এনসিপির ৮ লাখ ৫২ হাজার ১৫৭ কোটি টাকার ছায়া বাজেট প্রকাশ

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ছায়া বাজেট কমিটি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৮ লাখ ৫২ হাজার ১৫৭ কোটি টাকার ছায়া বাজেট প্রকাশ করেছে। ‘বাংলাদেশ ২.০: সংস্কার, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের মাধ্যমে টেকসই প্রবৃদ্ধি’ প্রতিপাদ্য সামনে রেখে ১২টি প্রধান খাতে মোট ৭১টি সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবায়নযোগ্য নীতিগত প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে। শুক্রবার (৫ জুন) বিকেল সাড়ে ৩টায় রাজধানীর রূপায়ণ টাওয়ারের দ্বিতীয় তলায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ছায়া বাজেট কমিটির উদ্যোগে প্রস্তাবগুলো গণমাধ্যমের সামনে উপস্থাপন করা হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন এনসিপির মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) ও সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ, ছায়া বাজেট কমিটির প্রধান ও সংসদ সদস্য ড. আতিক মুজাহিদ, কমিটির উপ-প্রধান আব্দুল্লাহ আল ফয়সাল, এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব আলাউদ্দিন মোহাম্মদ এবং জাতীয় শ্রমিক শক্তির যুগ্ম আহ্বায়ক সজিব ওয়াহিদ। অনুষ্ঠানের শুরুতে বক্তব্য দেন হাসনাত আব্দুল্লাহ। পরে ড. আতিক মুজাহিদ ও আব্দুল্লাহ আল ফয়সাল ৭১টি প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। প্রস্তাবগুলো ‘রাজস্ব ও সামষ্টিক অর্থনীতি’, ‘রাজস্ব কাঠামো ও করজাল সম্প্রসারণ’, ‘কর ন্যায়বিচার ও সংস্কার’, ‘শিক্ষা ও কর্মসংস্থান’, ‘স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা’, ‘কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা’, ‘পরিষ্কার জ্বালানি ও পরিবেশ’, ‘নারী, যুব ও অন্তর্ভুক্তি’, ‘সরকারি কর্মচারী ও শাসন সংস্কার’, ‘ব্যাংকিং, মূলধন বাজার ও অর্থায়ন’, ‘প্রতিরক্ষা ও জাতীয় নিরাপত্তা’ এবং ‘স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা’-এই ১২টি খাতে বিভক্ত করা হয়েছে। রাজস্ব ও সামষ্টিক অর্থনীতি খাতে এনসিপির প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে সামাজিক খাতে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েও সামষ্টিক অর্থনীতির ভারসাম্য বজায় রাখা। দলটির প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৮ লাখ ৫২ হাজার ১৫৭ কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তুলনায় মোট ব্যয় ৬২ হাজার ১৫৭ কোটি টাকা বা ৭ দশমিক ৮৭ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবগুলো উপস্থাপনের আগে বক্তব্যে হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, বর্তমান সরকার উত্তরাধিকারসূত্রে আওয়ামী লীগের রেখে যাওয়া একটি সংকটাপন্ন অর্থনীতি পেয়েছে। দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৩০ শতাংশের বেশি। প্রতিবছর ১২ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি জ্বালানি আমদানি করতে হয়, যার ব্যয় দেড় লাখ কোটি টাকারও বেশি। একই সঙ্গে অপব্যবহারমূলক ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝাও অর্থনীতিকে বহন করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের শাসনামলে পরিসংখ্যান বিকৃত করে জনগণের কাছে অর্থনীতির প্রকৃত চিত্র আড়াল করা হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকার কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছিল। মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি, ডলারের বাজারভিত্তিক বিনিময় হার এবং অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ চালু করা হয়েছিল। ব্যাংক খাতে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ-২০২৫ জারি করা হয়েছিল, যা বিএনপি সরকার বিকৃত করেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার ভাষ্য, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অবকাঠামো উন্নয়নের চেয়ে মানবসম্পদ উন্নয়নকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের একটি রূপরেখা জনগণের সামনে উপস্থাপন করেছিল, কিন্তু বিএনপি সরকার তা থেকে সরে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগের প্রক্রিয়া নিয়েও অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে যেসব বিষয় সামনে এসেছে, সেগুলোও অর্থনীতির জন্য স্বস্তিদায়ক নয়। তিনি আরও বলেন, দেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনো এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মধ্যে অন্যতম নিম্ন পর্যায়ে, যা মাত্র ৬ দশমিক ৭ শতাংশ। এছাড়া সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন কাঠামো ২০১৫ সালের পর আর পুনর্বিবেচনা করা হয়নি। সরকারের ঘোষিত ১ কোটি ৪০ লাখ স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ডধারীর জন্য অর্থের সংস্থান কীভাবে করা হবে, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি। বলেন, এ অর্থ কি অন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি থেকে কেটে দেওয়া হবে, নাকি নতুন কোনো উৎস থেকে আসবে-এ বিষয়ে স্পষ্টতা প্রয়োজন। তিনি বলেন, জ্বালানি খাতে স্বনির্ভরতার কোনো রূপরেখা আছে কি না, নাকি দেশ আমদানিনির্ভরই থাকবে-সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। একইভাবে বাজেটে কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে কতটা অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়েও জনগণ জানতে চায়। হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, আমরা একটি বৈষম্যহীন ও সমতাভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলার অঙ্গীকার করছি। রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে দায়বদ্ধতার সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে চাই। ভোক্তাদের স্বার্থ সংরক্ষণের পাশাপাশি উৎপাদকদের স্বার্থও সমানভাবে রক্ষা করা হবে। যারা নিয়মিত কর দেন, তাদের উৎসাহিত করা হবে এবং করের অর্থে পরিচালিত রাষ্ট্রীয় সেবাগুলো জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছানো নিশ্চিত করা হবে। তিনি বলেন, আমরা কেবল পরিসংখ্যাননির্ভর নামসর্বস্ব কোনো বাজেট দেখতে চাই না; বরং এমন একটি বাজেট চাই, যা মানুষের জীবনমান উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে। এনসিপি ১৩ শতাংশ নামমাত্র প্রবৃদ্ধি (নমিনাল গ্রোথ) ধরে জিডিপির আকার ৬৮ লাখ ৭০ হাজার ২৬০ কোটি টাকা প্রক্ষেপণ করেছে। পাশাপাশি বর্তমান ৯ দশমিক ২ শতাংশ মূল্যস্ফীতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৮ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং ২০২৭-২৮ অর্থবছরে তা ৬ শতাংশে স্থিতিশীল করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।


