যুগ্ম সচিব ওএসডি : ভরণ-পোষণ আইনে কী আছে?

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ পঁচাত্তরোর্ধ্ব মায়ের লাশ পড়েছিল ময়লা-আবর্জনা বাসায়। তিন সন্তান প্রতিষ্ঠিত অবস্থানে থাকলেও শেষ জীবনে তিনি অযতœ ও অবহেলায় ছিলেন বলে অভিযোগ ছড়িয়েছে। রাজধানীর মিরপুরে ৭৫ বছর বয়সী নূরজাহান বেগমের এমন মৃত্যুর ঘটনায় গণমাধ্যমে আসার পর এক পুত্র যুগ্ম সচিবকে জনস্বার্থে ওএসডিও করেছে সরকার। শুধু এই ঘটনাই নয়, প্রায়ই দেশের বিভিন্ন স্থানে মা-বাবাকে অবহেলা, ভরণ-পোষণ না দেওয়া, এমনকি তাদের নির্যাতনের অভিযোগও পাওয়া যায়। মিরপুরের ঘটনাটি ঘিরে তুমুল আলোচনা শুরু হওয়ায় সামনে এসেছে পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন। আইনে পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ, চিকিৎসা ও দেখভাল নিশ্চিত করা সন্তানদের জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এমনকি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে অর্থদ- ও কারাদ-েরও বিধান রয়েছে। তবে আইনে বলা আছে, কোনো আদালত এই আইনের অধীন সংঘটিত অপরাধ সংশ্লিষ্ট সন্তানের পিতা বা মাতার লিখিত অভিযোগ ব্যতীত আমলে নেবে না। এই প্রেক্ষাপটে ওই যুগ্ম-সচিবের বিরুদ্ধে কোন আইনের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হলো তা নিয়েও আলোচনা চলছে। তাকে ওএসডির প্রজ্ঞাপনের ভাষ্যমতে, ওই যুগ্ম-সচিকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্তির কথা জানানো হয়। বুধবার (৩ জুন) তাকে কর্মস্থল থেকে অবমুক্ত হয়ে বদলি হওয়া নতুন কর্মস্থলে যোগ দিতে বলা হয়েছে। অন্যথায় পরদিন থেকেই তাৎক্ষণিক অবমুক্ত (স্ট্যান্ড রিলিজড) বলে গণ্য করার কথা বলা হয়। আইন যা বলছে ঃ দেশের বর্তমান সামাজিক বাস্তবতায় সন্তান কর্তৃক পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিতকরণে ২০১৩ সালের ২৭ অক্টোবর একটি আইন করা হয়। ওই আইন বলছে, পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত না করলে অনূর্ধ্ব এক লাখ টাকা অর্থদ-ে দ-িত হবে, অনাদায়ের ক্ষেত্রে অনূর্ধ্ব তিন মাস কারাদ-ে দ-িত হবে। আইনের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, “পিতা” অর্থ এমন ব্যক্তি যিনি সন্তানের জনক; “ভরণ-পোষণ” অর্থ খাওয়া-দাওয়া, বস্ত্র, চিকিৎসা ও বসবাসের সুবিধা এবং সঙ্গ প্রদান; “মাতা” অর্থ এমন ব্যক্তি যিনি সন্তানের গর্ভধারিণী; “সন্তান” অর্থ পিতার ঔরসে এবং মাতার গর্ভে জন্ম নেওয়া সক্ষম ও সামর্থ্যবান পুত্র বা কন্যা। পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ সংক্রান্ত আইনের ৩ (১) ধারায় বলা হয়েছে, প্রত্যেক সন্তানকে তার পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করতে হবে। একাধিক সন্তান থাকলে কে দায়িত্ব পালন করবেন সে বিষয়ে আইনের ৩ (২) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো পিতা-মাতার একাধিক সন্তান থাকলে সেক্ষেত্রে সন্তানরা নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে তাদের পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করবে। (৩) এই ধারার অধীন পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রত্যেক সন্তানকে পিতা-মাতার একইসঙ্গে একই স্থানে বসবাস নিশ্চিত করতে হবে। (৪) কোনো সন্তান তার পিতা বা মাতাকে বা উভয়কে তার, বা ক্ষেত্রমত, তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে, কোনো বৃদ্ধনিবাস কিংবা অন্য কোথাও একত্রে কিংবা আলাদাভাবে বসবাস করতে বাধ্য করবে না। (৫) প্রত্যেক সন্তান তার পিতা এবং মাতার স্বাস্থ্য সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজখবর রাখবে, প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা ও পরিচর্যা করবে। (৬) পিতা বা মাতা কিংবা উভয়, সন্তান হতে পৃথকভাবে বসবাস করলে, সেই ক্ষেত্রে প্রত্যেক সন্তানকে নিয়মিতভাবে তার, বা ক্ষেত্রমত, তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে হবে। (৭) কোনো পিতা বা মাতা কিংবা উভয়ে, সন্তানদের সঙ্গে বসবাস না করে পৃথকভাবে বসবাস করলে, সেক্ষেত্রে ওই পিতা বা মাতার প্রত্যেক সন্তান তার দৈনন্দিন আয়-রোজগার, বা ক্ষেত্রমত, মাসিক আয় বা বাৎসরিক আয় হতে যুক্তিসঙ্গত পরিমাণ অর্থ পিতা বা মাতা, বা ক্ষেত্রমত, উভয়কে নিয়মিত প্রদান করবে। যদি পিতা-মাতা না থাকে তাহলে কী হবে ঃ এ বিষয়ে আইনের ৪ ধারায় বলা হয়, প্রত্যেক সন্তান তার-(ক) পিতার অবর্তমানে দাদা-দাদীকে; এবং (খ) মাতার অবর্তমানে নানা-নানীকে-ধারা ৩-এ বর্ণিত ভরণ-পোষণ প্রদানে বাধ্য থাকবে এবং এই ভরণ-পোষণ পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ হিসাবে গণ্য হবে। আইন না মানলে যে সাজা ঃ এসব বিধান পালন না করলে কেমন শাস্তি হবে সে বিষয়ে আইনের ৫ (১) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো সন্তান কর্তৃক ধারা ৩-এর যে কোনো উপ-ধারার বিধান কিংবা ধারা ৪-এর বিধান লঙ্ঘন অপরাধ বলে গণ্য হবে এবং উক্ত অপরাধের জন্য অনূর্ধ্ব ১ (এক) লক্ষ টাকা অর্থদ-ে দ-িত হবে; বা উক্ত অর্থদ- অনাদায়ের ক্ষেত্রে অনূর্ধ্ব ৩ (তিন) মাস কারাদ-ে দ-িত হবে। (২) কোনো সন্তানের স্ত্রী, বা ক্ষেত্রমত, স্বামী কিংবা পুত্র-কন্যা বা অন্য কোনো নিকট আত্মীয় ব্যক্তি- (ক) পিতা-মাতার বা দাদা-দাদীর বা নানা-নানীর ভরণ-পোষণ প্রদানে বাধা প্রদান করলে; বা (খ) পিতা-মাতার বা দাদা-দাদীর বা নানা-নানীর ভরণ-পোষণ প্রদানে অসহযোগিতা করলে- তিনি উক্তরূপ অপরাধ সংঘটনে সহায়তা করেছেন গণ্যে উপ-ধারা (১)-এ উল্লিখিত দ-ে দ-িত হবেন। তবে অপরাধগুলো আমলযোগ্য এবং জামিন ও আপোষযোগ্য। বিচারের বিষয়ে আইনে বলা হয়, ফৌজদারি কার্যবিধিতে যা কিছুই থাকুক না কেন, এই আইনের অধীন সংঘটিত অপরাধ প্রথম শ্রেণির জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে বিচারযোগ্য হবে। (২) কোনো আদালত এই আইনের অধীন সংঘটিত অপরাধ সংশ্লিষ্ট সন্তানের পিতা বা মাতার লিখিত অভিযোগ ব্যতীত আমলে গ্রহণ করবে না। আপোষ-নিষ্পত্তি ঃ আপোষ-নিষ্পত্তির বিষয়ে আইনের ৮ (১) ধারায় বলা হয়, আদালত এই আইনের অধীন প্রাপ্ত অভিযোগ আপোষ-নিষ্পত্তির জন্য সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা মেম্বার, কিংবা ক্ষেত্রমত, সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভার মেয়র বা কাউন্সিলর, কিংবা অন্য কোনো উপযুক্ত ব্যক্তির নিকট প্রেরণ করতে পারবে। (২) উপ-ধারা (১)-এর অধীন কোনো অভিযোগ আপোষ-নিষ্পত্তির জন্য পাঠানো হলে, সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যান, মেয়র, মেম্বার বা কাউন্সিলর উভয় পক্ষকে শুনানির সুযোগ প্রদান করে, তা নিষ্পত্তি করবে এবং এইরূপে নিষ্পত্তিকৃত অভিযোগ উপযুক্ত আদালত কর্তৃক নিষ্পত্তিকৃত বলে গণ্য হবে। যুগ্ম-সচিবকে ওএসডি কোন আইনে ঃ উল্লিখিত আইনে সরকারি চাকরিজীবী সন্তান মা-বাবার ভরণ-পোষণ না দিলে তার শাস্তির প্রক্রিয়া কী হবে তা স্পষ্ট নয়। তাছাড়া এই অভিযোগ আদালত পর্যন্তও যায়নি। অনেকে মনে করছেন, দেশের সামাজিক বাস্তবতায় সোশ্যাল মিডিয়ায় তুমুল আলোচনার ফলে সরকারি ওই কর্মকর্তাকে ওএসডি হতে হয়েছে। যদিও মায়ের বাসায় একা থাকা নিয়ে তাদের পরিবার আত্মপক্ষ সমর্থন করে নানা বক্তব্য দিয়ে আসছে। তাকে ওএসডি করার আগে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আবদুল বারী গণমাধ্যমে বলেন, পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন আছে, আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ বিষয়ে ওই কর্মকর্তার (যুগ্ম সচিব) বক্তব্য গ্রহণসহ প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে। ইতিমধ্যে প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। আইনজীবীর অভিমত ঃ এ আইনের প্রয়োগ সম্পর্কে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী কুমার দেবুল দে বলেন, আইন দিয়ে তো আচরণ ঠিক করা যায় না। হত্যার অপরাধে মৃত্যুদ-ের আইন বহু পুরোনো। কিন্তু এতে কি খুন কমেছে? এটা আচরণের ব্যাপার, সামাজিকতার ব্যাপার। পারিবারিক শিক্ষার ব্যাপার। রাষ্ট্র যখন কোনো ব্যাপারে ব্যর্থ হয় তখন আইন করে। রাষ্ট্রের কাঠামো ঠিক নেই। নীতি-নৈতিকতার কোনো জায়গা নেই। তাহলে সন্তানদের হাতে বাপ-মা মরবে না কেন? সর্বস্ব দিয়ে লেখাপড়া করাইছে। কিন্তু সন্তানরা মা-বাবাকে রাখে না। তার জন্য যে বাবা-মাকে রাখার বিকল্প সামাজিক ব্যবস্থা রাষ্ট্র তৈরি করে নাই। এ আইনজীবী বলেন, পৃথিবীর সব দেশে বাবা-মা আছে। উন্নত দেশে সন্তানরা সঙ্গে থাকে না। মা-বাবার অসহায় সময়ের জন্য রাষ্ট্রের কিছু প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। সন্তানের দোষ অবশ্যই আছে, তবে পাশাপাশি রাষ্ট্রের দোষও দেখতে হবে।



