সম্পাদকীয়

বিনিয়োগের পরিবেশ প্রয়োজন

# দেশের পুঁজিবাজারে মন্দা #

দেশের অর্থনীতি রীতিমতো বিপর্যস্ত। নতুন বিনিয়োগ নেই বললেই চলে। ফলে নতুন কর্মসংস্থানও সেভাবে হচ্ছে না, অথচ প্রতিনিয়ত বেড়ে চলেছে কর্মক্ষম জনসংখ্যা। চালু শিল্প-কারখানাগুলোও ধুঁকছে। বহু কারখানা এরই মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। লাখ লাখ শ্রমিক চাকরি হারাচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে চলা মূল্যস্ফীতি না কমে আরো বাড়ছে। মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে কমছে ভোক্তার চাহিদা। কমছে উৎপাদনও। আর এই সামগ্রিক নেতিবাচকতার প্রভাব পড়ছে দেশের পুঁজিবাজারে। দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, সামগ্রিক পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরা আস্থা হারাচ্ছে। ফলে পুঁজিবাজারে বিরাজ করছে মন্দাভাব। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে পুঁজিবাজার থেকে বিনিয়োগ তুলে নিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়বে। চলতি অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে বিভিন্ন কম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তালিকাভুক্ত ৫৪টি কম্পানি নতুন করে লোকসানে পড়েছে। ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে অবনমন হওয়া কম্পানির সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়েছে, যা বাজারের মোট কম্পানির ২৫ শতাংশ। এমনকি নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে পরিচিত ব্যাংক খাতও এখন লভ্যাংশ দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। এক সময়ের ভালো মৌলভিত্তির কম্পানিও একের পর এক ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নেমে যাচ্ছে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, ‘দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি বর্তমানে এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, যার সরাসরি এবং নেতিবাচক প্রভাব আমরা পুঁজিবাজারে লক্ষ করছি। বেশ কয়েক বছর ধরেই দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে এক ধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা প্রতিকূল ফ্যাক্টর, যা শিল্প উৎপাদন থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকটে থাকা পুঁজিবাজার মূলত অর্থনীতির আয়না। ফলে সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলো যতক্ষণ পর্যন্ত ইতিবাচক ধারায় না ফিরবে, ততক্ষণ বাজার থেকে ভালো কিছু আশা করা কঠিন।’ উদ্যোক্তা ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈশ্বিক অস্থিরতার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ অনেক প্রতিকূলতা রয়েছে, যেগুলো মোকাবেলা করে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো লাভজনকভাবে চালানো যাচ্ছে না। উৎপাদনমুখীম প্রতিষ্ঠানগুলো জানিয়েছে, এসব চাপের কারণে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, যা ব্যাবসায়িক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। উচ্চ সুদহার, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ-পরবর্তী জ্বালানিসংকট ও গ্যাসসংকটে ৩০ শতাংশের বেশি কমেছে উৎপাদন। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে বাজার চাহিদা কমে যাওয়ায় বিক্রিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ও আইসিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, “উচ্চ সুদের হার, উৎপাদন ও চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে দেশের বেসরকারি খাতে ব্যবসা-বাণিজ্য বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। এর প্রভাব এখন বহুজাতিক কম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদনেও স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। অনেক কম্পানি লোকসানে পড়েছে, আবার অনেককে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নামতে হয়েছে। যেসব কম্পানি এখনো প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পেরেছে, তাদেরও মুনাফা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।” ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পুঁজিবাজারে সবচেয়ে বেশি লভ্যাংশ প্রদানকারী খাত হচ্ছে ব্যাংক ও লিজিং কম্পানি। কিন্তু বর্তমানে এই দুই খাতই সবচেয়ে বেশি সংকটের মধ্যে রয়েছে।’ আমরা মনে করি, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের স্থবিরতা দ্রুত কাটিয়ে উঠতে হবে। ব্যাংকঋণের সুদের হার কমিয়ে এনে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়াতে হবে। গ্যাস, বিদ্যুৎসহ জ্বালানির সরবরাহ বাড়িয়ে উৎপাদনের স্বাভাবিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button