ইউনূস সরকারের আমলেও ছিল টিকা : যে কারণে দেওয়া হয়নি

# টিকার ক্যাম্পেইন বন্ধ ৬ বছর
# টাইফয়েড ক্যাম্পেইন, জাতীয় নির্বাচন এবং পদোন্নতিসহ বিভিন্ন দাবিতে ডিসেম্বর মাসজুড়ে মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্য সহকারীদের কর্মবিরতি ও আন্দোলনের কারণে হামের বিশেষ ক্যাম্পেইনটি বারবার পিছিয়ে যায় #
প্রবাহ রিপোর্ট ঃ দেশে হামে আক্রান্ত হয়ে এখন পর্যন্ত ৪১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্তের হারও ইতোমধ্যে ৫৬ জেলায় ছড়িয়েছে। হঠাৎ দেশব্যাপী হামে আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনায় কারও দায় আছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে সরকার। ইতোমধ্যে কোনো অবহেলার কারণে এতজন শিশুর প্রাণ ঝরল কি না তা খতিয়ে দেখার জন্য একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে মন্ত্রণালয়। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, করোনা মহামারিজনিত টিকাদান কার্যক্রমে বিঘœ, বিগত পাঁচ বছর ধরে ক্যাম্পেইন না হওয়া, গত বছর স্বাস্থ্য সহকারীদের নানা দাবিতে টিকা কার্যক্রম বন্ধ রেখে আন্দোলন, ভিটামিন এ ক্যাপসুল ক্যাম্পেইন না হওয়ার কারণেই দেশে হামের আউটব্রেক (প্রাদুর্ভাব) হয়েছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে ইপিআইতে ক্যাম্পেইনের জন্য আসা টিকা দিয়ে যদি তাৎক্ষণিক ক্যাম্পেইন করা যেত তাহলে হয়তো আউটব্রেক থেকে রক্ষা পাওয়া যেত। দেশে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে, যাতে আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত ৪১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং সংক্রমণ ৫৬ জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। হঠাৎ এই মৃত্যুর মিছিলের কারণ ও কারও অবহেলা আছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘ ৫ বছর ধরে জাতীয় টিকাদান ক্যাম্পেইন না হওয়াকে এই আউটব্রেকের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন নাম প্রকাশ না করার শর্তে টিকা সংশ্লিষ্ট একাধিক ইপিআই কর্মকর্তা জানান, অন্যান্য টিকার বিভিন্ন সময়ে ঘাটতি থাকলেও হামের এমআর টিকার কখনও ঘাটতি হয়নি। প্রতি তিন মাস অন্তর চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন জেলায় টিকা সরবরাহ করা হতো। অনেক জেলায় আগে পাঠানো টিকা অবশিষ্ট থাকার কারণে তারা গত তিন মাসে তেমন চাহিদা দেয়নি। এমনকি বর্তমানে চলমান ক্যাম্পেইনের টিকাও গত সেপ্টেম্বরে ইপিআইয়ের কেন্দ্রীয় গুদামে এসে পৌঁছে। টিকা আসার পরপরই একাধিকবার ক্যাম্পেইনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেটা বিভিন্ন কারণে আলোর মুখ দেখেনি। এসব কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে তারা বলেন, পূর্বঘোষিত টাইফয়েডের টিকা ক্যাম্পেইন, স্বাস্থ্য সহকারীদের ডিসেম্বর মাসজুড়ে আন্দোলন এবং জাতীয় নির্বাচনের কারণে ক্যাম্পেইনের তারিখ বারবার পিছিয়ে যায়। ইউনিসেফের মতে, হামের বিস্তার বাড়ার অন্যতম কারণ হলো সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পর্যাপ্ত সংখ্যক শিশুর টিকা গ্রহণ না করা। গত কয়েক বছর ধরে তৈরি হওয়া এই রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতিই সাম্প্রতিক হামের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। এছাড়া, অভিভাবকদের মধ্যে টিকা নিয়ে ভুল তথ্য বিরাজ করায় টিকাদানের হার কমেছে এবং হামের বিস্তার সহজ হয়েছে বলে দাবি ইউনিসেফের। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও ইপিআই কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশে হামের (এমআর) টিকার কোনো ঘাটতি ছিল না। এমনকি বর্তমান ক্যাম্পেইনের টিকাও গত বছরের সেপ্টেম্বরে দেশে এসেছিল। কিন্তু টাইফয়েড ক্যাম্পেইন, জাতীয় নির্বাচন এবং পদোন্নতিসহ বিভিন্ন দাবিতে ডিসেম্বর মাসজুড়ে মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্য সহকারীদের কর্মবিরতি ও আন্দোলনের কারণে হামের বিশেষ ক্যাম্পেইনটি বারবার পিছিয়ে যায়, যা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। নিয়মিত টিকা কার্যক্রমে ঘাটতি ঃ সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) মাধ্যমে পরিচালিত হওয়া নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে দেশের ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় নিয়ে আসতে পারলে দেশে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হয়। ২০২৩ সালের কভারেজ মূল্যায়ন সমীক্ষা অনুসারে, এমআর১ (টিকার প্রথম ডোজ)-এর কভারেজ ২০১৯ সালের ৮৮.৬ শতাংশ থেকে সামান্য কমে ৮৬ শতাংশে দাঁড়ায়। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো এমআর২ (টিকার দ্বিতীয় ডোজ)-এর কভারেজের পতন, যা ২০১৯ সালের ৮৯ শতাংশ থেকে কমে ২০২৩ সালে ৮০.৭ শতাংশে নেমে এসেছে। ফলে, প্রায় এক কোটি শিশু (এমআর১-এর জন্য) এবং দুই কোটি শিশু (এমআর২-এর জন্য) হামের সংক্রমণের ঝুঁকিতে রয়েছে। বিগত কয়েক বছরে জমা হওয়া এই ক্রমবর্ধমান রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতি, হামের ঘটনা বাড়ার পেছনে সাম্প্রতিককালে ভূমিকা রেখেছে। এদিকে, সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) সূত্রে জানা যায়, বিগত বছরগুলোতে রুটিন হামের টিকা কভারেজ অনেক বেশি ছিল। ২০২৪ সালে রুটিন এমআর টিকার হার ছিল ৯৮ দশমিক ৯ শতাংশ। ২০২৩ সালে ৯৭ দশমিক ৩ শতাংশ, ২০২২ সালে ৯৩ দশমিক ৮ শতাংশ এবং ২০২১ সালে ৯৯ দশমিক ৭ শতাংশ কভারেজ ছিল। চলতি বছরের মার্চ মাসে ইপিআইয়ের ওয়েবসাইটে ২০২৫ সালে টিকার কভারেজ ৫৯ শতাংশ দেখানো হয় (পরে এই তথ্য ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে ফেলা হয়)। ঢাকা পোস্টের হাতে আসা এক নথি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৫ সালে দেশব্যাপী টিকা কাভারেজের হার অন্যান্য বছরের মতোই চলতি বছরও প্রথম ১১ মাসে মাঠ পর্যায়ে এমআর১ টিকার কাভারেজ হয়েছে ৯৭ দশমিক ৯৬ শতাংশ ও এমআর২-এর কাভারেজ হয়েছে ৯৫ দশমিক ৬৭ শতাংশ। কিন্তু ডিসেম্বর মাসে এমআর১ কাভারেজ হয়েছে ২৭ দশমিক ৭৬ শতাংশ এবং এমআর-২ কাভারেজ হয়েছে ২৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে (রুটিন ইপিআই) গত কয়েক বছরে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে হামের প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজের কভারেজ উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত টিকা থেকে বাদ পড়া এবং গত এক বছর ধরে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল ক্যাম্পেইন বন্ধ থাকায় শিশুদের অপুষ্টি ও নিউমোনিয়ার ঝুঁকি বেড়েছে, যার ফলে হামে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার এত ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ক্যাম্পেইন বন্ধ ৬ বছর ঃ নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি থেকে যেসব শিশু বাদ পড়ে, তাদের জাতীয় ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে টিকার আওতায় আনা হয়। সর্বশেষ ক্যাম্পেইন শুরু হয়েছিল ২০২০ সালের ডিসেম্বরে। শেষ হয় ২০২১ সালের জানুয়ারিতে। পরবর্তী ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা ছিল ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে। তারপর তারিখ পরিবর্তন করে নেওয়া হয় সেপ্টেম্বরে; কিন্তু টাইফয়েডের টিকা ক্যাম্পেইনের কারণে তা আবার পেছানো হয়। তা পরিবর্তন করে নেওয়া হয় ডিসেম্বরে; এ সময় দেশব্যাপী স্বাস্থ্য সহকারীদের আন্দোলনের কারণে তখনও তা দেওয়া সম্ভব হয়নি। এরপর চলে আসে নির্বাচন। সেই ক্যাম্পেইন চলতি বছরের ২০ এপ্রিল শুরু হয়েছে। ক্যাম্পেইন শুরুর আগেই সারা দেশে হাম ছড়িয়ে পড়েছে।



