রামিসার হত্যাকারী সোহেল রানা’র আমলনামা

প্রবাহ রিপোর্ট : রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে সাত বছর বয়সি শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যা করার অভিযোগে গ্রেপ্তার হন জাকির হোসেন ওরফে সোহেল রানা। পরে আদালতে তোলা হলে স্বীতারোক্তি দিয়ে জবানবন্দি দিলে আদালত সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। তবে সোহেল রানা রামিসার সঙ্গেই শুধু এমন নৃশংস ও বর্বরোচিত ঘটনা ঘটাননি। এর আগেও অর্থাৎ অতীত জীবনেও নানা অপরাধমূলক কর্মকা-ে লিপ্ত ছিলেন বলে জানিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ।
শুক্রবার (২২ মে) ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে এ তথ্য জানান ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম।
তিনি বলেন, শিশু রামিসা হত্যাকা-ের মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দ্রুত সময়ের মধ্যে আদালতে জমা দেওয়া হবে। প্রধান অভিযুক্ত জাকির হোসেন ওরফে সোহেল রানা এর আগেও নানা অপরাধমূলক কর্মকা-ে লিপ্ত ছিল। তার অতীত কর্মকা- ভালো ছিল না। তার স্বভাবচরিত্র ছিল আপত্তিজনক।
এর আগে গত মঙ্গলবার (১৯ মে) সকালে পল্লবীর একটি বাড়িতে পাশের ফ্ল্যাটে মেয়ে রামিসাকে খুঁজে বের করেন তার মা। পরে স্থানীয়রা খবর দিলে পুলিশ গিয়ে সেই ফ্ল্যাট থেকে রামিসার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ সময় সোহেলের স্ত্রীকে বাসা থেকে আটক করা হয়। তার আগে জানালা দিয়ে পালিয়ে যান সোহেল। পরে তাকে নারায়ণগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এ ঘটনায় দেশজুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।
অতিরিক্ত কমিশনার জানান, সোহেল রানার বাড়ি নাটোরের মহেশচন্দ্রপুরে। সোহেল যখন এলাকায় থাকতেন, বিভিন্ন অপকর্মের সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
সোহেলের ছোট বোন জলি বেগমের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, জলি অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে বলেছেন, ‘চার বছর আগে সে বৃদ্ধ মা-বাবা ও পরিবারকে ছেড়ে চলে যায়। আমরা তার কোনো পরিচয় দিতে চাই না এবং ভবিষ্যতে তার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখতেও আগ্রহী নই। সে যে জঘন্য অপরাধ করেছে, তার যেন সর্বোচ্চ শাস্তি হয়।’
তিনি আরও জানান, সোহেলের মা-ও একই আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘গত চার বছর ধরে সোহেল তার পরিবার বা সন্তানদের কোনো খবর নেয় না এবং কোনো প্রকার আর্থিক সহযোগিতাও করে না।’
মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, গ্রামের বাসিন্দাদের ভাষ্যমতে, সোহেল এলাকায় একজন পেশাদার চোর হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি সরকারি রড চুরিসহ স্থানীয় অটো-মিলের রড চুরির অপরাধেও একাধিকবার ধরা পড়ে মারধরের শিকার হন। স্থানীয়দের অভিযোগ, তৎকালীন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাকর্মীদের ছত্রচ্ছায়ায় থাকার কারণে বারবার তিনি ছাড় পেয়ে যেতেন।
সোহেলের পারিবারিক জীবনেও নানা কলঙ্কজনক অধ্যায় ছিল বলে জানান এই কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ১০ বছর আগে সোহেল প্রথম বিয়ে করেছিলেন এবং সেই ঘরে তার একটি সন্তান রয়েছে। তবে আপন ছোট ভাইয়ের স্ত্রীর সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার কারণে তার সেই সংসার ভেঙে যায়। তিন বছর আগে তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করলেও তার চারিত্রিক পরিবর্তন হয়নি। সোহেল অনলাইন জুয়া ও বিভিন্ন নেশায় আসক্ত হয়ে বিপুল পরিমাণ ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন এবং পাওনাদারদের চাপে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হন।
পরে রাজধানীতে এসে মিরপুরের পল্লবীতে একটি গ্যারেজে রিকশা মেরামতের কাজ শুরু করেন সোহেল। তবে তার মাদকাসক্তি ও উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন অব্যাহত ছিল। পল্লবীর বিহারি ক্যাম্পের একটি বাসায় সাবলেট হিসেবে থাকার সময় নিয়মিত ইয়াবা সেবনের অভিযোগে তাকে সেই বাসা থেকে বের করে দেওয়া হয়।
অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম আরও বলেন, পরে পরিচিতদের মাধ্যমে পল্লবীর একটি গ্যারেজে কাজ নিলেও কাজে অনিয়মিত হওয়ার কারণে সেখান থেকেও তাকে ছাঁটাই করা হয়। সবশেষ জনৈক মাসুদের বাসায় সাবলেট হিসেবে ওঠার মাত্র ১৫ দিনের মাথায় শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যা করেন সোহেল।



