খুলনায় পাঁচ দফা ‘সবুজ সুন্দরবন’ ঘোষণা

বন রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ পদক্ষেপ প্রত্যাশা বিশেষজ্ঞদের
শেষ হলো দুইদিনব্যাপী সুন্দরবন সামিট
স্টাফ রিপোর্টার : সুন্দরবন বাংলাদেশের উপকূলকে যেমন জলবায়ু জনিত নানান দুর্যোগ থেকে রক্ষা করছে একইভাবে কার্বন নিঃসরণ করে জলবায়ু পরিবর্তন রুখে দিচ্ছে। কিন্তু নানান বিধ্বংসী কার্যক্রম এই সুন্দরবনকেও ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে সুন্দরবন রক্ষায় দেশ ও বিশ্ববাসীকে সোচ্চার হওয়ার ওপর গরুত্বারোপ এবং ঐক্যবদ্ধ পদক্ষেপ চেয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এ বিষয়ে পাঁচ দফা সুন্দরবন ঘোষণা করা হয়েছে। শুক্রবার (আজ ২২ মে) খুলনায় খুলনায় অনুষ্ঠিত দু’দিন ব্যাপী ‘সুন্দরবন সামিট ২০২৬’-এর সমাপনী অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে এ ঘোষণাপত্রটি গৃহীত হয়। সন্ধ্যায় মিট দ্যা প্রেস অনুষ্ঠানে ঘোষণাপত্রটি প্রকাশ করা হয়।
যুক্তরাজ্য সরকারের অর্থায়নে এবং কেয়ার বাংলাদেশ-এর নেতৃত্বে পরিচালিত ‘নবপল্লব’ প্রকল্পের সহায়তায়—মিশন গ্রিন বাংলাদেশ, সাজিদা ফাউন্ডেশন, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সি৩ইআর এবং স্বপ্নপুরী কল্যাণ সংস্থার যৌথ উদ্যোগে এ সামিটের আয়োজন করা হয়।
মিট দ্যা প্রেসে আয়োজক সংস্থা মিশন গ্রিন বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ও সুন্দরবন সামিটের আহবায়ক আহসান রনি বলেন, সুন্দরবন কেবল একটি ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য স্থান বা জীববৈচিত্র্যের আধারই নয়, এটি আমাদের অস্তিত্বের অবিনশ্বর প্রাকৃতিক ঢাল। উপকূলীয় অঞ্চলের ১৫ মিলিয়নেরও বেশি মানুষের জীবন ও সম্পদকে বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড় এবং জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষা করতে সুন্দরবনের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তা সত্ত্বেও জলবায়ু পরিবর্তন, ক্রমবর্ধমান লোনা পানির অনুপ্রবেশ, পরিবেশগত দূষণ, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস এবং মানব-বন্যপ্রাণী দ্বন্দ্বের কারণে এই অমূল্য বাস্তুসংস্থান আজ চরম সংকটে। এ অবস্থায় কেবল সচেতনতা নয়, বরং মাঠপর্যায়ে সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের শপথ নিয়ে প্রথাগত লোকজ জ্ঞান এবং আধুনিক সবুজ উদ্ভাবনের সমন্বয়ে সুন্দরবন সুরক্ষার লক্ষ্যে ৫টি মূল স্তম্ভের ভিত্তিতে পাঁচ দফা অঙ্গীকার ঘোষণা করা হয়।
সুন্দরবন ঘোষণা’র পঁপচ দফার মধ্যে রয়েছে- প্রাকৃতিক সুরক্ষা ঢালকে শক্তিশালীকরণ : এর মধ্যে সুন্দরবনের বাফার জোনে (পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা বা ইসিএ) সকল প্রকার অবৈধ বন উজাড়, শিল্পকারখানার দূষণ এবং পরিবেশবিরোধী কার্যক্রম কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। উপকূলীয় ক্ষয়রোধ এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় স্থানীয় প্রজাতির ম্যানগ্রোভ বনের পুনর্বনয়ন এবং প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধান জোরদার করতে হবে।
টেকসই জীবিকা ও প্রথাগত লোকজ জ্ঞানের সুরক্ষা : এর মধ্যে রয়েছে- সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল ঐতিহ্যবাহী পেশাজীবী—যেমন মৌয়াল, বাওয়াল ও জেলে সম্প্রদায়ের বংশপরম্পরায় অর্জিত লোকজ জ্ঞানকে জাতীয় বন সংরক্ষণ নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বনের ওপর সরাসরি নির্ভরশীলতা ও চাপ কমাতে উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জন্য জলবায়ু-সহনশীল বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরি এবং সুন্দরবনের খাঁটি মধু ও হস্তশিল্পের টেকসই সমবায়-ভিত্তিক ব্র্যান্ডিং গড়ে তুলতে হবে।
তরুণদের নেতৃত্ব ও সবুজ উদ্ভাবন : এর মধ্যে মাঠপর্যায়ে পরিবেশগত নজরদারি ও জলবায়ু নীতি বাস্তবায়নে কাজ করার জন্য দেশব্যাপী “সুন্দরবন ইয়ুথ চ্যাম্পিয়নস” নেটওয়ার্ককে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হবে। ‘সুন্দরবন ইনোভেশন চ্যালেঞ্জ’ থেকে উঠে আসা প্রযুক্তি-বান্ধব ও জলবায়ু-সহনশীল সমাধানগুলোকে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ ও কারিগরি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
দায়িত্বশীল ও পরিবেশ-বান্ধব ইকো-ট্যুরিজম : এর মধ্যে রয়েছে- ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব সুন্দরবন (টোয়াস)-এর সাথে যৌথ সমন্বয়ের মাধ্যমে বনের ভেতরে চলাচলকারী পর্যটন নৌযানগুলোর ধারণক্ষমতা নির্ধারণ এবং শব্দ ও তেল দূষণ রোধে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। সুন্দরবনকে সম্পূর্ণ ‘প্লাস্টিক-মুক্ত জোন’ হিসেবে কার্যকর করতে হবে এবং পর্যটন থেকে অর্জিত আয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ সরাসরি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন ও বন সংরক্ষণে ব্যয় করার মডেল তৈরি করতে হবে।
সহাবস্থান ও সমন্বিত অংশীজন শাসনব্যবস্থা : যার মধ্যে রয়েছে- বাঘ এবং মানুষের দ্বন্দ্ব নিরসনে আধুনিক ডেটা-চালিত ট্র্যাকিং ও কমিউনিটি-ভিত্তিক স্মার্ট পেট্রোলিং ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে, যা একই সাথে স্থানীয় মানুষ ও রয়েল বেঙ্গল টাইগারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। সরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাবিদ, এনজিও এবং বনজীবী মানুষের সম-অধিকার নিশ্চিত করে সুন্দরবন ব্যবস্থাপনার জন্য একটি স্থায়ী ও উন্মুক্ত সমন্বিত অংশীজন প্ল্যাটফর্ম গঠন করতে হবে।
ঘোষণাপত্রটি সরকার, দেশের জনগণ ও আন্তর্জাতিক মহলের কাছে পৌঁছে দিতে এই সবুজ ইশতেহার সুন্দরবন সংরক্ষণের লড়াইয়ে একটি ঐতিহাসিক দলিল হয়ে থাকবে বলে আয়োজকরা প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
মিট দ্যা প্রেস সঞ্চালনা করেন মিশন গ্রিন বাংলাদেশ‘র পরিচালক কেফায়েত শাকিল। গণমাধ্যম কর্মীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়রর সিথ্রিইয়ার- এর উপদেষ্টা এমিরেটর্স অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত, বিজিসি ট্রাস্ট্র ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ- এর উপাচার্য অধ্যাপক ড. মঞ্জুরুল কিবরিয়া, সাজিদা ফাউন্ডেশনের প্রধান গবেষক নুরুল ইসলাম বিপ্লব, ফ্রেন্ডশিপ- এর সিনিয়র ডিরেক্টর (জলবায়ু পরিবর্তন) কাজী আহমেদুল হক ও মিশন গ্রিন বাংলাদেশ- এর পরিচালক মৌসুমী আক্তার বাঁধন।
এর আগে বৃহম্পতিবার থেকে নগরীর সিএসএস আভা সেন্টারে অনুষ্ঠিত দুইদিন ব্যাপী সুন্দরবন সামিটের শেষ দিন শুক্রবার (২২ মে) সেমিনার সেশন অনুষ্ঠিত হয়। এই সামিটে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাতটি দেশের তিন শতাধিক তরুণ জলবায়ু কর্মী অংশ নেন।
সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে খুলনা সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, “সুন্দরবন আমাদের প্রাকৃতিক ঢাল। এই বন ধ্বংস হলে উপকূলীয় অঞ্চলের অস্তিত্ব বিপন্ন হবে। কিন্ত আমরা এসব নিয়ে সেভাবে ভাবিনি। বিগত সরকার এখানকার সমস্যাগুলোর কথা না ভেবেই অপরিকল্পিত উন্নয়নের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে। জনগণের সকল উদ্বেগ-আপত্তিকে পাত্তা না দিয়ে জোরপূর্বক কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করেছে। এসব নিয়ে যারা প্রতিবাদ করেছে, তাদের জেল-জুলুমের মাধ্যমে হয়রানি করেছে।
তিনি আরো বলেন, দেশের মানুষ এই ব্যবস্থার পরিবর্তন চেয়েছে। বর্তমান সরকার পরিবর্তনেরই অংশ। আমরা প্রকৃতিকে রক্ষা করেই উন্নয়ন চাই। আমরা সুন্দরবনকে রক্ষা করতে চাই। এখন আর শুধু সমস্যা নিয়ে আলোচনার সময় নেই, আমাদের দ্রুত কার্যকর ও টেকসই সমাধানে যেতে হবে। আমি এই সামিটের আয়োজনকে সাধুবাদ জানাই। কারণ এর মাধ্যমে শুধু সুন্দরবন সম্পৃক্তরা নয়, সারা দেশ ও বিশ্বের মানুষ সুন্দরবন নিয়ে ভাবছে। এই সামিট থেকে তৈরি হওয়া সবুজ ঘোষণা আমি দায়ীত্ব নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছে দেব। আমরা সুন্দরবন রক্ষায় তরুণ প্রজন্ম, পরিবেশবিদ এবং সাধারণ মানুষকে এক হয়ে কাজ করার আহ্বান জানাচ্ছি।”
এই অধিবেশনে সরকারের সাথে নাগরিক সমাজ ও যুবশক্তির যৌথ কোলাবোরেশনের ওপর জোর দেন খুলনার জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হুরে জান্নাত। তিনি বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলা করা একা সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। সুন্দরবন রক্ষায় সরকারের পাশাপাশি এনজিও, উন্নয়ন সহযোগী এবং তরুণদের এই যৌথ কোলাবোরেশন ও যুবশক্তির সক্রিয় অংশগ্রহণ আগামী দিনে এক সবুজ ও সুরক্ষিত ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে বড় ভূমিকা রাখবে।”
দেশের প্রখ্যাত জলবায়ুবিদ এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সিথ্রিইআর-এর উপদেষ্টা ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত সুন্দরবনের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের সুদূরপ্রসারী প্রভাব তুলে ধরে বলেন, “লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য আজ চরম হুমকির মুখে। এই বন বাঁচাতে হলে অবিলম্বে বিজ্ঞানভিত্তিক সবুজ উদ্ভাবন ও তরুণদের নেতৃত্বকে কাজে লাগাতে হবে। এবারের সামিট থেকে যে ‘সবুজ ঘোষণা’ আসছে, তা যেন কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তবায়নের মুখ দেখে।”
ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশের কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটর শরীফ জামিল সুন্দরবনের চারপাশের শিল্পায়ন ও নদী দূষণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “সুন্দরবনকে বাঁচাতে হলে এর চারপাশের নদী ও পরিবেশকে দূষণমুক্ত রাখতে হবে। স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং তরুণ পরিবেশকর্মীদের সম্পৃক্ত করে একটি শক্তিশালী তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। যুব সমাজ যেভাবে সুন্দরবন রক্ষায় সোচ্চার হয়েছে, তা আমাদের আশাবাদী করে।”
সামিটের বিষয়ে আয়োজক সংস্থা মিশন গ্রিন বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক আহসান রনি জানান, বৃহস্পতিবার খুলনার জেলখানা ফেরীঘাঁট থেকে সুন্দরবনে যাত্রার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই সামিটের প্রথম দিন আমরা দেশি-বিদেশী বিশেষজ্ঞ ও জলবায়ু কর্মীদের নিয়ে সুন্দরবন সফর করেছি। এই সফরে জলবায়ু কর্মী ও বিশেষজ্ঞরা সুন্দরবানের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছেন। চিহ্নিত সমস্যাগুলোর আলোকে বিশেষজ্ঞ দল বসে সুন্দরবস রক্ষায় একটি সবুজ ঘোষণাপত্র তৈরি করা হয়েছে।
সেমিনারে অন্যান্যের মধ্যে বন অধিদপ্তরের খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ, শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী, বিজিসি ট্রাস্ট্র ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের উপাচার্য প্রাণি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মঞ্জুরুল কিবরিয়া, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সিথ্রিইয়ারের উপপরিচালক রউফা খানম, কেয়ার এর নবপল্লব প্রকল্পের উপপ্রধান মৃত্যুঞ্জয় দাস, সাজিদা ফাউন্ডেশনের প্রধান গবেষক মো. আব্দুল্লাহ হারুন, সাজিদা ফাউন্ডেশনের যুগ্ম পরিচালক সামিরা মোস্তফা, ফ্রেন্ডশিপের সিনিয়র ডিরেক্টর কাজী এমদাদুল হক প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।


