এআই-এর বিরুদ্ধে হত্যা মামলার অভিযোগ! ফ্লোরিডার নতুন আইনি বিতর্ক

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে ঘটে যাওয়া দুটি আলোচিত হত্যাকা-ের তদন্তে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চ্যাটবট চ্যাটজিপিটির নাম উঠে আসার পর নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। তদন্তকারীদের দাবি, দুই ঘটনার অভিযুক্তরা অপরাধ সংঘটনের আগে চ্যাটজিপিটির কাছে বিভিন্ন পরামর্শ ও তথ্য জানতে চেয়েছিলেন। এরপর থেকেই প্রশ্ন উঠছে, কোনো এআই প্ল্যাটফর্ম কি অপরাধে সহায়তার দায়ে আইনি জটিলতায় পড়তে পারে? গত বছর ফ্লোরিডা স্টেট ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে গুলি চালিয়ে দুজনকে হত্যা এবং আরও ছয়জনকে আহত করার অভিযোগ ওঠে ২০ বছর বয়সী ফিনিক্স আইকনারের বিরুদ্ধে। তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, হামলার আগে তিনি চ্যাটজিপিটির সঙ্গে দীর্ঘ কথোপকথন করেছিলেন। সেখানে তিনি জানতে চেয়েছিলেন, কোন অস্ত্র ও গুলি সবচেয়ে কার্যকর হতে পারে এবং কীভাবে বেশি প্রাণহানি ঘটানো সম্ভব। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, চ্যাটজিপিটি তার প্রশ্নগুলোর উত্তর দিয়েছিল। সম্প্রতি ফ্লোরিডার টাম্পা বে এলাকায় ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার বাংলাদেশি দুই পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির হত্যাকা-েও চ্যাটজিপিটির নাম সামনে আসে। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া সন্দেহভাজন হিশাম আবুঘরবেহ, যিনি লিমনের রুমমেট ছিলেন, হত্যার আগে চ্যাটজিপিটির কাছে মরদেহ গোপন ও সরানোর উপায় নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন করেছিলেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। তদন্তকারীরা বলছেন, সেই অনুসন্ধানের সূত্র ধরেই পরে মরদেহ উদ্ধারে অগ্রগতি আসে। এই ঘটনাগুলোর পর ফ্লোরিডার অ্যাটর্নি জেনারেল জেমস উথমিয়ার ওপেনএআইয়ের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য ফৌজদারি তদন্তের ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেন, “স্ক্রিনের অন্য পাশে যদি একজন মানুষ থাকতেন, তাহলে আমরা তাঁর বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ আনতাম।” তাঁর দপ্তর এখন খতিয়ে দেখছে, চ্যাটজিপিটির মাধ্যমে দেওয়া তথ্য কোনো অপরাধ সংঘটনে সহায়তা করেছে কি না এবং সে ক্ষেত্রে ওপেনএআইয়ের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে কি না। যুক্তরাষ্ট্রের আইনে করপোরেট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করার নজির রয়েছে। অতীতে ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান পারডিউ ফার্মা, গাড়ি নির্মাতা ফক্সভাগেন, ওষুধ কোম্পানি ফাইজার এবং জ্বালানি প্রতিষ্ঠান এক্সনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপরাধ ও অবহেলার অভিযোগে মামলা হয়েছে। তবে আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এআই প্রযুক্তিকে ঘিরে এমন অভিযোগ একেবারেই নতুন এবং এর আইনি ভিত্তি এখনো স্পষ্ট নয়। ইউনিভার্সিটি অব ইউটাহর আইন বিভাগের অধ্যাপক ম্যাথিউ টোকসনের মতে, এই মামলাগুলোকে জটিল করে তুলেছে এআই প্রযুক্তির প্রকৃতি। তাঁর ভাষায়, “এটি এমন একটি পণ্য, যা অপরাধ সংঘটনে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে বলে অভিযোগ উঠেছে।” তিনি বলেন, মূল প্রশ্ন হচ্ছেÑচ্যাটবটটি কি কেবল ব্যবহারকারীর ইনপুট অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয় উত্তর দিয়েছে, নাকি বিপজ্জনক ব্যবহারের ঝুঁকি জেনেও যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়নি। আইন বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ওপেনএআইয়ের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য অভিযোগ হতে পারে অবহেলা বা বেপরোয়া আচরণের। অর্থাৎ, যদি প্রমাণ হয় যে প্রতিষ্ঠানটি ক্ষতিকর ব্যবহারের ঝুঁকি সম্পর্কে জানত কিন্তু তা প্রতিরোধে যথেষ্ট পদক্ষেপ নেয়নি, তাহলে আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে। তবে এসব অভিযোগ সাধারণত হত্যার মতো গুরুতর অপরাধের পর্যায়ে পড়ে না। এদিকে ওপেনএআই এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, চ্যাটজিপিটি কোনো সহিংস ঘটনার জন্য দায়ী নয়। কোম্পানির দাবি, ক্ষতিকর বা অপরাধমূলক উদ্দেশ্য শনাক্ত ও প্রতিরোধে তারা নিয়মিতভাবে নিরাপত্তাব্যবস্থা উন্নত করছে। সহিংসতা, আত্মহানি বা বেআইনি কর্মকা- সম্পর্কিত অনুরোধ সীমিত করার জন্য চ্যাটজিপিটিতে একাধিক সুরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে বলেও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিতর্ক ভবিষ্যতে এআই প্রযুক্তির দায়বদ্ধতা নিয়ে বৈশ্বিক আলোচনাকে আরও তীব্র করবে। একই সঙ্গে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর দায়িত্ব, ব্যবহারকারীর আচরণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সীমারেখা নিয়ে নতুন আইনি ও নৈতিক প্রশ্ন সামনে আনবে। এ ব্যাপারে এআই (চ্যাটজিপিটি) জানায়, “কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চ্যাটবট একটি সফটওয়্যার টুলÑএটি নিজে কোনো সিদ্ধান্ত নেয় না বা অপরাধ সংঘটনের ইচ্ছা পোষণ করে না। তবে যদি কোনো এআই প্ল্যাটফর্ম বিপজ্জনক বা সহিংস তথ্য প্রতিরোধে যথেষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সেই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতা নিয়ে আইনি প্রশ্ন উঠতে পারে।
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে এআই প্রযুক্তি নিয়ে সবচেয়ে বড় বিতর্ক হলোÑব্যবহারকারীর অপরাধমূলক আচরণের জন্য কতটা দায় ব্যবহারকারীর, আর কতটা দায় প্রযুক্তি নির্মাতার। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের মামলা ভবিষ্যতে এআই ব্যবস্থার নিরাপত্তা, নৈতিকতা ও আইনি কাঠামো নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ নজির তৈরি করতে পারে।” তথ্যসূত্র : এএফপি।



