাস্তবে সেটি আরও দীর্ঘ হতে পারে।
একজন মার্কিন কর্মকর্তা ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেছেন, ইরানের অর্থনৈতিক চাপ সহ্য করার ক্ষমতা সিআইএ’র ধারণার চেয়েও বেশি হতে পারে।
তিনি বলেন, ‘ইরানের নেতৃত্ব এখন আরও বেশি কঠোর, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে। তারা বিশ্বাস করে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ধৈর্যকে হার মানাতে পারবে এবং দেশের ভেতরে যেকোনো প্রতিরোধ কঠোরভাবে দমন করতে সক্ষম হবে।’
সিআইএ আরও উল্লেখ করেছে, ইরান আবার বড় পরিমাণে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন শুরু করতে যে সময় লাগবে, তা এখন আগের চেয়ে কমে এসেছে। ফলে ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অর্থবহ কোনো সমঝোতায় পৌঁছানোর সুযোগের সময়ও দ্রুত সংকুচিত হয়ে আসছে।
উল্লেখ্য-গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরুর পরই পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয় ইরান। সেই থেকে প্রণালীটি কার্যত অবরুদ্ধ রয়েছে, যেখান দিয়ে সাধারণত বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন করা হয়।
গত ১৩ এপ্রিল থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ শুরু করে। এই নৌ অবরোধের আওতায় সমুদ্রে ইরানগামী বা ইরান থেকে পণ্যবাহী জাহাজগুলোকে দিক পরিবর্তন করতেও বাধ্য করা হচ্ছে। যা এখনও অব্যাহত রয়েছে। ইরানের সশস্ত্র বাহিনী এসব পদক্ষেপকে ‘অবৈধ’ ও ‘দস্যুতা’ হিসেবে অভিহিত করেছে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর মধ্যে আবারো সংঘর্ষ : যুদ্ধবিরতি চলা সত্ত্বেও হরমুজ প্রণালিতে ইরান ও মার্কিন নৌবাহিনীর মধ্যে নতুন করে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। গত রাতের হামলা-পাল্টা হামলার পর আজ আবারো দুই পক্ষের মধ্যে এই সংঘাতের সূত্রপাত হয়।
ইরানি বার্তা সংস্থা ফারস জানিয়েছে, “গত এক ঘণ্টা ধরে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী এবং মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোর মধ্যে বিচ্ছিন্নভাবে সংঘর্ষ হয়েছে।”
গত এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি এই ঘটনার ফলে বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়েছে। ইরান অভিযোগ করেছে, মার্কিন বাহিনী তাদের বেসামরিক ট্যাঙ্কারে হামলা চালিয়ে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে।
গত রাতেই মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছিল যে, হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন যুদ্ধজাহাজে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জবাবে তারা ইরানের কয়েকটি সামরিক অবস্থানে পাল্টা হামলা চালিয়েছে।
এদিকে, এই ঘটনায় প্রতিক্রিয়ায় এক কড়া বার্তায় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, কোনো ধরনের চাপের কাছে ইরান মাথানত করবে না।
শুক্রবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে আরাঘচি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, মার্কিন এই আচরণ কি কেবলই কোনো সস্তা চাপের কৌশল, নাকি কোনো তৃতীয় পক্ষ আবারো মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ভুল বুঝিয়ে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
আরাঘচি বলেন, “প্রতিবার যখনই কোনো কূটনৈতিক সমাধানের পথ তৈরি হয়, তখনই যুক্তরাষ্ট্র হঠকারী সামরিক অভিযানের পথ বেছে নেয়।”
তিনি দাবি করেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত এবং তা উৎক্ষেপণের সক্ষমতা যুদ্ধপূর্ব সময়ের তুলনায় বর্তমানে ‘১২০ শতাংশে’ পৌঁছেছে। নিজের দাবির সপক্ষে তিনি একটি মার্কিন সংবাদপত্রের প্রতিবেদনের স্ক্রিনশট যুক্ত করেন, যেখানে বলা হয়েছে-সিআইএ দেখেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বোমাবর্ষণের পরও ইরান আগের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি অস্ত্রশস্ত্র অক্ষত রাখতে সক্ষম হয়েছে।
এই সংঘর্ষ এমন এক সময়ে ঘটল যখন ওয়াশিংটন যুদ্ধ বন্ধের লক্ষে ইরানের চূড়ান্ত উত্তরের অপেক্ষায় আছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, আজ শুক্রবারের মধ্যেই তেহরানের কাছ থেকে একটি জবাব পাওয়ার আশা করছেন তারা।



